মালদ্বীপে মুসলমানদের ইতিহাস

কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক
মালদ্বীপে ইসলামের প্রভাব কত গভীরে প্রোথিত, তা মালদ্বীপের ভাষার আরবিলিপি এবং দ্বীপগুলোর আরবি বর্ণ দিয়ে নামকরণ থেকেও স্পষ্ট। মালদ্বীপের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তো বটেই, যে ক’টি দেশের জাতীয় পতাকা ইসলামের প্রতীক নতুন চাঁদ শোভিত, মালদ্বীপ তাদের একটি। এক সময় মালদ্বীপে কোনো মুসলমান ছিল না। তবে সময়টি বহু আগের। ১২০০ খ্রিস্টাব্দে আবুল বারাকাত নামে একজন মরক্কান (ভিন্ন মতে, পারস্যের তাবরিজের অধিবাসী) ধর্ম প্রচারক মালদ্বীপে আসেন। তাঁর প্রভাবে দ্বীপের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

প্রখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা (রহ.) ছিলেন একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ। ১১৮৩ খিস্টাব্দে তিনি মালদ্বীপ ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি তার ভ্রমণবৃত্তান্তে মালদ্বীপের উক্ত ঘটনা সম্পর্কে লিখেছেন, ভ্রমণ করতে করতে মালদ্বীপে পৌঁছলেন। দেখলেন, মালদ্বীপের প্রতিটি শহর-নগর আজানের মধুময় ধ্বনিতে মুখরিত। মালদ্বীপ ভূমি নামাজের সিজদায় আলোকিত। এ অবস্থা দেখে ইবনে বতুতা খুবই বিস্মিত। কারণ, তার জানা মতে, কোনো ইসলাম প্রচারক মালদ্বীপে আসেননি। তাহলে এভাবে ইসলামের আলো ছড়াল কীভাবে।

ইবনে বতুতা তখন সেখানকার অধিবাসীদের মালদ্বীপের মানুষের ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তারা আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা শোনাল। ঘটনাটি হলোÑ আরবের কোনো এক বাণিজ্য জাহাজ পূর্ব বিশ্বের দিকে যাত্রা করে যাচ্ছিল। ঘটনাচক্রে জাহাজটি তুমুল সমুদ্রঝড়ে পতিত হয়। জাহাজের অভিযাত্রী সবাই মারা যান। সেই মুসলিম যাত্রীদলের একজন মাত্র লোক কোনোমতে একটি কাঠের টুকরো অবলম্বন করে আল্লাহর রহমতে বেঁচে যান এবং দ্বীপেই আশ্রয় নেন।

তিনি ছিলেন এক আরব যুবক এবং হাফেজে কোরআন। নাম হাফেজ আবুল বারাকাত। এই অচেনা অপরিচিত দ্বীপে কোথায় যাবেন তিনি? এখানে তো তার কোনো আত্মীয়স্বজন নেই! অবশেষে এ আরব যুবক এক বৃদ্ধার বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। যুবকটি জঙ্গলে কাঠ কেটে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত।

একদিন যুবকটি বাড়িতে এসে দেখল, বৃদ্ধা কাঁদছেন। পাশে তার যুবতি মেয়েও কাঁদছে। যুবক বলল  আপনারা কাঁদছেন কেন? কী হয়েছে আপনাদের? বৃদ্ধা বললেন, আজ আমার মেয়ে মারা যাবে। যুবক বলল, কেন? তিনি মারা যাবেন কেন? তিনি তো সুস্থ! বৃদ্ধ আঙুল দ্বারা ইশারা করে বললেন, ওই যে দেখুন মৃত্যু আমাদের সামনে। যুবক বাড়ির সামনে তাকিয়ে দেখলেন রাজার সৈন্যরা দাঁড়ানো। যুবক বলল, তারা কি আপনার মেয়েকে হত্যা করবে? বৃদ্ধা বললেন, না। ব্যাপারটি তা নয়। রাজার সৈন্যরা আমার মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছে। কেননা, আমাদের এই দ্বীপে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট তারিখে এক সামুদ্রিক বিপদের উদ্ভব হয়। যার থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হলো, আমাদের দ্বীপবাসীর পক্ষ থেকে এক যুবতি মেয়েকে ওইদিন সূর্য ডোবার পর সমুদ্র উপকূলে একটি মন্দির আছে, সেখানে রেখে আসতে হয়। পরের দিন সকালে সরকারি লোকজন সমুদ্রের পাড় থেকে ওই মেয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করে আনে। প্রতিবারই লটারির মাধ্যমে নিরূপণ করা হয় কোন মেয়েকে পাঠানো হবে। এবার লটারিতে আমার মেয়ের নাম উঠেছে। তাই আজ রাতে তাকে সমুদ্র উপকূলে পাঠাতে হবে। সেখানে তার মৃত্যু অনিবার্য ।

যুবক বৃদ্ধার এমন বেদনাদায়ক কথা শুনে বলল, আজ আপনার মেয়েকে সেখানে পাঠাতে পারবেন না। আজ রাতে আমি নিজেই সেখানে যাব। দেখি সেখানে কী হয়। প্রয়োজনে আপনার মেয়ের পরিবর্তে আমার প্রাণ দিয়ে দেব। এরপর যুবক বলল, রাজার সৈন্যরা যাতে চিনতে না পারে, তাই আপনার মেয়ের পোশাক আমাকে পরিয়ে দিন। আমিই আজ তাদের সঙ্গে যাব।

উল্লেখ্য, যুবকের বয়স ছিল খুবই কম। তার দাড়ি-গোফ কিছুই গজায়নি। কাজেই মেয়ের বেশে তার ধরা পড়ার আশঙ্কা ছিল না। বৃদ্ধা যুবকটিকে নির্ঘাত মৃত্যুর দুয়ারে ঠেলে দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। কিন্তু যুবক বুঝাল যে, তিনি মুসলমান। মুসলমানরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। আর জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। আল্লাহর হুকুম না হলে কেউ কাউকে মারতে পারে না। তাছাড়া তিনি হাফেজে কোরআন। তাই তার বিশ্বাস, কোরআনের বরকতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে হেফাজত করবেন। এভাবে যুবকটি বৃদ্ধাকে নানাভাবে বুঝাল। শেষ পর্যন্ত যুবকের অত্যাধিক পীড়াপীড়িতে বৃদ্ধা রাজি হলেন।

পরে রাজার সৈন্যরা তাকে সেখানে রেখে চলে এলো। যুবক সেখানে উত্তমরূপে অজু করে এশার নামাজ আদায় করল। তারপর খোলা তরবারি সামনে রেখে সমুদ্রের ঢেউ দেখতে লাগল এবং পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতে লাগল।

রাত গভীর। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। প্রকৃতি নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে। জেগে রইল কেবল তিনটি প্রাণ। যাদের চোখে নিদ্রা নেই। আরব যুবক, গরিব বৃদ্ধা ও যুবতি কন্যা। হাফেজে কোরআন যুবকটি অন্ধকার রাতের এ নিথর পরিবেশে সমুদ্রের কিনারস্থ সেই ভয়ঙ্কর মন্দিরে বসে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী সুরে কোরআন তেলাওয়াত করে যাচ্ছিল। এ মুহূর্তে সব অপশক্তির মোকাবিলায় কোরআনই তার অমোঘ হাতিয়ার।

হঠাৎ করে সমুদ্রের দিগন্ত থেকে বিশাল আকৃতির এক ভয়ঙ্কর দৈত্যের উদয় হলো। দৈত্যটি ধীরে ধীরে সমুদ্রের কিনারার দিকে মন্দিরের অভিমুখে আসছে। মন্দিরের কাছাকাছি এসে দৈত্যটি থেমে যায়। যুবক কোরআন তেলাওয়াত করে যাচ্ছিল। কোরআন তেলাওয়াত করার কারণে দৈত্যটি সামনে অগ্রসর হতে পারল না। অবশেষে হার মানল ভয়ঙ্কর দৈত্য। সামান্য সময় অবস্থান করে দৈত্য যে পথে এসেছিল সে পথে ফিরে গেল। দৃশ্যের অন্তরালে মিলিয়ে গেল দৈত্যটি।

সকাল হলে সরকারি লোকজন মেয়েটির লাশ নেয়ার জন্য মন্দিরে আসে। এসেই তারা হতভম্ব। সেখানে কোনো লাশ নেই, কোনো মেয়েও নেই। তার পরিবর্তে এক মুসলিম যুবক রয়েছে।

তারা রাজার দরবারে যুবককে নিয়ে এলে যুবকটি রাজার কাছে সব ঘটনা খুলে বলল। রাজা নিশ্চিত হওয়ার জন্য মেয়েকে ডেকে আনলেন। তারা রাজার কাছে ঘটনাটির সত্যায়ন করলেন। যুবকের মুখে সব কথা শুনে রাজা সীমাহীন প্রভাবিত হলেন। রাজা বললেন, হে যুবক! এত বড় বিপদের সামনে তুমি একাকী দাঁড়ালে কীভাবে? যুবক বলল, আমি একা ছিলাম না; আমার সঙ্গে আমার আল্লাহ ছিলেন। আর আমার হাতিয়ার ছিল মহান আল্লাহর পবিত্র কোরআন।

রাজা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ভয় পাওনি কেন? যুবকটি বললেন, মুসলমান আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না। জীবন ও মৃত্যুর মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। এরপর রাজা বললেন, আগামী বছর এভাবে একা থাকতে পারবে? যুবক দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিল, আল্লাহর হুকুমে একাই যেতে পারব। তখন রাজা উৎসাহিত হয়ে বলে উঠলেন, যদি তুমি পার, তাহলে আমরা সবাই ইসলামের সততার সামনে মাথানত করব।

রাজার এ কথাকে সবাই সমর্থন করল। এরপর পরবর্তী বছর নির্ধারিত তারিখের ঘটনা সবাই প্রত্যক্ষ করল, যুবক তার সত্যতা প্রমাণ করল। এ ঘটনার পর থেকে সে বিপদ মালদ্বীপে আর আসেনি। তখন রাজা ও তার দরবারের সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর সেই রাজ্যের মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। প্রথম দিনেই ৬৫ হাজার লোক মুসলমান হলেন এবং এ ধারা অব্যাহত গতিতে চলতে থাকল। সুবহানাল্লাহ। (সূত্র : তারিখে ইবনে বতুতা)।

২৩ ডিসেম্বর ২০১২ খ্রিস্টাব্দে মজলিসে দাওয়াতুল হকের ১৮তম বার্ষিক ইজতেমায় প্রদত্ত মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমূদুল হাসান বলেন, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল কাইয়্যুমের সঙ্গে মক্কার হারাম শরিফে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ইবনে বতুতায় যে ঘটনা উল্লেখ আছে সেটা কি ঠিক? বললেন, হ্যাঁ ঠিক।

এভাবে আরব বণিক ও পারসিকরা মালদ্বীপবাসীকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেন। এরপর থেকেই মালদ্বীপ আরব বণিকদের জন্য একটি অন্যতম বাণিজ্যিক যাত্রাবিরতি স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১১৫৩-১৯৫৩ অবধি (৮০০ বছর) ৯২ জন সুলতান নিরবচ্ছিন্নভাবে শাসন করেন দ্বীপটি। বিভিন্ন সময়ে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা পর্যটক হিসেবে, কখনও কখনও বাণিজ্য কুঠি স্থাপন, কখনও ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য এখানে আসে। ১৯৬৫ সালের ২৬ জুলাই মালদ্বীপ ব্রিটিশদের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে এবং ১৯৬৮ সাল থেকে দেশটিতে প্রজাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম আছে।

বাংলাদেশ সময় ১৭০০ ঘণ্টা, ০৪ এপ্রিল, ২০১৭

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস

শেয়ার করুন