বাংলাদেশে স্থানান্তর হচ্ছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান

পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে চামড়া খাতে ব্যবসা শুরু করে ফরিদা গ্রুপ। গত বছর ঢাকায় আয়োজিত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রদর্শনী উপলক্ষে বাংলাদেশে আসেন গ্রুপটির প্রতিনিধিরা। সে সময় তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের দু-একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আলোচনাও চলছে। সবকিছু ঠিকমতো হলে বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তর করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে বাংলাদেশের পোশাক খাতে অনেক আগে থেকেই ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা ছিল। কারখানার মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা ও বায়িং হাউজের মাধ্যমেই এ খাতে তাদের আনাগোনা শুরু হয়। বর্তমানে পোশাক খাতে প্রায় ২০০ ভারতীয় বায়িং হাউজ বাংলাদেশে রয়েছে। এসব বায়িং হাউজের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অনেকে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট পোশাক কারখানার অংশীদারিত্ব কিনে নিয়েছেন। এছাড়া সরাসরি পোশাক কারখানার অংশীদারিত্ব কেনার ঘটনাও ঘটেছে গত কয়েক বছরে। আবার অনেকে ভারতে ইউনিট বন্ধ করে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তর করছেন।

এভাবে বাংলাদেশের পোশাক ও চামড়া খাতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের খাত-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। অনুরূপ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ইকোনমিক ডিভিশনের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্সের একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনেও।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘ইকোনমিক সার্ভে ২০১৬-১৭’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজুরির উচ্চহারের কারণে পোশাক, চামড়া ও পাদুকা খাত থেকে সরে আসছে চীন। ভারতের অনেক রাজ্যেই মজুরি হার কম হলেও এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না ভারত। এর বিপরীতে পোশাক খাতে নিজেদের অবস্থান দ্রুতগতিতে শক্তিশালী করছে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম। আবার চামড়া ও ফুটওয়্যারের বাজার তৈরিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া। এদিকে ভারতীয় পোশাক ও চামড়া প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে স্থানান্তর হচ্ছে। এ তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মিয়ানমার ও ইথিওপিয়া।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে জানতে পেরেছি। যদিও বাংলাদেশের পোশাক খাতে বিদেশী বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। বিদেশী বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য। কিন্তু পোশাক খাতের দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিসহ সব ধরনের দক্ষতা প্রমাণিত। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত করা প্রয়োজন। কারণ ভারতসহ অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের পোশাক খাতের বাণিজ্যিক সুবিধা যেমন— ব্যাক টু ব্যাক এলসি, বন্ড ফ্যাসিলিটির মতো সুযোগ কাজে লাগিয়ে মুনাফা করতে চাইছে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তাদেরই এগিয়ে থাকা উচিত।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্যমতে, সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে যৌথ ও বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থাপিত কারখানা প্রায় ১৫০। এর মধ্যে বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানায় শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি, যার বেশির ভাগই চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার। আবার বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৯৩টি ইউনিট শতভাগ বা যৌথ বিনিয়োগে স্থাপিত, যার ৬৯টি যৌথ বিনিয়োগ। এ খাতে ভারতীয় শতভাগ ও যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে ১২টি ইউনিটে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন অনেক ভারতীয় প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে। এছাড়া কিছু কারখানা কিনে নেয়ার প্রক্রিয়ায়ও রয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।

পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিজ স্বার্থ সংরক্ষণে সব দেশই সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ভারত বা অন্য কোনো দেশ বাংলাদেশের কোনো টেকনিক্যাল কর্মকর্তাকে নিজেদের কারখানায় কাজে নেয় না। এমন মানসিকতা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের দেখানো প্রয়োজন হলেও এক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মূর্শেদী বলেন, বহু প্রতিষ্ঠান ভারতীয়দের কাছে শেয়ার ছেড়ে দিয়েছে। রানা প্লাজা-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বায়িং হাউজের সঙ্গে যুক্ত অনেক মাঝারি কারখানা মালিকানা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এখন এ সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেছে। এ অবস্থায় পোশাক খাতে দেশীয় বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

এদিকে চামড়া ও ফুটওয়্যার শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। এরই মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন। এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন। এখনো বড় ধরনের যৌথ বা শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগ না এলেও গত বছর পাঁচ-ছয়টি বায়িং হাউজ চালু হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, বিশেষত ফুটওয়্যার রফতানি শুরু করেছে।

লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল মোনেম ভুইয়া বলেন, আমাদের খাতে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টায় ক্রেতারা আসেন। খাতের প্রযুক্তিগত উন্নয়নসহ সব ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিদেশী বিনিয়োগ আসা প্রয়োজন। বিশেষত ফুটওয়্যার শিল্পে বিদেশী বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি।

এলএফএমইএবির সূত্রমতে, সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে মাত্র ১১টি ইউনিট রয়েছে, যেখানে যৌথ ও শতভাগ বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগ রয়েছে চারটি ইউনিটে। এ খাতে এখন পর্যন্ত জার্মানি, জাপান, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও চীন বিনিয়োগ করেছে। আর বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারতীয় কিছু প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী এম আবু তাহের বলেন, আমাদের সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে বিদেশী বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগের প্রয়োজন থাকলেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

খাত দুটির ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশ থেকে পোশাক ও জুতা রফতানিতে শুল্ক সুবিধা রয়েছে। রয়েছে নিম্নমজুরির সুবিধাও। এসব সুযোগ কাজে লাগাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চায়। বিনিয়োগ হওয়া প্রয়োজন, এমন খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে বস্ত্র খাতে ওভেন ফ্যাব্রিক ও পোশাক খাত হলে স্যুটের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য গুরুত্ব পেলে ভালো।

বিজিএমইএর সহসভাপতি ফেরদৌস পারভেজ বিভন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কারখানা ভারতীয়রা কিনে নেয়ার প্রক্রিয়া করেছে বলে জানতে পেরেছি। তবে তারা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমে কারখানা স্থানান্তর করবে, এমনটাই ধারণা করছি। এক্ষেত্রে ওভেন ফ্যাব্রিক কিংবা উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনকারী করাখানায় বিনিয়োগে গুরুত্ব দেয়া হবে বলে আশা করছি।

বাংলাদেশ সময় ১০২০ ঘণ্টা, ১৯ এপ্রিল, ২০১৭

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস

শেয়ার করুন