কূটনীতির খেলাতেও ভুট্টোর হার

অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ

পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো জাতিসংঘে যখন বক্তৃতা দিতে শুরু করেছেন সে সময় জানতে পেলেন, পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে আত্মসমর্পণ করেছে। ওই সময় পোল্যান্ড কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাবের শর্ত ছিল_ শেখ মুজিবের মুক্তি। প্রস্তাবিত ওইসব কাগজপত্র ছিঁড়ে ভুট্টো টুকরো টুকরো করে চিৎকার করে বলেন_ পাকিস্তান পরাজয় মেনে নেবে না। প্রয়োজনে হাজার বছর যুদ্ধ করব। নাটকীয়ভাবে তিনি বের হয়ে গেলেন। ১৮ ডিসেম্বর তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্স ও নিক্সনের সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন শিগগিরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়। কিসিঞ্জার বলেছিলেন, আপনার জন্য মঙ্গল হবে যদি আপনি অবিলম্বে শেখ মুজিবকে মুক্তি প্রদান করেন, যাকে প্রায় ৯ মাস ধরে পাকিস্তানের নির্জন কারাগারে বন্দি করে রেখেছেন।

২. ঢাকায় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের লজ্জাজনক ঘটনায় সমগ্র পাকিস্তান বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ভুট্টোর ক্ষমতা দখল করার বিষয়টি ছিল ষড়যন্ত্রমূলক। কিন্তু প্রচণ্ড গণবিক্ষোভ ও নৈরাজ্যের প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পক্ষে প্রধান সেনাপতি জেনারেল হামিদ গ্রুপ কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং ইয়াহিয়া ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পূর্বে ভুট্টোকে তিনি অনুরোধ করেছিলেন_ শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ যেন কার্যকর করা হয়। ভুট্টো বলেছেন, তিনি তার অনুরোধ রাখেননি। ১৯৭২ সালের

৩ জানুয়ারি তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডের সঙ্গে ৪৫ মিনিটব্যাপী একটি বৈঠক করে জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে জানান, তিনি শেখ মুজিবকে জনগণের সম্মতি নিয়ে মুক্তির ঘোষণা দেবেন। তবে ফারল্যান্ডকে বলেন, তিনি মুজিবের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেবেন। আসলে শেখ মুজিবের মুক্তির ব্যাপারে ভুট্টো ‘কূটনৈতিক দাবা খেলা’র আশ্রয় নেন। তিনি ফারল্যান্ডকে বলেন, শেখ মুজিবের মুক্তির শর্ত হিসেবে তিনি অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার ব্যাপারে সমঝোতার চেষ্টা করবেন। এ ব্যাপারে কূটনৈতিক অঙ্গনকে ধৈর্য ধরতে হবে।

৩. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভুট্টোর মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল, গোপন টেপে তা ধারণ করা হয়েছিল। ধারণকৃত টেপটি ভুট্টোর মৃত্যুর পর লাইব্রেরি থেকে উদ্ধার করা হয়। সেই টেপের বর্ণানামতে লক্ষণীয়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রথম যেদিন শিয়ালা নামক ডাকবাংলোয় আসেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ ভুট্টো, আপনি এখানে কেমন করে এলেন? ভুট্টো বললেন, আমি এখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। এ কথা শুনে বঙ্গবন্ধু হাসছিলেন এবং বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভুট্টো, আপনি কীভাবে প্রেসিডেন্ট হলেন? এটা তো আমার পদ। পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা আমি।’ ভুট্টো বললেন, আপনি চাইলে আমি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে দিতে পারি। ভুট্টো এ কথাও বলেন, তিনি এখন প্রধান সামরিক প্রশাসক। বঙ্গবন্ধু বলেন, একজন সিভিলিয়ান কী করে সামরিক প্রশাসক হন? ভুট্টো তাকে বলেন, পাকিস্তানে সবকিছুই সম্ভব। আপনার হয়তো জানা নেই, ভারতের সেনাবাহিনী রাশিয়ার সহায়তায় ঢাকা দখল করেছে। সে জন্য অখণ্ড পাকিস্তানের ভিত্তিতে আমাদের ফাইট করতে হবে। বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর চালাকির দিকটা সব সময় মনে রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে বললেন, তাহলে শিগগিরই আমাকে দেশে যেতে হবে এবং আপনার প্রস্তাব বিবেচনার পূর্বে বাংলার জনগণের সম্মতি নিতে হবে। এ সময় বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে জিজ্ঞেস করেন, এই মুহূর্তে আমি মুক্ত কি-না? ভুট্টো কূটনৈতিক চাল চাললেন এভাবে_ ‘নেইদার ইউ আর ফ্রি ম্যান নর প্রিজনার।’ প্রেসিডেন্ট ভুট্টো লুজ কনফেডারেশনের প্রস্তাব দিলে বঙ্গবন্ধু বলেন, এই মুহূর্তে এটা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শেষ মুহূর্তে ভুট্টো আরও জোরাজুরি করলে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘লেট মি সি’. কোনো প্রতিশ্রুতি আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর মনস্তাত্তি্বক চাপ সৃষ্টি করেন। কয়েক দিন নীরবতা। বাংলার চারদিকে ভয়ঙ্কর রক্তচক্র; সৈনিকদের কড়া পাহারা।

৫. এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত রাশিয়া, ব্রিটেনসহ সব পরাশক্তি গণতান্ত্রিক দেশ শেখ মুজিবকে অবিলম্বে ছেড়ে দিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে বন্দিখানা থেকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে ভুট্টো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে জনসভায় তিনি পাকিস্তানের স্বার্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির বিষয়ে সম্মতি গ্রহণ করেন।

৬. পাকিস্তানের একটি গ্রুপ চেয়েছিল, বাংলাদেশে আটক পাকিস্তানি সৈন্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মুজিবকে ট্রাম কার্ড হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। এ অভিমতের দৃঢ় সমর্থক পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান পাকিস্তানের সঙ্গে মৌলিক বিষয়ে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত মুজিবকে মুক্তি দেওয়া ভুট্টো মারাত্মক ভুল ছিল_ এ কথাটি তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে মার্কিন ডেপুটি চিফ অব মিশন সিডনি সোবারকে বলেছিলেন।

৭. সিআইএর ৩ জানুয়ারি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, মুজিব ছিলেন মধ্যপন্থি। তার পেছনে রয়েছে বিশাল জনশক্তি একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামরিক এবং গেরিলা বাহিনীর ওপর তার প্রভাব ছিল প্রচণ্ড। তিনিই কেবল এই মুহূর্তে দেশটিকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারেন। মার্কিন গোপন নথিতে পরিদৃষ্ট হয়, বাংলাদেশের মধ্যে বিভিন্ন গ্রুপ ও উপদলীয় কোন্দল নিরসন এবং উগ্র চীনপন্থিদের নৈরাজ্য সৃষ্টির পূর্বেই শেখ মুজিবের অবিলম্বে মুক্তি ব্যতীত অন্য কোনো বিকল্প নেই।

৮. বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন ১০ জানুয়ারি। কিন্তু তিনি মুক্ত হন ৮ জানুয়ারি। গভীর রাতে নির্জন রাওয়ালপিন্ডির বিমানবন্দরে জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের হাতে একটি কাগজ দেন। এটি ছিল একটি যৌথ বিবৃতি। বঙ্গবন্ধু কাগজটি না পড়েই ফেরত দিয়ে বললেন_ ‘আমি কি এখন দেশে যেতে পারি?’ নিরাশ ভুট্টো করুণ কণ্ঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, যেতে পারেন। কিন্তু কীভাবে যাবেন? পাকিস্তানের পিআইএ ভারতের ওপর দিয়ে যায় না।’ তখন মুজিব বললেন, ‘সে ক্ষেত্রে আমি লন্ডন হয়ে যাব।’ এর পর শেখ মুজিব মুক্তি পেয়ে পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে ওঠার আগে জুলফিকার আলী ভুট্টো তার দিকে ৫০ হাজার ডলার হাতখরচের জন্য দিতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বললেন, এটা চার্টার্ড বিমানের জন্য আপনি রেখে দেন। তিনি লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অনমনীয়। বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্যে তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

লেখকঃ সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী

বাংলাদেশ সময় ১১১৫ ঘণ্টা, ১০ জানুয়ারি, ২০১৭

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস

শেয়ার করুন