“আলোর বাতিঘরঃ দীপ্তিময় বহ্নি শিখা”

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

শিক্ষাকে প্রধানত দু’ভাগে বিশ্লেষিত করা যায়।সু-শিক্ষা আর কু-শিক্ষা।প্রার্থক্যটা নামেই স্পষ্ট। বস্তুত আধুনিক শিক্ষা,ও নৈতিক তথা ইসলামী শিক্ষা। আধুনিক শিক্ষা মানুষকে অধিকাংশে ভোগ বিলাসী করে তোলে, আখেরাত সম্পর্কে ঔদাসীন্য করে, পার্থিব জীবনকে মোহনীয় চাকচিক্য করে তোলে এবং ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার দিকে সর্বোতভাবে প্ররোচিত করে। অপর দিকে নৈতিক তথা ইসলামী শিক্ষার মৌলিক চেতনা হচ্ছে আখেরাতমুখী, পরকালের জবাবদিহীর চেতনাবোধ সম্পন্ন। ইসলামী শিক্ষা মানুষকে ভোগবাদে আসক্ত না করে পার্থিব জীবনই মুখ্য এবং শেষ নয় বরং মৃত্যুর পর অনন্ত অসীম জীবন অপেক্ষমান – এই বোধ জাগ্রত করে। ইসলামী শিক্ষা একজন মানুষকে নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন করে আদর্শ দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। কর্মনিষ্ঠ, সময় সচেতন, আত্মনির্ভরশীল ও আত্মবিশ্বাসী হতে অনুপ্রাণিত করে। ইসলামী শিক্ষা মানে সমন্বিত শিক্ষা- কোরআন হাদিসের পাশাপাশি সাধারণ ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের সমন্বিত শিক্ষা। যার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।

পৃথিবীতে মানুষকে পাঠানো হয়েছে মহান রাব্বুল আলামীনের খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধি হিসেবে। তার প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে প্রথম শর্ত তাঁকে জানা, তাঁর মহিমা, একত্ববাদ ও সীমাহীন ক্ষমতার বলয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা। আর এজন্যে প্রয়োজন শিক্ষার। শিক্ষা ছাড়া মানুষ যেমন নিজেকে জানতে পারে না, তেমনি পারে না তার রবকে চিনতে। শিক্ষার দ্বারা মানুষ আলোকিত হয়, সত্য সুন্দরের পথ প্রাপ্ত হয়, শাশ্বত মূল্যবোধ সম্পন্ন হয়। মানব জীবনে শিক্ষার এই অপরিহার্যতাকে আমরা উপলদ্ধি করতে পারি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্মরণীয় বাণী থেকে: “বিদ্বানের কলমের কালি, শহীদের রক্তের চেয়েও মূল্যবান।” কিংবা “মুসলিম নর-নারী প্রত্যেকের ওপর জ্ঞান অর্জন অবশ্য কর্তব্য।” মহাগ্রন্থ আল কোরআনের প্রথম নির্দেশই ছিল ‘ইকরা’ অর্থ্যাৎ ‘পড়’, (পড় তোমার প্রভুর নামে। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন) এই নির্দেশের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সরাসরি মানুষকে শিক্ষা অর্জন করতে বললেন। যে শিক্ষা উপকারী, কল্যাণময়, সত্য সুন্দরের পথে চলার সহায়ক; মূলত সেই শিক্ষা অর্জনের তাগিদ দেয়া হয়েছে কোরআন ও হাদীসে। ইবলিশ যাকে আমরা শয়তান বলে ডাকি, তার শিক্ষা তাকে বিপদগামী করেছে, বিভ্রান্ত করেছে। তার সারা জীবনের অর্জিত জ্ঞান-প্রজ্ঞা কোন কাজে আসল না। আবু জাহেলকে আরবের মানুষেরা আবুল হাকাম (অর্থাৎ বিজ্ঞদের পিতা) বলে জানতো। কিন্তু ওহী লদ্ধ জ্ঞান না থাকায় বা এ জ্ঞানকে ধারণ করার মানসিকতা না থাকায় ইসলাম পরবর্তী যুগে আবুল হাকামে সম্বোধিত হল আবু জাহেল বলে।

এদেশে মাদরাসা শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সাথে তালগোল পাকিয়ে যখন এ শিক্ষা ব্যবস্থার স্বকীয়তা সমূলে নষ্ট করার ব্যাপক যড়যন্ত্র চলছিল, মানুষ যখন দ্বীন ছেড়ে অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারে সদা লিপ্ত তখন মরহুম মাওঃ কোরবত আহমদ রহঃ সরকারী চাকুরীর ছেড়ে দিয়ে ১৯৬৯ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন আলোর বাতিঘর ঐতিহ্যবাহী “জামেয়া হোসাইনিয়া রহমতপুর (চেঙ্গাহাটা) মাদরাসা”।স্বাধীনতা উত্তরকালীন প্রতিষ্ঠিত এ মাদরাসারটির জন্য অবর্ণনীয় কষ্ট কসরত,ত্যাগ-তিতিক্ষা, ও পেরেশানি মরহুম মাওঃ কোরবত আহমদ রহঃ করে গেছেন।

মানুষের দরজায় বারে বারে কড়া নেড়েছেন।একসময় তৈরি করা ছোট্ট কুড়েঘরটির স্থলে আজ সারি সারি বহুতল ভবন ও পুর্ণাঙ্গ মসজিদ শোভা পাচ্ছে। বিশিষ্ট শিল্পপতি আলহাজ্ব হাবিবুর রহমান থেকে শুরু করে বহু গণ্যমান্য ও সাধারণ মানুষের শ্রম, ভালোবাসা,সাহায্য, সহযোগিতা, আন্তরিক পরামর্শ ও দোয়া মাদরাসাটিকে আজ মহান আল্লাহর খাস রহমতে এত দূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।হাজার হাজার শিশু কিশোরের পদচারণায় সিক্ত পুরো মাদরাসা অঙ্গন।মরহুম মাওঃ কোরবত আহমদ রহঃ মাদরাসার গুরুদায়িত্ব তাঁর মেজ সাহেবজাদা হযরত মাওঃ রুহুল আমিন( দাঃ বাঃ) হাতে অর্পিত করে যান।মোহতামিম হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

শিক্ষা দীক্ষা ও যোগ্যতায় মাওঃ রুহুল আমিন সাহেব কোন অংশে কমতি নেই।মাদরাসার আজকের খোলনচে পাল্টে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে অবদান এই মানুষটির।পিতার অর্পিত দায়িত্বকে যথাযতভাবে পালন করার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন ।নিজের সুখ-সাচ্ছন্দ্যকে
পায়ে দলিত মথিত করে দিন রাত ফানা করছেন, মাদরাসার উন্নয়ণের জন্য।এ হেদায়েতের আলোর বাতিঘরকে কেয়ামত তক সমুজ্জ্বল রাখার জন্য নিরন্তর কষ্ট কসরত ও বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন।নাওয়া খাওয়া ও পরিবার পরিজন ভুলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন।কখনো কখনো নিজে অনাহারে অর্ধাহারে থেকে গরীব অনাথ এতিম ছাত্র-শিক্ষকদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন।তবুও স্বীয় প্রচেষ্টা থেকে এক বিন্দু সরে আসেন নি।অসহায় এতিম গরিব ছাত্ররা যাতে দু’মুটো খেয়ে পড়ে দ্বীনের দাঈ হতে পারে সেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন।নিজের ছোট্ট বুকে গরীব অনাথ ও এতিমদের টেনে নিয়ে বিশাল বড় মনের পরিচয় দিয়ে পিতৃত্বের আদর স্নেহ অকাতরে বিলিয়ে যাচ্ছেন।

একজন মোহতামিম হয়েও অনাড়ম্বর সাদা মাটা ও বিনয়ী জীবন যাপন করছেন।জাগতিক লোভ লালসাকে তুচ্ছ করে,পরকালীন ভাবনা চিন্তাকে মরহুম পিতার মত প্রাধান্য দিয়েছেন।অতিরিক্ত প্রায় ৬০/৭০ জন এতিমের দায়িত্বভার বছর বছর কাঁধে তুলে নিয়েছেন।ওদের যেকোন ছোট্ট প্রয়োজনকেও গুরুত্বসহকারে পুরণ করার চেষ্টা করছেন।সরকারী অর্থ বরাদ্দ যেটুকু পান,সেটা অতি সামান্য।উল্লেখ করার মত নয়।প্রয়োজনের চাইতেও অপ্রতুল।বিশাল ব্যয় বুহুল খরচ সামলাতে তাকে নিত্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে।প্রায় পুরো বাংলাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন।আলোর বাতিঘর এই জামেয়াকে ঘিরে মোহতামিম মাওঃ রুহুল আমিন সাহেবের অনেক স্বপ্ন।দু’চোখ ভরে তিনি স্বপ্ন দেখেন।তাঁর বুক ছিড়ে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাস আমি হৃদয় দিয়ে শুনতে পাই।

এক প্রশ্নের জবাবে, তিনি বলেন- “যুগোপযোগী মান সম্মত ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে ক্রমান্বয়ে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত ক্লাস চালু, বাধ্যতামুলক কম্পিউটার শিক্ষা, এবং পুরো মাদরাসাকে সিসি ক্যামেরার আওতাধীন এনে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার বলয় তৈরি করা।
পাশাপাশি এলাকার সকল মাদরাসায় তা’লীম ও তরবিয়তের উন্নয়ণে মাঝে মধ্যে সভা সেমিনার কিংবা ইসলাহী জোড় করা।”
ইনশাল্লাহ একদিন হয়তো তাঁর এ স্বপ্নও পুরণ হবে।কারণ খোদা তা’য়ালার খাস রহমত ও বরকত মাদরাসাটিকে বেষ্টনী করে রেখেছে।দেশ বিদেশের অনেক আল্লাহর অলি, পীর মাশায়েখ ও বুজুর্গানের পায়ের ধুলো পড়েছে এ জামেয়ায়।

এ জামেয়ার বুক ছিড়ে বের হয়েছে,হাজার হাজার হীরের টুকরো,দ্বীনের দাঈ ও রাহবার।যাঁরা কোরআন – হাদিসের আলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে গোটা বিশ্বময়।অত্র এলাকার কৃতি সন্তান মুফতি আব্দুস সালামসহ নাম উল্লেখযোগ্য অনেক প্রবীণ ও নবীন জামেয়া হোসাইনিয়া রহমতপুর (চেঙ্গাহাটা) মাদরাসার ছাত্র।যাঁরা আজ দেশে বিদেশে অত্যন্ত সুনামের সহিত দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত আছেন।
সকলের আন্তরিক দোয়া,সাহায্য সহযোগীতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অত্র জামেয়া কেয়ামত পর্যন্ত নিঃসন্দেহে জারি থাকবে।
পাশাপাশি মোহতামিম মাওঃ রুহুল আমিন সাহেবের নিরলস শ্রম,নিরন্তর কর্মস্পৃহা,যোগ্য দিক নির্দেশনা ও অধ্যবসায় অত্র জামেয়াকে উত্তরোত্তর সম্মৃদ্ধি ও মনজিলে মাকসাদ পর্যন্ত পৌঁছে দিবে।রহমত আর বরকতের অমিয় ফল্গুধারা আশেপাশের দৃষ্টিসীমানা পর্যন্ত গোটা জনপদকে কেয়ামত পর্যন্ত ঘিরে রাখবে।

লেখকঃমুহাম্মদ কামাল হোসেন
গল্পকার,ছড়াকার,প্রাবন্ধিক,গবেষক ও কলাম লেখক
ছোটশরীফপুর,কুমিল্লা

বাংলাদেশ সময়: ১২৪৪ ঘণ্টা, ০৬ এপ্রিল ২০১৭
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এসডিএম

শেয়ার করুন