মোমিনের পহেলা বৈশাখ

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
বছর পেরিয়ে আবার এসেছে পহেলা বৈশাখ। শুরু হচ্ছে ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। পহেলা বৈশাখ জাতীয় ছুটির দিন। এ দিনটি একজন মোমিনের ভাবনা কেমন হওয়া উচিত দেখা যাক।

এক. আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সুনির্দিষ্ট একটি সময়কাল দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। এ সময়কালের কোনো হেরফের বা কমবেশি হয় না। যার জন্য যতটুকু সময় নির্ধারিত ততটুকু ফুরিয়ে গেলেই জীবন সমাপ্ত হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু যখন কারও নির্ধারিত সময়কাল উপস্থিত হবে তখন আল্লাহ তাকে কিছুতেই অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কিছুই করো আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা মুনাফিকুন : ১১)। কাজেই একেকটি বছরের আগমন মানুষকে তার নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি করে দেয়। মৃত্যুর নিকটবর্তী করে দেয়। নতুন বছরের সূচনায় ঈমানদার ব্যক্তি শুধু বল্গাহীন উল্লাস নয় বরং মৃত্যুকে স্মরণ করে পরকালীন জীবনের প্রস্তুতি নেবে এমনটিই বেশি প্রত্যাশিত।

দুই. মহান আল্লাহর কাছে আগামী নতুন বছরের জন্য সুখ, শান্তি, সফলতা এবং ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ ও মঙ্গল প্রার্থনা করা যেতে পারে। কারণ অন্য কিছু বা অন্য কেউ নয়, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই বান্দার সুখ, শান্তি, সফলতা, কল্যাণ ও মঙ্গল প্রদানকারী। আল্লাহ বলেন, ‘আমি কি তাঁর (আল্লাহর) পরিবর্তে অন্যদেরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করব? করুণাময় যদি আমাকে কষ্টে নিপতিত করতে চান, তবে তাদের সুপারিশ আমার কোনোই কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে রক্ষাও করতে পারবে না। এরূপ করলে আমি প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হব।’ (সূরা ইয়াসিন : ২৩-২৪)।

তিন. আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি ও মনের ভাব প্রকাশ করি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আমরা বাঙালি। সব ভাষাই মহান আল্লাহ তায়ালার দান। যে কোনো ভাষায় আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করা যায়। আল্লাহ শোনেন, বোঝেন এবং সে প্রার্থনা কবুল করেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশম-লী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই অনেক নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা আর-রুম : ২২)।

ভাষা কোনো ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে ধর্ম তার নিদর্শনাবলি প্রকাশ এবং উপাসনার মাধ্যম হিসেবে একটি ভাষাকে গ্রহণ করে। যেটি সে ধর্মের দাফতরিক ভাষা। যেমন ইসলাম ধর্মের দাফতরিক ভাষা আরবি। আরবি ভাষায় কোরআন মজিদ অবতীর্ণ হয়েছে। মহানবী (সা.) আরবিভাষী ছিলেন বিধায় তাঁর কথা, কাজ ও সম্মতি যা হাদিস হিসেবে পরিচিত সেটিও আরবি ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। এভাবে বাংলা ভাষাও কোনো ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং বাংলাভাষী মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই বাঙালি। বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান বাংলাভাষী সব বাঙালির। এটি বিশেষ কোনো ধর্মের অনুষ্ঠান নয়। কাজেই নববর্ষ উদযাপন করতে কোনো ধর্মের প্রতীক বা পদ্ধতির ব্যবহার নিঃসন্দেহে এ অনুষ্ঠানের সর্বজনীনতাকে নষ্ট করে সংকীর্ণতায় পৌঁছে দেবে।

চার. পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আমরা যা কিছু খেতে চাই বা খাবার আয়োজন করি, তাতে দুইটি বিষয় লক্ষণীয়।
প্রথমত, খাবারে লৌকিকতা ও অপচয়-অপব্যয় যেন না হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর আহার করবে ও পান করবে। কিন্তু অপব্যয় করবে না। তিনি অপব্যয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা আরাফ : ৩১)। অন্যত্র বলেন, ‘আর কিছুতেই অপব্যয় করবে না। যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৬-২৭)।

দ্বিতীয়ত, শুধু নিজেদের নিয়েই যেন ব্যস্ত থাকা না হয়। বরং আমরা যা খাচ্ছি বা খাবার আয়োজন করছিÑ প্রতিবেশী, সমাজের মিসকিন, এতিম ও বঞ্চিতদের ব্যাপারেও ভাবতে হবে। আমাদের পছন্দনীয় বিষয় তাদের পর্যন্ত পৌঁছানোর দায়িত্ব নিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা দুনিয়ার জীবনে খাদ্যদ্রব্যের প্রতি নিজেদের প্রয়োজন আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের আহার প্রদান করে।’ (সূরা দাহর : ৮)। রাসুল (সা.) বলেন, কোনো লোকই মোমিন হতে পারবে না যে পর্যন্ত সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

পাঁচ. বাংলা বর্ষ গণনা মূলত আরবি বা হিজরি বর্ষ থেকেই উৎপত্তি হয়েছে। দিল্লির বাদশাহ আকবর (১৫৪২-১৬০৫ খ্রি.) কৃষকদের কাছ থেকে কর নেয়ার সুবিধার জন্য শস্য উৎপাদনের সময়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে এ সাল গণনার সূচনা করেন। সে সময় থেকে প্রাচীন বাংলার অধিবাসীরা বিশেষ করে কৃষক শ্রেণী এই বর্ষ গণনা এবং ব্যবহার করায় একে বাংলা বর্ষ হিসেবে অবিহিত করা হয়। বাদশাহ আকবর সমকালীন বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ আমির ফাতুল্লাহ শিরাজিকে আরবি চন্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার নির্দেশ দেন। ফাতুল্লাহ শিরাজির সুপারিশে পারস্যে প্রচলিত সৌর বর্ষপঞ্জির অনুকরণে ৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বাদশাহ আকবর হিজরি-সৌর বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেন। তবে তিনি তার সিংহাসনে আরোহণের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন।

এ জন্য হিজরি ৯৬৩ থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। তাই বলা যায়, বাংলা সালের উৎসমূল আরবি বা হিজরি বর্ষ। আর হিজরি বর্ষের প্রচলন করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)। রাসুল (সা.) এর মদিনায় হিজরতের সময় থেকে এ বর্ষ গণনা শুরু করা হয়। কারণ, হিজরতের মাধ্যমেই শুরু হয় ইসলামের মূল জয়গান। কাজেই মোমিনের ভাবনায় নতুন বছরের সূচনা তথা পহেলা বৈশাখ কেবল আনন্দ নয়, মূলে ফেরার আবেদন নিয়েই হাজির হয়। এর উদযাপনেও তাই এ চেতনার প্রতি লক্ষ্য রাখা কর্তব্য।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ সময় ১৩০০ ঘণ্টা, ১৩ এপ্রিল, ২০১৭

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস

শেয়ার করুন