তবে কি বাংলা শুধু নিরক্ষর আর টিভিবিহীন চাষাভুষার ভাষা হয়ে থাকবে?

সানী সানোয়ার
পাশের বাসার এক ছোট্ট শিশু ছাদে খেলাধুলা করছে। এমন সময় ফুলের টবের চিপা থেকে কি যেন একটা বের হয়ে দৌড় দিল। ছোট বাচ্চাটি সেটা দেখে ভয়ে আঁতকে উঠল,

-চুহা চুহা …… বাবা, চুহা…..।
শিশুটির বাবা দৌড়ে তার কাছে ছুটে গিয়ে তাকে বুকে চেপে ধরল-
-চুহা তো অনেক ছোট্ট, তুমি অন্নেক বড়। চুহা তোমাকে দেখে সে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে। তুমি ভয় পাবে কেন, বাবা?
এবার ধীরে ধীরে বাচ্চাটির কান্না থেমে গেল। বাবার কথায় সে সাহস পেল এবং সম্মানিতবোধ করল।
আমি সেই সুইট বাবাকে বললাম,
-আচ্ছা ভাই, ‘চুহা’ কি?
-হাহাহাহাহ….. আপনিও চুহা বুঝেন নাই? চুহা মানে হচ্ছে ইঁদুর। হিন্দী শব্দ।
-আপনিও তাহলে হিন্দী জানেন? আবার এই ছোট্ট বাবুকেও শিখিয়েছেন?
-না রে ভাই, আমি জানি না। ঘরে একদিন ইঁদুর দেখে এভাবে ভয় পেয়েছিল সে। সেদিনই ওর মা’র কাছ থেকে অর্থটা জানলাম।
-অহ। তাহলে বাবুকে শিখালো কে?
– হিন্দী আবার কেউ শেখায় নাকি? কার্টুন ছবির বদৌলতে শিখে নিচ্ছে।
-মাই গড! কি বলেন? এই অবস্থা?

আমি আমার ঘরে গিয়ে মজা করে সবাইকে ঘটনাটি বললাম। উত্তরে যা পেলাম তা আরও ভয়াবহ। আমার বাসার সবাই ‘চুহা’র অর্থ জানে। শুধু আমিই জানি না। আমার এইরূপ মূর্খতা দেখে বাসার সবাই আমার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসছিল যে, আমি লজ্জাই পেয়ে গেলাম। এমনিতেই তারা আমার হিন্দী জ্ঞান নিয়ে খুব মজা করে, তার উপর পরে গেছে ঢোলের বাড়ি। তাই আর যাই কোথায়!

কথা হচ্ছে, হিন্দী বা উর্দু বা ইংরেজী শেখায় কোন দোষ দেখি না। যেকোন ভাষা শেখা মানেই জ্ঞানের পরিধি বেড়ে যাওয়া। ভাষাটা হিন্দী বলেই যে নিন্দা করব তা নয়। কেননা, যত প্রকারের ভাষা জানবো ততই সুবিধা। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। ঐ শিশু বাচ্চাটি ভয় পেয়ে আঁতকে উঠে তার অন্তরে গেঁথে যাওয়া শব্দটিই উচ্চারণ করল। সেখানে বাংলায় ‘ইঁদুরের’ কোন ঠাঁই হয়নি। ঠাঁই করে নিয়েছে হিন্দী।

দু:খ, ভয় আর কষ্টে আমরা ‘অ… মা-গো’ বলে চিকৎকার দেই। একটু শিক্ষিত হলে বলি ‘অহ মাই গড’। এখন সেখানে চুপিসারে হিন্দীও ঢুকে যাচ্ছে।

বিদ্যালয়ে গিয়ে ইংরেজী আর টিভি দেখে যদি হিন্দী গেঁথে যায়, তবে কি বাংলা শুধু নিরক্ষর আর টিভিবিহীন চাষাভুষার ভাষা হয়ে থাকবে?

সবার নজর তো এখন ব্যবসার দিকে, জঙ্গির দিকে। শিশুদের দিকে নজর কার? মোবাইল, ট্যাবে ব্যস্ত শিশু কি সুন্দর খেলে! ডিস্টার্ব করে না। ব্যস, কাজ সাবাড়! দু’দিন পরেই ‘চুহা’।

আচ্ছা, ডোরেমন’ আর ‘মটু-পাতলু’র মত কার্টুন বানানো কি এটম বোমের থেকেও কঠিন? ৩/৪ কোটি বাচ্চাকাচ্চার জন্য দেশীয় আদলে একটা ‘সুপার হিরো’ টাইপ কার্টুন কি আমরা বানাতে পারছি না? এত পোলাপাইন কম্পিউটার, এনিমেশন, মিডিয়া.. . নিয়ে লেখাপড়া করছে। তাদেরকে কি আমরা ইউটিলাইজ করতে পারছি না? নাকি ব্যবসা শুধু ঢেউ টিন আর গার্মেন্টস-এ? কার্টুন কিংবা বিগ বাজেটের সিরিয়াল বানানো আবার কেমন ব্যবসা?!!!

আমরা ‘সুলতান সুলেমান’ ঠেকাতে প্রেসক্লাবে গিয়ে মানব বন্ধন করছি। অথচ, সেখানে গিয়ে যারা দাঁড়িয়েছেন তারাই সুলতান সুলেমানের মত দেশীয় আদলে ‘ঈশা খাঁ’, ‘শ্রীফলতলীর জমিদার’…. নিয়ে চমৎকার কিছু সিরিয়াল বানাতে পারতেন। আর এটা নিয়ে মানব বন্ধন হতে পারত ‘তুরস্কে’।

অনেকেই তো সেই মানব বন্ধনের পর থেকে ‘সুলতান সুলেমান’ দেখা শুরু করেছে। কারণ এই প্রতিবাদের আগে তারা নাকি এটার নামই শুনেনি। প্রতিবাদকারীরা এই সিরিয়ালটির নেগেটিভ প্রমোশন করতে গিয়ে মনের অজান্তে পজিটিভ প্রমোশন করে বসে আছেন।

সৃষ্টিশীলতার কাছে মাইর খেয়ে আমাদের মিডিয়াকে আজ মানব বন্ধন করতে হচ্ছে। অথচ, ইন্ডিয়ান হিন্দী সিরিয়াল এখন পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশে জনপ্রিয়। আলবেনীয়ার এক পুলিশ বন্ধু বলল, তার মা আর বোন নাকি ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের পোকা।

দোষ মিডিয়া কর্মীদের নয়, দোষ বাজেটের। ‘নিজস্ব সংস্কৃতি বান্ধব’ শিল্পকর্মে উৎসাহ, বিনিয়োগ আর বিপনন যথাযথ না হলে বাধ্য হয়ে তো প্রেসক্লাবে যেতেই হবে। আমি তাদের পক্ষেই আছি।

যাহোক, সার্বিক অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক নয়। ‘৫২-তে ভাষা এসেছে আর ২০১৭-তে এসেছে ‘চুহা’। জিন্নাহকে ঠেকাতে পেরেছি কিন্তু গান্ধীজীকে ঠেকাতে পারছি না। ‘৫২-তে রক্ত দিয়েছি, এখন দিব কি? জীবন আর রক্তের বিনিময় প্রথা এখন আর নাই। এসব দিয়ে আর ভাষা বাঁচানোর দিন নাই। এখন শুধুই মেধা, দেশপ্রেম আর কৌশল খাটাতে হবে।

মিডিয়া শুধু গ্ল্যামারের জগত না, মেধার জগতও বটে। আসুন আগে কার্টুন বানিয়ে বাচ্চাদের সেইভ করি, পরে বাচ্চার মা-খালাদের। সবাই তো খালি মামা-খালাদের নিয়েই পরে আছি। বাচ্চাদের নিয়ে ক’জন ভাবছি।
বাচ্চাদের খেলনা পর্যন্ত বানাতে পারছি না। অথচ নিজেদের ফ্রিজ নিজেরাই নাকি বানাচ্ছি। আবার গাড়ীর ফ্যাক্টরিও হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাচ্চাদের খেলনা চাপ দিলেই বেজে উঠছে চাইনিজ গান। হাহাহাহ…. লে হালুয়া। এবার ‘চাইনিজ’ ভাষা ঠেকাবো ক্যাম্নে?

আত্মসমালোচনায় কোন গ্লানি নেই। তাই সাত-সকালে একটু ঝেড়ে নিলাম। আমি নিজেও কোন না কোন ভাবে দায়ী। তাই, প্রজন্মের কাছে ১৫-২০ বছর আগেই অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিলাম। মাফ করে দিস ‘নাতীনাতকুর’!

লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে সংগ্রহীত

বাংলাদেশ সময় ১২৩০ ঘণ্টা, ২০ এপ্রিল, ২০১৭

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস

শেয়ার করুন