বার্সাকে প্রতিশোধের আগুনে পুড়িয়ে সেমিতে জুভেন্টাস

নেইমার তখন মাঠে বসে। দুই হাটুর ভেতর মুখ গুজে কাঁদছেন। লিওনেল মেসি সারা স্টেডিয়ামকে এক নজরে দেখতে চাওয়ার মতো করে ওপরের দিকে তাকিয়ে চোখ ঘোরান। হাতটা উঠে যায় মাথায়। চুলকালেন আর চেহারায় কেমন যেন সবহারা ভাব। এর একটু পরই নেইমার উঠে দাঁড়ান। তার কান্না থামাতে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়, স্বদেশী দানি আলভেস ছুটে আসেন। ৮ বছর বার্সেলোনায় খেলে যাওয়া আলভেসকে পেরিয়ে জার্সিটা দিয়ে মুখ ঢাকলেন। অঝোরে কাঁদছেন নেইমার। দেখতে দেবেন না চোখের জল নাকি লজ্জা নিয়ে মুখ ঢেকে নেইমারের টানেলে ঢুকে পড়া!

নাহ। বার্সেলোনা এবার আর পারেনি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় লেগের খেলায় ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়ন জুভেন্টাসের সাথে ০-০ ড্র করেছে ম্যাচ। বুধবার রাতের এই লড়াইয়ে মেসিরা ক্ষুধার্ত হাঙ্গরের মতো নিজেদের মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়বেন বলে সমর্থকদের আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রথম লেগের খেলায় স্পেনের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন মেসিরাই যে জুভদের মাঠে ৩-০ গোলে হেরে সেমিফাইনালে খেলার সম্ভাবনাটাই প্রায় অসম্ভবের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেমিফাইনালে উঠতে হলে ন্যু-ক্যাম্পে কমপক্ষে মেসি-নেইমারদের জিততে হতো ৪-০ ব্যবধানে।

কিন্তু জুভদের হারাতে যে সমীকরণ মেলাতে হতো তার ধারে কাছেও যেতে না পেরে এবারের ইউরোপ সেরার ক্লাব লড়াইয়ের আসর থেকে কাতালানরা বাদ। ৩-০ অ্যাগ্রগেটে সেমিফাইনাল উঠে গেলো আরেক হেভিওয়েট দল জুভ। রাতের অন্য কোয়ার্টার ফাইনালে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে দ্বিতীয় লেগে ৩-১ গোলে হারিয়ে ৬-৩ অ্যাগ্রেগেটে গেছে সেমিফাইনালে গেছে মোনাকো।

মাত্র ক’দিন আগে রূপকথার গল্প লিখেই কোর্য়াটার ফাইনালে উঠে আসা স্প্যানিশ জায়ান্টরা সব কিছু করলো। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মেসি, নেইমার, সুয়ারেস, রাকিতিচরা প্রাণ দিয়ে লড়ে গেলেন। বুক দিয়ে ডিফেন্ডারদের সাথে অন্যরাও লড়ে ঘর সামলে রাখলেন। গোল করতে দিলেন না প্রথম লেগের নায়ক আর্জেন্টাইন বিস্ময় পাওলা দিবালাদারে জুভেন্টাসকে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো গেল ম্যাচের ৩-০ ব্যবধান শোধ করে তবেই না সেমিফাইনালের দরজায় প্রবল আঘাত করতে হবে। প্রথম শর্তটাই পূরণ করতে ব্যর্থ এমএসএন। মেসি-সুয়ারেস-নেইমার ত্রিফলা। লুইস এনরিকের দল গোল পেল না। বেশ জমজমাট আক্রমণ, পাল্টা আঘাত, জমাট উত্তেজনা আর অসাধারণ ব্যক্তি নৈপুণ্যের দুর্দান্ত প্রদর্শণী তাতে ফুটবল রোমান্টিকদের এই বিরাট বড় ম্যাচ থেকে সবচেয়ে বড় পাওয়া। খেলায় জয় পরাজয় তো থাকেই।

কঠিন এই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে মেসি-নেইমাররা অনুপ্রেরণা খুঁজে নিতে পেরেছিলেন ঠিক আগের রাউন্ডের ম্যাচ থেকেই। গত ৯ মার্চ ন্যু-ক্যাম্পে প্রত্যাবর্তনের কী গল্পই না লিখেছে মেসি-নেইমারদের বার্সেলোনা! শেষ ‘ষোল’র প্রথম লেগে পিএসজির মাঠে গিয়ে ৪-০ ব্যবধানে হেরে এসেছিল লুইস এনরিকের বার্সা। অনেক ফুটবল বোদ্ধাই শেষ ষোল থেকেই বার্সার বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিল! কারণ দ্বিতীয় লেগের আগে সমীকরণটা ছিল এমন, কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে হলে বার্সাকে ফিরতি লেগে কমপক্ষে ৫-০ গোলে জিততে হবে। পিএসজি একটা গোল দিয়ে বসলে জিততে হবে ৬-১ ব্যবধানে। এও কী সম্ভব! সব ধারণা পাল্টে দিয়ে ঠিক ন্যু-ক্যাম্পে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন মেসি-নেইমার-সুয়ারেজরা! ইনজুরি সময়ে দুই গোল করে বার্সা ঠিকই ম্যাচটা জিতে নেয় ৬-১ ব্যবধানে। দুই লেগ মিলিয়ে ৬-৫ অগ্রগামিতায় কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় বার্সা। ছিটকে পড়ে পিএসজি।

কিন্তু প্রতিদিন যে রূপকথার গল্প লেখা যায় না! নেইমারকে তাই ভাঙা হৃদয় নিয়ে চোখের জলে খেলা শেষে নিজের মাঠই ছাড়তে হয় অবনত মস্তকে, নিজেদের মানুষের কাছেই মুখ আড়াল করে।

বাংলাদেশ সময় ০৯৪৫ ঘণ্টা, ২০ এপ্রিল, ২০১৭

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস

শেয়ার করুন