‘বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করেন, ফিরে আসেন না’

বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিয়াং বলেছেন, বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করতে যাঁরা বাংলাদেশে আসেন, তাঁদের বেশির ভাগই এখানে দ্বিতীয়বার আর ফেরত আসে না। তাঁরা এ দেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলো বুঝতে পারেন।

বাংলাদেশে বিদেশি ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস অব চেম্বার অব কমার্স (এফআইসিসিআই) আয়োজিত মাসিক মধ্যাহ্ন ভোজসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল বুধবার আয়োজিত এ সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন এফআইসিসিআইয়ের সভাপতি রুপালী চৌধুরী।

মা মিংকিয়াং বলেন, ‘বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে বেজার (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ) চেয়ারম্যান পবন চৌধুরীর মতো আমি আশাবাদী নই। শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে এ দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। বাংলাদেশের চেয়ে শ্রম আফ্রিকায় সস্তা। বাংলাদেশের দরজায় বিদেশি বিনিয়োগ কড়া নেড়ে যাচ্ছে। সেটাকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারলে সুযোগ দ্বিতীয়বার না-ও আসতে পারে।’

বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে বেশ কিছু পরামর্শও দিয়েছেন মা মিংকিয়াং। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের সমস্যাগুলো সরকারকে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সময়ও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি, কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কের মতো বেশ কিছু সমস্যা তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, জমির দাম এখানে খুব বেশি। আবার জমির প্রকৃত মালিক কে, তা নিয়েও আছে বিভ্রান্তি। অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমিগুলো নিচু জলাভূমি হওয়ায় সেগুলো ভরাট করতে হয়, সেটির খরচও অনেক বেশি।

গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার বিষয়ে মা মিংকিয়াং বলেন, বাংলাদেশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয়, এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। সিলেটে চীনের একজন বিনিয়োগকারী চার কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বসে আছেন। গ্যাস-সংযোগ না পাওয়ায় দুই বছরেও উৎপাদনে যেতে পারেননি তিনি। উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে অতিরিক্ত শুল্ক ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে অনেক ব্যাংক থাকলেও তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত। ঋণপত্রের মূল্য পরিশোধ অনেক ব্যাংকের মাধ্যমে করা সম্ভব হয় না।

হতাশার পাশাপাশি কিছু আশার কথাও শোনান রাষ্ট্রদূত মা মিংকিয়াং। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে জানার এবং এ দেশে বিনিয়োগের বিষয়ে চীনাদের আগ্রহ গত কয়েক বছরে অনেক বেড়েছে। এই আগ্রহের কারণে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে শিগগিরই এক নম্বরে আসবে চীন।

চীন-বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চীনের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। চীনে এখন পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, তাই বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি করতে পারে। আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের চীনা বিনিয়োগ আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

নিজের দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও কথা বলেন চীনা রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, অনেকেই চীনের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে কম বলছেন। তবে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় ও চীনের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় এ প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট ভালো। চীন ভবিষ্যতে এর চেয়ে কম প্রবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত আছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মন্দাবস্থা এখন বিরাজ করছে, তাতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যেকোনো দেশের জন্যই কঠিন।

এফআইসিসিআইয়ের সভাপতি রুপালী চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে চীনের বেসরকারি খাতের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ নেই। চীনের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা এ দেশে বিনিয়োগ সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে এফআইসিসিআই সব ধরনের সহায়তা করবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৪৪৮ ঘণ্টা, ১৮ মে ২০১৭,
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এসআর

শেয়ার করুন