বহুমুখী সংকটে মধ্যপ্রাচ্য

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

সম্ভবত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পররাষ্ট্র বিষয়ে এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে একটা আপস রফায় পৌঁছেছেন। যে কারণে নীরবতা ভঙ্গ করে মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় হয়েছে। অদৃশ্য সরকারকে অস্বীকার করে চলা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। প্রেসিডেন্ট রিগ্যানও অনেক লম্বা লম্বা কথা বলেছিলেন। কিন্তু হোয়াইট হাউসে ঢোকার পর যখন আততায়ীর গুলিতে আহত হয়েছিলেন তখন এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে ভালো ছেলেটির মতোই আচরণ করেছিলেন।

ট্রাম্পও সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন যে এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে সমঝোতায় না আসলে তাকে হয়তো ইম্পিচমেন্টের সম্মুখীন হতে হবে। তাই তিনি মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়াকে নিয়ে কোনো কিছু করার চেষ্টা করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেছেন। আর বিদ্রোহীদের ওপর সিরিয়া রাসায়নিক হামলা করেছে এমন অভিযোগ উত্থাপন করে আমেরিকা সিরিয়ায় ৫৯টি টমাহক ক্রুজ নিক্ষেপ করেছে। অথচ মার্কিন সমর্থক বিদ্রোহী গ্রুপগুলো সিরিয়ায় এখনো সক্রিয় আর আইএসের তৎপরতাও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি।

আইএসকে অস্ত্র সরবরাহ করে ইসরাইল। রাসায়নিক আক্রমণটা বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকেও হতে পারে। অনুরূপ কথা রাশিয়াও বলেছে, আসাদও বলেছেন। ইতালিতে জি৭ এর বৈঠক হয়েছে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আসাদকে সিরিয়ার ক্ষমতায় রেখে কোনো আপস-মীমাংসা হবে না। আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী টিলারসন বলেছেন, পুতিনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি কি পশ্চিমাদের সঙ্গে থাকবেন না আসাদকে নিয়ে থাকবেন। টিলারসন মস্কো সফরে গিয়েছেন আর মস্কো পরিষ্কার ভাষায় বলেছে, তারা তাদের অবস্থান পরিত্যাগ করবে না। আমেরিকার সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি যুদ্ধ এড়ানোর যে চুক্তি ছিল পুতিন তা স্থগিত করে দিয়েছেন এবং সিরিয়ান উপকূলে রাশিয়া তার রণতরী পাঠিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া এবং ইরান কঠোর হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছে। আমেরিকা আরো আক্রমণের অভিলাষ ব্যক্ত করেছে।

সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এ আক্রমণে আনন্দ প্রকাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তারা আবু ইভাস্কার বলে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাদের এ অভিবাদন জানানোটা নীরোর বাঁশি বাজানোর মতো ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষগুলোর জানমাল রক্ষায় যেন তাদের কোনো ভূমিকা নেই। হানাহানিতে মধ্যপ্রাচ্যে শেষ হয়ে গেলেও তাদের কিছু যায় আসে না। তারেক আলী তার এক লেখায় বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এ রাজতন্ত্রগুলোর অবসান না হলে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি আসবে না। কিছুদিন আগেও সৌদি আরব ইয়েমেনে নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করেছিল। এখন ইয়েমেনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ চলছে। না খেয়ে লোক মারা যাচ্ছে হাজার হাজার অথচ এ রাজতন্ত্রগুলোর অর্থের কোনো অভাব নেই। দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকগুলোর প্রতি মুখ উঁচিয়ে দেখছেন ইসলাম ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিবেশীর প্রতি কর্তব্য কোনো কিছুর প্রতি তাদের কোনো খেয়াল নেই।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল যখন প্রকাশ হচ্ছিল তখন রাশিয়ার পার্লামেন্ট ডুমার অধিবেশন চলছিল। ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার খবর পেয়ে ডুমার সদস্যরা আনন্দে মিষ্টির ভূরিভোজ দিয়েছিল। রাশিয়ার পার্লামেন্ট সদস্যরা ভুলে গিয়েছিল যে এস্টাবলিশমেন্টের বাইরে এসে ট্রাম্প কিছু করতে পারবেন না। রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার বন্ধুত্ব হলে আমেকিার ওয়ার হার্ডওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিগুলো বসে যাবে। সুতরাং অদৃশ্য সরকার চাইবে যে আমেরিকা রাশিয়ার বৈরিতা অব্যাহত থাকুক।

পুতিনের সঙ্গে ইতালির প্রেসিডেন্ট ম্যাত্তেবেলার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। পুতিন ম্যাত্তেবেলারকে বলেছেন বাশার রাশিয়ার তত্ত্বাবধায়নে রাসায়নিক অস্ত্রগুলো ধ্বংস করেছে এখন আমেরিকা সমর্থক বিদ্রোহী গ্রুপগুলোই রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে বাশারকে মিথ্যা দোষারোপ করার অজুহাত সৃষ্টি করছে। আসলে আমেরিকার প্রিন্ট মিডিয়ার লেখালেখি দেখলেই মধ্যপ্রাচ্যে কি হবে তা বোঝা যায়। আমেরিকার প্রিন্ট মিডিয়ার ৭৫% কাগজ হচ্ছে ইহুদি মালিকানাধীন বড় বড় কোম্পানির পত্রিকা। ২৫% কাগজ স্বাধীনভাবে মতামত প্রদান করে।

গ্যানেট কোম্পানি সবচেয়ে বড় প্রিন্ট মিডিয়ার মালিক। এই কোম্পানির সারাদেশে ৭৯টি পত্রিকা রয়েছে। এই কোম্পানি বহুল প্রচারিত আরিজোনা রিপাবলিক এবং ইউএসএ টুডের মালিক। এ কোম্পানির মালিক হচ্ছেন জন জিডিক, একজন ইহুদি। দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানি হচ্ছে ট্রিবিউন কোম্পানি। তার ১৮টি বড় বড় দৈনিক পত্রিকা রয়েছে। শিকাগো ট্রিবিউন এবং লসঅ্যাঞ্জেলস টাইমস তাদের দুটা বৃহত্তম পত্রিকা। কোম্পানির মালিক স্যাম জলি ইহুদি।

নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা তৃতীয় বৃহত্তম কোম্পানি, নিউইয়র্ক টাইমস, বোস্টন গ্লোব ও হেরাল্ড ট্রিবিউনসহ ৩৩টি কাগজ রয়েছে এ কোম্পানির। এ কোম্পানির মালিক হচ্ছেন সালজবার্গার নামের এক ইহুদি। আরো বহু আছে সবগুলোর হিসাব দিলে লেখা লম্বা হবে। ধীরে ধীরে ইহুদি মালিকানাধীন পত্রিকাগুলো বাশার আল আসাদের অপসারণের সুর তুলেছেন। সম্ভবত এটি ইসরাইলের এজেন্ডা। লিবিয়া, ইরাককে ধ্বংস করার পর সিরিয়াকে শেষ করতে পারলে প্রতিবেশীদের মাঝে ইসরাইলের আর কোনো বড় শত্রু অবশিষ্ট থাকে না। আর বাশারকে অপসারণ করতে পারলে লিবিয়ার মতো বিশৃঙ্খলার মাঝে সিরিয়ার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যাবে। ইসরাইলের জন্য বড় হুমকি ছিল হিজবুল্লাহ। হিজবুল্লাহও এখন বাশারের পক্ষ নিয়ে সিরিয়ায় যুদ্ধ করছে। সিরিয়াও হিজবুল্লাহ দুইটাকে ধ্বংস করাই হচ্ছে এখন ইসরাইলি এজেন্ডা। রাশিয়ার কারণে আইএস বিধ্বস্ত হয়ে দুর্বল হয়ে গেছে। আইএস হচ্ছে ইসরাইল-আমেরিকার প্রজেক্ট।

আমেরিকার সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি যুদ্ধ এড়ানোর যে সমঝোতা ছিল রাশিয়া তা বাতিল করে সতর্ক বার্তা দিয়েছে এবং এখন তাদের উভয়ের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে টেকেছে। রাশিয়ার নৌঘাঁটি রয়েছে সিরিয়ার উপকূলে। রাশিয়ার সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্ক প্রায় ৫ দশকের। সোভিয়েতের পতনের পর ক্রাইমিয়া যখন রাশিয়ার হাতছাড়া হয়ে যায় তখনই বাশার নৌঘাঁটি স্থাপনের জায়গা দিয়েছিল রাশিয়াকে সিরিয়ার উপকূলে। পুতিন চেয়েছিলেন সিরিয়াকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বলয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। সিরিয়ার ব্যাপারে ইরান তার সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে রেখেছে। তুরস্কও মধ্যখানে এ বলয়ে এসেছিল কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এরদোগানের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে তুরস্ক তার ইরান, সিরিয়া, রাশিয়ার প্রতি সমর্থন আর অব্যাহত রাখবে না।

এরদোগানও রাশিয়াকে অনুরোধ করেছে বাশারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করার জন্য। তুরস্ক এ বলয়ে কখনো ছিল না, তারা ন্যাটোর সদস্য। সামরিক অভ্যুত্থানের তাড়া খেয়ে রাশিয়ার সঙ্গে দহরম মহরম করেছিল এখন পুনরায় ব্লক ত্যাগ করে চলে গেছে। তুরস্ক হচ্ছে সুন্নি অধ্যুষিত এলাকা। তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব এ অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ অঞ্চলের প্রধান সমস্যা হচ্ছে শিয়া- সুন্নির বিরোধ আর কুর্দির জাতিগত স্বীকৃতি এবং পৃথক অস্তিত্বের স্বীকৃতি প্রদানের বিরোধ। কুর্দিদের এ বিরোধ শিয়া-সুন্নির বিরোধ শত শত বছরব্যাপী বিরাজমান। সম্প্রতি এসে এ বিরোধ দুটিও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরাক ও সিরিয়া সীমান্তে কুর্দিদের একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে উঠছে। এতে ইরাকের অনিচ্ছার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এটা শুভ লক্ষণ।

তুরস্ক এ নিয়ে দুশ্চিতার রয়েছে কারণ তুরস্কের কুর্দিদের বিরাট অবস্থান এবং কুর্দিরা তুরস্কের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে দশকের পর দশক ধরে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানরা নিজেদের মাঝে যুদ্ধ করে নিঃশেষ হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত ইসরাইলেরই সুবিধা। ইসরাইলের এজেন্ডা হচ্ছে ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত এলাকায় ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত এলাকা হচ্ছে সাবেক কেনান যেখানে হযরত ইব্রাহীম হিযরত করেছিলেন। অর্থাৎ সুয়েজ থেকে জর্দান এবং সমগ্র সিরিয়া এলাকা। মুসলমান নিঃশেষ হয়ে গেলে ইসরাইল সহজে তার এজেন্ডা বাস্তবায়িত করতে পারবে। অথচ ইসরাইলের আশপাশে ৩০০ মিলিয়ন মুসলমানের বসবাস।

ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে ইউরোপের দেশগুলোর মাঝে ৩০ বছরব্যাপী এক যুদ্ধে হয়েছিল। ত্রিশ বছরের যুদ্ধে ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ লোক নিহত হয়েছিল। যখন যুদ্ধরত দেশগুলোর বোধোদয় হলো তখন তারা সবাই আলোচনার টেবিলে বসে ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে ‘ওয়েস্টফালিয়ান পিস ট্রিটি’ সম্পাদন করেছিল। এ চুক্তিতে প্রত্যেকটি দেশ একে অপরের সমস্যা অনুধাবন করে শান্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। তাই ‘ওয়েস্টফালিন পিস ট্রিটি’ দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পেরেছিল। তুরস্ক, সোদি আরব, মিসর এবং ইরান সম্মিলিতভাবে উদ্যোগী হলে মধ্যপ্রাচ্যের জন্যও আরেকটা ‘ওয়েস্টফালিয়ান পিস ট্রিটি’ সম্পাদনের উদ্যোগ নিতে পারে। এ চুক্তির আওতায় ইউরোপের দেশগুলোর সীমানাও বিন্যস্ত হয়েছিল। প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যেও বিন্যস্ত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বোঝা উচিত ৩০ বছর যুদ্ধের পরও সমস্যার সমাধান হবে না। সমাধানের সূত্র আলোচনার মাঝেই নিহিত।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

বাংলাদেশ সময় ১৪৪০ ঘণ্টা, ১৯ এপ্রিল, ২০১৭

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস

শেয়ার করুন