নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট-মোবাইল কোর্ট: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বাস্তবতা

মতামত

সাকিব আল মামুন   
সম্প্রতি বাংলাদেশেরর সর্বোচ্চ আদালত তিনটি রিট পিটিশনের আবেদন ক্রমে মোবাইল কোর্টের কুশীলব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। এবং এসব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালিত বিচারিক কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করে। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে ‘চেক এন্ড ব্যালেন্স’ নীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনটি বিভাগ; আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে থাকা উচিত। একটি বিভাগ অন্য বিভাগের উপর দাদা গিরি কিংবা কর্তৃত্ব পরায়ণ না হয়ে জনগণের মতের উপর প্রাধান্য দিবে এটাই সংবিধানের মৌলিক চেতনা।

একজন বিচারকের অফিস ডিস্ট্রিক্ট হেড কোয়ার্টার এ। বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে যত সময় লাগে তাতে জনগণের আস্থা এবং অর্থনৈতিক অবস্থার বারোটা বেজে যায়। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে জেলা শহরে এসে বিচার পাওয়াটা অনেকাংশে ব্যয়বহুল এবং সময় সাপেক্ষ। তাছাড়া, এমন কিছু অপরাধ রয়েছে যেগুলো নিয়ন্ত্রণ জেলা শহরে এসি রুমে বসে করা দুঃসাধ্য! ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১০ এবং ১২ তে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর বিধান রাখা হয়েছে। জনগণের কল্যাণের নিমিত্তে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সব কাজ যদি জজ সাহেবরা করেন তবে সাধারণ জনগণ দ্রুততম প্রতিকারের জন্য কোথায় যাবেন?

মোবাইল কোর্ট যদি বিচার বিভাগের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে গ্রাম আদালত আইনও বাতিল করা হোক। প্রজাতন্ত্রের প্রথম শ্রেণীর একজন কর্মকর্তা, যিনি চাকুরী জীবনের অধিকাংশ সময় তৃনমূলে কাটান তিনিই, জন গুরুত্বপূর্ণ এবং কম মাত্রার অপরাধ দ্রুততম সময়ে প্রতিকার করতে পারেন ।

আর, যদি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে না পারেন, তবে সরকারকে কমপক্ষে ৩০০০ জন বিচারক নিয়োগ করতে হবে, যেটা অনেক ব্যয় সাপেক্ষ। বিদ্যমান বিচারক দিয়ে ৩২লাখ ঝুলন্ত মামলা নিষ্পত্তি করবে নাকি দৈনন্দিন সৃষ্ট হাজারো সমস্যা সমাধান করবে?

বাংলাদেশের সাধারণ বাস্তবতার সাথে আমরা কতটুকু পরিচিত? অনেকেই ডাক্তার আর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে তুলনা করছেন। আবার, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে বিচারকের সাথে তুলনা করছেন! একজন ডাক্তারকে বিচারিক ক্ষমতা বাংলাদেশের আইন দেয়নি। তার কাজ জনগণের চিকিৎসা নিশ্চিত করা। আর, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা বাংলাদেশের আইনে দেয়া হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে জন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে সমাধান করতে বলা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ সরকারকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বিচারিক কার্যক্রম আগের চেয়ে গতিশীল, তবে এতো গতিশীল নয় যে; দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যাবে। ছোট্র একটি চুরির মামলাও বছরের পর বছর চলতে থাকে! ৫০ হাজার টাকার জমির মূল্য অথচ এই সামান্য এক টুকরো জমি উদ্ধারের জন্য অর্ধ যুগ কিংবা এক যুগ লেগে যেতে পারে, আর ৫ লাখ টাকাও খরচ হয়ে যাবে কিন্তু বিরোধ নিষ্পত্তি হবে আদৌ? একটি কথা মনে পড়ে যায়, ‘ডাক্তার আসার পূর্বে রোগী মারা গেল’এমন অবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। রোগী আর বাঁচানো যাবে না। সবকিছুর মাঝে একটু সমন্বয় করতে পারলে বাংলাদেশ একটি আদর্শিক রাষ্ট্র হতে পারে।

বিচার ব্যবস্থার উপর জনগণের পূর্ণাঙ্গ আস্থা রয়েছে। মহামান্য হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন জনগণ তার বিরোধিতা করার কোন যৌক্তিকতা নেই। তবে জনমনে এক ধরণের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এক্ষেত্রে বিচার ব্যবস্থার উপর পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি দ্রুত এবং কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ জনবল নিয়োগ না করা পর্যন্ত নির্বাহী এবং বিচার বিভাগ সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

লেখক 
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, জজ কোর্ট, ঢাকা।

বাংলাদেশ সময়: ১২৫৭ ঘণ্টা, ১৮ মে ২০১৭
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এসডিএম

শেয়ার করুন