বার বার ঢাকায় আসার টাকা কে দেবে?

দেশের রাষ্ট্রয়াত্ত্ব ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন পদে নিয়োগে প্রতি বছরই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে হল ভাড়া করে পরীক্ষার আয়োজন হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরীক্ষা দিতে রাজধানীতে ছুটে আসেন লাখো চাকরি প্রার্থী।

কিন্তু প্রায় সময় প্রতিযোগিতামূলক এসব পরীক্ষার পর প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রশ্ন ফাঁস এবং অনৈতিক নিয়োগ ঠেকাতে গত ২০১৫ সাল থেকে রাষ্ট্রয়াত্ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে নিয়োগের দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, প্রিলিমিনারি থেকে ভাইভা পর্যন্ত ৩ ধাপে পরীক্ষা এবং নিয়োগ দেওয়া পর্যন্ত সবকিছুই তদারকি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক দায়িত্ব নেওয়ার পরও পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস অভিযোগের পর আজ শুক্রবার অগ্রণী ব্যাংকের প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া যায়। শীর্ষস্থানে দৈনিক পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও সকাল ভাগের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আর বিকেল ভাগের পরীক্ষার আগে প্রমাণসহ আবারও প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই পরীক্ষা স্থগিত হয়।

প্রশ্ন ফাঁসের পর পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার রীতি চালু হওয়া রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক। এভাবে যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর তা বাতিল হলে এক সময় হয়তো প্রশ্ন ফাঁসের প্রবণতা বন্ধ হবে। বার বার ব্যর্থ হওয়ার পর প্রশ্ন ফাঁসকারীরাই হয়তো এ নিন্দনীয় কাজ থেকে সরে যাবেন। আর সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পাবেন মেধাবীরা।

এ বিষয়ে দৈনিক প্রথম আলোর জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক শরীফুল হাসান তার ফেসবুকে লিখেছেন, অগ্রণী ব্যাংকের বিকেলের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। সকালে হওয়া পরীক্ষাও বাতিল হোক। শুধু এ দুটো নয়; যেকোনো পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেই অস্বীকার না করে বাতিলের সংস্কৃতি চালু হোক। তাতে ফাঁসকারীরা ফাঁস বন্ধ করতে বাধ্য হবে। আর বেঁচে যাবে লাখো তরুণ …

তবে প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পাওয়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরীক্ষা দিতে বার বার ঢাকায় এসে বিড়ম্বনার শিকার হওয়া নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে ফেসবুকে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক বিড়ম্বনার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় আসতে জনপ্রতি হাজার টাকার বেশি খরচ হয়; ঢাকায় থাকা-খাওয়ার খরচতো আছেই। আবার পরীক্ষা কেন্দ্রে যাতায়াত খরচসহ যানজটের বিড়ম্বনাও পোহাতে হয় তাদের।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রহমত উল্লাহ তার ফেসবুকে লিখেছেন, হাজারো বেকার দেশের দূর-দূরান্ত থেকে যে ১০০০ টাকার বেশি খরচ করে। পরীক্ষা দিতে ঢাকাতে আসার এই টাকা কে দেবে? সত্যিই ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাচ্ছে ‘…

তিনি আরও লিখেছেন, এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষা ব্যবস্থা আজ ধর্ষিত। জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন। সম্প্রতি কয়েকটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের পরীক্ষার প্রত্যেকটি প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। আজ অগ্রণী ব্যাংকের সকাল শিফটের প্রশ্ন গত রাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে, বিকাল শিফটের প্রশ্ন ফেসবুকে উত্তরসহ পাওয়া যাচ্ছে।

রহমত উল্লাহ বলেন, রাষ্ট্র কিন্তু চাইলে এটি রোধ করতে পারে না- এটা কেউ বিশ্বাস করে না, রাষ্ট্র চাইলেই পারে। কারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল, কোথা থেকে এটা ঘটলো- এটা বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সাফায়েত রহমান শিবলু লিখেছেন, অগ্রণী ব্যাংকে প্রশ্ন ফাঁসের খরবটি পড়ে নূন্যতম অবাক হয়নি। ব্যাপারটা কেমন জানি স্বাভাবিক মনে হল। বরং অস্বাভাবিক মনে হল, এমনটি হবে জেনেও, টাকা খরচ করে ঢাকা যাই, সেই নাটক মঞ্চস্থ করতে। শিক্ষিত বেকারদের এই অস্বাভাবিক ভুলের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, প্রশ্ন ফাঁসকারীদের প্রমোশনের ব্যবস্থা করা হোক।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মৃত্যুঞ্জয় কুমার মোহন্ত লিখেছেন, গতকাল এক অফার এসেছিল প্রতি প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে এক লাখ টাকায়। একশ জনের গ্রুপ এক হাজার টাকা বা ৫০ জনের গ্রুপ ২০০০ টাকা করে দিলেই প্রশ্ন পেয়ে যাবে।

দৈনিক প্রথম আলোর জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক শরীফুল হাসান তার ফেসবুকে লিখেছেন, পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রথম আলোয় নিউজ দিয়ে‌ছিলাম। তারপরেও ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই অগ্রণী ব্যাংকের পরীক্ষা নিয়েছে রাষ্ট্র। ঘেন্না লাগছে এখন। হতাশ লাগছে লাখো তরুণের জন্য।

আরেকটি স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, একটা রাষ্ট্র ধ্বংস করতে তার শিক্ষাব্যবস্থা আর ভবিষ্যত প্রজন্ম ধ্বংসই যথেষ্ট। বাংলাদেশের শত্রুরা এই দুই কাজে সফল। এসএসসি, এইচএসসি থেকে শুরু করে সব ‌নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন এই রাষ্ট্রে অ‌ভিশাপ। …

প্রশ্ন ফাঁস সংস্কৃতির প্রতি ধিক্কার জানিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংবাদপত্র দৈনিক আজাদীর জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক মোরশেদ তালুকদার লিখেছেন, চাকরি পাওয়ার প্রথম যোগ্যতা কি হওয়া উচিত? কি আর, ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সংগ্রহ করতে পারা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আতিক স্বাধীন লিখেছেন, এতো কষ্ট করে সবাই ঢাকায় যায়। আর তারা (কর্তৃপক্ষ) করে তামাশা। এই পোস্টের সঙ্গে দৈনিক প্রথম আলোর পত্রিকার প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবেদনটি শেয়ার দিয়েছেন তিনি।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাইমুন নামের একজন চাকরি প্রার্থী লিখেছেন, কর্তাদের কথাগুলো শুনে মনে হলো এটা কোনো ব্যপার না, এটা স্বাভাবিক। তাহলে এতো নাটকের দরকার কি? পদগুলো নিলামে তুললেই তো হয়।
এই পোস্টের সঙ্গে ‘প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য জানে না কর্তৃপক্ষ’ শিরোনামে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছেন তিনি।

নিজামুল ইসলাম জুয়েল নামের একজন লিখেছেন, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যারা জড়িত ওরা যাকাত/ছদগার টাকা মেরে দেওয়া জারজদের চাইতেও ভয়াবহ! প্রশ্ন ফাঁসকারীরা কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, কেবল বর্ম হিসেবে রাজনৈতিক দলের ছাতা ব্যবহার করে। এরাই ১০/২০/৫০ হাজার টাকা বেতনের আড়ালে কোটি কোটি কালো টাকার পাহাড় গড়ে …

বাংলাদেশ সময়: ১৮১৫ ঘণ্টা, ১৯ মে ২০১৭

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/কেপিএস

শেয়ার করুন