মনিরুল ইসলামকে নিয়ে সানী সানোয়ারের স্মৃতিচারণমূলক লেখা

সানী সানোয়ার    
ঢাকার একটি লোমহর্ষক খুনের ঘটনার মূল অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কোনভাবেই সে তার দোষ স্বীকার করছে না। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ঘটনার সময় সে শুধু কক্সবাজার চলে যাচ্ছে। অথচ ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতির একাধিক প্রমাণ তখন আমাদের হাতে।

যাহোক, আমাদের সকলের প্রায় নাস্তানাবুদ অবস্থা। তাই কৌশলগত কারণে জিজ্ঞাসাবাদে বিরতি দিলাম। এতে সে কিছুক্ষণ খুব খোশ মেজাজে বসে রইল। আমি ভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।

-স্যার, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?
-কর
-স্যার, আপনাদের একজন বড় স্যার আছেন না যাকে টিভিতে খুব দেখায়, সব সময় মুখে একটু হাসি রেখে কথা বলেন, ওনি কি এই অফিসে বসেন?
এবার ওর মুখের দিকে একটু তাকালাম। ওর ঠোঁটের আগায় লেগে থাকা হাসিটা দেখে আমি খুব মজা পেলাম।
-কেন? সেটা জেনে তোর কি হবে?
-আমাকে কি একটু সেই স্যারের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিবেন?
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার তাকানো দেখে সে একটু লজ্জাই পেল। লজ্জাবনত কন্ঠে বলল,
-স্যার, ওনার সাথে একটু কথা বলার সুযোগ পেলে আপনাদেরই লাভ হত।
আমি ওর ইঙ্গিত বুঝতে পারলাম। তাই তৎক্ষণাৎ চেয়ার থেকে উঠে পরলাম।
কিছুক্ষণ পরের ঘটনা….
মনির স্যারের রুমে তাকে প্রবেশ করানো হল। বাকী সবাইকে রুম থেকে চলে যেতে বলা হল কিছুটা প্রাইভেসি সৃষ্টি করার জন্য।
মনির স্যার সেই প্রাণবন্ত হাসিমাখা মুখে জিজ্ঞাসা করলেন,
-কি রে, কেমন আছিস?
-আছি স্যার। কপালে যেরকম থাকার কথা ছিল সেরকমই আছি।
কথাটা বলেই সে নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার চোখগুলো তখন টলমল করছিল। ভয় আর কান্না জড়িত কন্ঠে সে বলল,
-স্যার, একটা কথা বলার জন্য আপনার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলাম। আমার বাচ্চার কসম আমি সব বলে দিব। আমারে খালি কথা দেন ওরা আমার পরিবারের কোন ক্ষতি করবে না। এই দায়িত্বটা খালি আপনি নেন, স্যার।
আশার আলো দেখতে পেয়ে খুশী হলাম।
মনির স্যার আমার দিকে একবার তাকালেন, তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-তোর পরিবারের সিকিউরিটির দায়িত্ব আমরা নিলাম। আমি কথা দিচ্ছি কেউ কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
মনে হল সে আশ্বস্ত হল। অত:পর সে যা যা বলতে শুরু করল তা আজও ইতিহাস। তার এক-দেড় ঘন্টা দীর্ঘ জবানবন্দীতে পুরো ঘটনাটি সুন্দরভাবে বের হয়ে এলো, যা আমাদের পূর্বে সংগৃহীত তথ্যের সাথে হুবহুব মিলে গেল।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হল এবং একে একে সব সহযোগী খুনীরা গ্রেফতার হতে থাকল। সেই সাথে নির্দেশদাতাও গ্রেফতার হল। উদ্ধার হল খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রও।

পাঁচ বছর পর গত পরশু সেই খুনের মামলাটির রায় হয়েছে। ছয় জনের ফাঁসি এবং দুই জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করেছে নিম্ন আদালত। এই রায়কে কেন্দ্র করেই আজকের এই স্মৃতিচারণমূলক লেখা। যে মানুষটির গুণে এরকম হাজারও ঘটনার শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে তাকে নিয়ে দু’কলম না লিখলেই নয়।

মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা আর আইনী ক্ষমতাও যেখানে নিষ্প্রভ সেখানে কিন্তু শুধুমাত্র ব্যক্তিত্বও নক্ষত্রের মত দীপ্তিমান থাকে। যদিও Monirul Islam স্যারের দখলে উপরের পাঁচটি গুণই রয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে গোয়েন্দা বিভাগের হালধরা পুলিশের এই আইকনিক অফিসার তার মেধা, একাগ্রতা আর মানবীয় গুণাবলী দিয়ে মানুষের নিরাপত্তার জন্য যতগুলো ছোটবড় অবদান রেখেছেন তা এককভাবে হয়তো খুব কম পুলিশ অফিসারের পক্ষেই অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। তার সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো এবং আসমানসম স্নেহের ছায়ায় আমরা প্রাশান্তি নিয়ে কাজ করি।

একজন দক্ষ এবং মানবীয় গুনাবলী সম্পন্ন পুলিশ অফিসার হওয়ার জন্য আমরা তাকেই অনুকরণ করি। আল্লাহ তার মঙ্গল করুন।

লেখকঃ সানী সানোয়ার
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার

বাংলাদেশ সময়: ১৬৪৫ ঘণ্টা, ১৮ মে ২০১৭
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এসডিএম

শেয়ার করুন