ঢাকায় চলবে শুধু ১২ কোম্পানির বাস

প্রতীকী ছবি

ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে যানজটসহ জনদুর্ভোগ কমাতে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য ঢাকা মহানগরী এবং এর আশপাশের এলাকায় পরিবহন সেক্টরের উন্নয়নে বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। শহরের ভেতরে যাতায়াত ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনারও ইঙ্গিত দেন তিনি। এ ছাড়া মহানগরীর ভেতরে জনসাধারণের নির্বিঘ্নে প্রবেশ এবং বহির্গমনের পথ আরও সহজ করতে বলেছেন। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে ২০২১ সালের আগে অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তা ছাড়া নগর পরিবহন খাতের উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্প এবং পরিকল্পনাধীন উদ্যোগের বাস্তবায়ন, চ্যালেঞ্জ এবং এগুলোর বাস্তবায়ন পরবর্তী প্রভাব মাথায় রেখে সংশ্লিষ্টদের কাজ করতে বলা হয়েছে। পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে নগরীর বাস সার্ভিসের আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাবেও সায় দিয়েছেন তিনি।

‘ঢাকা শহরের পরিবহন যোগাযোগ’বিষয়ক পর্যালোচনাসভায় এসব দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ বৈঠক হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চামেলী হলে। ৩ ঘণ্টাব্যাপী ওই সভায় সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌ পরিবহন, রেলপথ, স্থানীয় সরকার, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, মেয়র, সচিব ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পর্যালোচনাসভার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ঢাকার পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এরপর প্রায় ১২টি প্রকল্পের পাওয়ার প্রেজেন্টশন উত্থাপন করা হয়। প্রেজেন্টেশনকালে প্রকল্পের রুট, বর্তমান অবস্থা, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ এবং বাস্তবায়ন পরবর্তী প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানেও বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোথাও সমস্যার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে এর সমাধানের পথও বাতলে দেন। ওই বৈঠকে উপস্থিত একাধিক মন্ত্রী ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আভাস মিলেছে পরিবহন সেক্টরের উন্নয়নে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকে নগর পরিবহনের বিশৃঙ্খলা এবং এর সমাধানের পথ নিয়ে পাওয়ার প্রেজেন্টশন দেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র। বর্তমানে ঢাকা নগরীতে চলাচলরত বাসের অসম প্রতিযোগিতা ঠেকাতে কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে বাস সার্ভিস ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বলা হয়, এতে যাত্রী ওঠানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে না। একে বলা হয় বাস রুট রেশনাইলেজেশন অপারেশন। এ ধারণাপত্রে বলা হয়Ñ একেক কোম্পানির বাস একটি নির্দিষ্ট রুটে চলবে। এভাবে ওই কোম্পানির মোট আয় বিবেচ্য হবে; কোনো নির্দিষ্ট বাসের মাধ্যমে নয়। ফলে কোনো বাসে যাত্রী কম থাকলে এর দায় ওই বাসকর্মীর ওপর বর্তাবে না। তাদের সবার বেতন হবে মাসিকভিত্তিতে কোম্পানির মাধ্যমে। তাই উন্নতমানের যাত্রী সেবার জন্য ৪ হাজার বাস চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাসগুলো ভর্তুকি হিসেবে কিনে নেবে সরকার। তাতে কোনো বাস ব্যবসায়ী আর্থিক ক্ষতির শিকার হবেন না। প্রয়োজনে এসব বাস ঢাকার বাইরে চালানো যেতে পারে।

একাধিক কর্মকর্তা জানান, পরিবহন সেক্টরের উন্নয়নের স্বার্থে এ প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিআরটিএর হিসাবে বর্তমানে ঢাকা শহরে ১৫৯টি কোম্পানির গাড়ি চলাচল করে। এর মধ্যে বাস ৪ হাজার ৯৩৭টি এবং মিনিবাস রয়েছে ২ হাজার ৮২৯টি। ৩২০টি রুটের মধ্যে ১৮০ থেকে ১৯০টি রুট সচল রয়েছে। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ঢাকা শহরে বাস কোম্পানির সংখ্যা হতে পারে সর্বোচ্চ ১০-১২টি। এতে বিনিয়োগ করবেন বড় ব্যবসায়ীরা।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা শহরের যানজট কমাতে ঢাকা সার্কুলার রুট চালুর অগ্রগতি তুলে ধরা হয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে। ঢাকা মহানগরীর চারপাশে ৯১ কিলোমিটার বৃত্তাকার রুট নির্মাণের মহাপরিকল্পনা আছে। এ রুটের দুটি অংশ। একটি ইস্টার্ন বাইপাস অপরটি হচ্ছে ঢাকা সার্কুলার রুট (বৃত্তাকার সড়কপথ)। বাইপাস নির্মাণ করবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। অবশিষ্ট ৬৩ কিলোমিটার বৃত্তাকার সড়কপথ নির্মাণ করবে সওজ। এর সঙ্গে থাকবে রেলপথও। নৌপথ চালু করছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে বালু নদীর পাশ দিয়ে তেরমুখ থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণ করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সার্কুলার রুটে সড়ক ও রেলের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। সড়কের মাঝখানে ৫ মিটার ডিভাইডার রাখার কথাও বলেছেন তিনি। সেই ডিভাইডারে এলিভেটেড রেলপথ নির্মাণে প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ইস্টার্ন বাইপাস অংশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এমনভাবে নির্মাণ করতে বলা হয়েছে, যাতে করে শহরে পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে।
সভায় একাধিক ডিজাইনের ধারণাপত্র উপস্থাপন করা হলে প্রাথমিকভাবে লোয়ার ডেকে ট্রেন এবং আপার ডেকে গাড়ি চলাচলের উপযোগী করে স্থায়ী কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সূত্র আরও জানায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু এবং শেষ করার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পদ্মা রেল সংযোগের অর্থায়ন জটিলতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ইআরডিকে বলেছেন দ্রুত ঋণচুক্তির ব্যপারে ব্যবস্থা নিতে। আর চীনের ঋণে ব্যাপারে অনেক প্রকল্প একসঙ্গে নেগোসিয়েশন না করে একটি করে নেগোসিয়েট করতে বলেছেন। তা ছাড়া আগে অগ্রাধিকার প্রকল্প পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের ব্যপারে ব্যবস্থা নিতে ইআরডিকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় রেলকে বলেছেন বাস্তব কাজে পদক্ষেপ নিতে।
এদিকে উন্নয়ন কাজে পিছিয়ে পড়া ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকের উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, চুক্তি সইয়ের ছয় বছরেও এ প্রকল্পের মূল কাজ পুরোদমে শুরু করতে পারেনি ইটাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। অথচ জমি কেনা, পুনর্বাসন ও বেতন-ভাতার পেছনে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছে সরকার। এ খাতে আরও ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। অর্থায়নের অভাবে এ প্রকল্পের কাজ করতে পারছে না চুক্তিবদ্ধ বিনিয়োগকারী। এ ছাড়া আর্থিক বিনিয়োগে সিআইজিএফের (চায়না ইনভেস্টমেন্ট গ্লোবাল ফাউন্ডেশন) সঙ্গে গত ২২ ডিসেম্বর ঋণচুক্তিও করেছে বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি; তবু অগ্রগতি নেই। বর্তমানে প্রকল্পের ফেজ-১ এর পাইলিং ওয়ার্ক শেষ পর্যায়ে। ফেজ-২ এর ইউটিলিটি রি-অ্যালোকেশন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ফেজ-৩ এ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কীভাবে হবে এ নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। হানিফ ফ্লাইওভার কীভাবে অতিক্রম করবে; কুতুবখালী নামার পর ট্রাফিক কীভাবে ডিসবার্স হবেÑ এসব বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ ডিজাইন তৈরি করে পরে উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়ক প্রসঙ্গে সভায় বলা হয়, এটি নির্মাণ হবে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া হয়ে ইপিজেড পর্যন্ত। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন শেষে এটি এখন কমার্শিয়াল চুক্তির অপেক্ষায় আছে। প্রকল্পের এলাইনমেন্ট উপস্থাপন করা হয় ওই সভায়। আর শান্তিনগর-ঝিলমিল প্রকল্প নিয়ে উত্থাপিত প্রেজেন্টশনের মাধ্যমে ফ্লাইওভারটির শুরু এবং শেষ সম্পর্কিত ধারণা দেওয়া হয়। রাজধানীর ফকিরাপুল থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল (চুনকুটিয়া) পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে চায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান বুড়িগঙ্গা (বাবুবাজার) ব্রিজের ওপর দিয়ে একটি ‘ক্যাবল স্টেইড ব্রিজ’ নির্মাণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, ব্রিজ নির্মাণ করলেও কোনো পিলার যেন নদীতে না পড়ে। তা ছাড়া ফ্লাইওভারটির এন্ডিং পয়েন্ট চুনকুটিয়া ইন্টারসেকশন থেকে কিছু দূরে রাখার পরামর্শ দেন তিনি। যাতে করে সেখানে যান চলাচলে বিঘ্ন  না ঘটে।

ঢাকার পরিবহন নিয়ে আয়োজিত সভায় গুলশান-বনানী লেক প্রকল্প নিয়ে দিকনির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে স্থানীয় জনসাধারণকে নিয়ে স্বল্প পরিসরে দুই পাড়ে লেকের উন্নয়ন, রাস্তা নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সমস্যা হচ্ছে চেয়ারম্যানবাড়িসহ ৩টি পয়েন্ট থেকে লেকে পয়োবর্জ্য যায়। এর মধ্যে বাসাবাড়ির বর্জ্যও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের উদ্যোগ নিতে। প্রয়োজনে ঢাকা ওয়াসার স্যুয়ারেজ লাইনের সঙ্গে সংযোগ দেওয়ার ব্যপারটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ লেকের উন্নয়নে আরও যাচাইপূর্বক ব্যবস্থা নিতে বলেন। খবর আমাদের সময়।

বাংলাদেশ সময়: ১০০৫ ঘণ্টা, ১৯ মে ২০১৭

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস

শেয়ার করুন