আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)
ফাইল ছবি

‘ঈদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ খুশি হওয়া, ফিরে আসা, আনন্দ উদ্‌যাপন করা ইত্যাদি। আর ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ জন্মতারিখ, জন্মদিন, জন্মকাল ইত্যাদি। অতএব, ‘মিলাদুন্নবী’ (সাঃ) বলতে নবীজীর আগমনকে বোঝায়। আর ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ (সাঃ) বলতে নবী করীম (সাঃ)-এর আগমনে আনন্দ উদ্‌যাপন করাকে বোঝায়।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) হচ্ছে শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)-এর জন্মদিন হিসেবে মুসলমানদের মাঝে পালিত একটি উৎসব। বিশ্ব মুসলিমদের মাঝে এ দিনটি বেশ উৎসবের সঙ্গে পালন হতে দেখা যায়। তবে এ উৎসব নিয়ে ইসলামী পন্ডিতদের মাঝে অনেক বিতর্ক রয়েছে। হিজরি বর্ষের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশি মুসলমানরা এই দিনকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) বলে অভিহিত করে থাকেন। আর পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কাছে এই দিনটি নবী দিবস হিসেবে পরিচিত।

‘ঈদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ খুশি হওয়া, ফিরে আসা, আনন্দ উদ্‌যাপন করা ইত্যাদি। আর ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ জন্মতারিখ, জন্মদিন, জন্মকাল ইত্যাদি। অতএব, ‘মিলাদুন্নবী’ (সাঃ) বলতে নবীজীর আগমনকে বোঝায়। আর ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ (সাঃ) বলতে নবী করীম (সাঃ)-এর আগমনে আনন্দ উদ্‌যাপন করাকে বোঝায়।

সুতরাং অশান্তি আর বর্বরতায় ভরপুর সংঘাতময় আরবের বুকে আঁধারের বুক চিড়ে মহানবী (সাঃ) শান্তি নিয়ে এসে মানবজাতিকে সত্যের, সভ্যতা ও ন্যায়ের দিকনির্দেশনা দিয়ে গোটা বিশ্বকে শান্তিতে পরিপূর্ণ করে তোলেন। মহানবী (সাঃ)-এর পবিত্র শুভাগমনে খুশী উদ্‌যাপন করাটাই হচ্ছে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ (সাঃ)।

ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, নবী (সাঃ)-এর সময়, খোলাফায়ে রাশেদিনের সময় এমনকি তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের সময়েও ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) নামে কোনো উৎসবের প্রচলন ছিল না। জমহুর মুহাদ্দিসিনে কিরাম, ফিকাহ্‌বিদরা এবং ঐতিহাসিকরা এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। আব্বাসীয় খলিফাদের যুগে মুসলমানদের প্রধান দুই ঈদোৎসবের বাইরে কোনো দিনকে সামাজিকভাবে উদ্‌যাপন শুরু হয় হিজরির ৪র্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্যোগে। সর্বপ্রথম ৩৫২ হিজরিতে (৯৬৩ খ্রি.) বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফার প্রধান প্রশাসক ও রাষ্ট্রের প্রধান নিয়ন্ত্রক বনি বুয়াইহির শিয়া শাসক মুইজলি দিনিল্লাহ্‌ ১০ মহররম আশুরাকে শোক দিবস ও জিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখ ‘গাদিরে খুম’ দিবস হিসেবে পালন করার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে এই দুই দিবস সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হয়। ঈদে মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপন করার ক্ষেত্রেও শিয়ারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ইতিহাসবেত্তাদের মতে, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে মিশরের ফাতেমীয় শাসকরা মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপন করতেন এবং ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রচলন শুরু হয় হিজরি ৪র্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই। রাসূল (সাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), ইমাম হাসান (রাঃ) ও ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর জন্মোৎসব উদ্‌যাপনের মূল প্রবর্তক ছিলেন খলিফা মুইজলি দিনিল্লাহ্‌।

ইবনে জারির সূত্র মতে, আব্বাসীয় খলিফাদের যুগে বাদশাহ্‌ হারুনুর রশীদের মাতা খায়জুরান বিবি ১৭৩ হিজরিতে মদিনা শরিফে নবী (সাঃ) এর রওজা মোবারক জিয়ারত করার ও সেখানে দরূদ ও দু’আ পাঠ করার যে ব্যবস্থা রয়েছে, ঠিক সেভাবে নবী (সাঃ) মক্কায় যে ঘরে ভূমিষ্ট হয়েছিলেন, সেই ঘরটির জিয়ারত ও সেখানে দু’আ করার প্রথা সর্বপ্রথম চালু করেন। পরবর্তী সময়ে ১২ রবিউল আউয়ালে ওই নারীর নেতৃত্বে তীর্থযাত্রীরা প্রতি বছর নবী (সাঃ)-এর জন্মদিবস ধরে নিয়ে ওই ঘরে আনন্দোৎসব পালন করা শুরু করেন।

মুসলিমদের মাঝে এই জন্মবার্ষিকী চালু হওয়ার পর আফজাল ইবনে আমিরুল জাইশ (৪৮৫-৫১৫ হি.) মিশরের ক্ষমতা দখল করে এই মিলাদুন্নবীসহ আরও ৫টি [আলী (রাঃ), ফাতিমা (রাঃ), হাসান (রাঃ), হুসাইন (রাঃ) ও জাইনুল আবেদিন (রাঃ)] জন্মবার্ষিকীর প্রথা বাতিল করে দেন। ৫১৫ হিজরিতে শিয়া খলিফা আমির বিল আহকামিল্লাহ্‌ তা পুনরায় চালু করেন। পরবর্তী সময়ে কোরআন সুন্নাহর অনুযায়ী গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবি (৫৩২-৫৮৭ হিজরি) ঈদে মিলাদুন্নবীসহ সব জন্মবার্ষিকী উৎসব বন্ধ করে দেন।

পরবর্তী সময়ে যিনি ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রবর্তক হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ তিনি হলেন, ইরাক অঞ্চলের ইরবিল প্রদেশের শাসক আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দীন কুকুবুরী। তিনিই প্রথম সুন্নিসহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রবর্তন করেন। সিরাতুন্নবি গবেষক ও ঐতিহাসিকরা তাকেই মিলাদুন্নবীর প্রকৃত উদ্ভাবক বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ তিনিই প্রথম এই উৎসবকে বৃহৎ আকারে উদ্‌যাপন শুরু করেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই উৎসবের প্রচলন করেন। সে হিসেবে জানা যায়, ৬০৪ হিজরি থেকে আনুষ্ঠানিক মিলাদ উদ্‌যাপন শুরু হয়। মিলাদের ওপর সর্বপ্রথম ‘কিতাবুল তানভীল ফি মাউলিদিস সীরা-জিল মুনীর’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন স্পেনের অধিবাসী আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান ইবনে দেহিয়া আল কালবি। যিনি তার ৯০ বছরের দীর্ঘ জীবনে ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র ভ্রমণ করেন এবং ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহের সৃষ্টি করেন।

ভারতীয় উপমহাদেশে মিলাদুন্নবী প্রচলনকারীরা ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী মোগল শাসকরা। ইসলামী অনুশাসনে মিলাদ, মিলাদুন্নবী প্রচলনকারী হলেন ফাতেমীয় শাসক শিয়া মতাবলম্বী মুয়িজলি দিনিল্লাহ্‌ আর ভারতীয় উপমহাদেশে মিলাদ প্রচলনকারী হলেন- মোগল সম্রাট হুমায়ুন ও সম্রাট আকবরের মাতা তাদের অভিভাবক বৈরাম খাঁ। সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাষ্ট্রদূত মোগল শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ্‌ এর মাধ্যমে এই উপমহাদেশে সুন্নিদের মাঝে মিলাদুন্নবীর প্রচলন হয়। ফলে শিয়া মতাদর্শী মিলাদ ও মিলাদুন্নবীর আনুষঙ্গিক ব্যাপারগুলো সুন্নিদের মধ্যে প্রচলিত হয়।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদ্‌যাপনের পক্ষাবলম্বীরা তাদের মতের সপক্ষে দলিল হিসেবে সূরা আলে ইমরানের ৮১নং আয়াতটি উল্লেখ করেন। এ আয়াতে আল্লাহ্‌ তা’আলা ইরশাদ করেন- ‘হে প্রিয় রাসূল! আপনি স্মরণ করুন ওই দিনের ঘটনা যখন আল্লাহ্‌ পাক আম্বিয়ায়ে কিরামদের কাছে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, তোমাদের কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি, অতঃপর তোমাদের কাছে যা আছে তার প্রত্যয়নকারীরূপে যখন একজন রাসূল আসবেন তখন তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ইমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে।’

দলিল হিসেবে তারা সূরা ইউনুসের ৫৭ ও ৫৮নং আয়াতটিও উল্লেখ করেন। এ আয়াতে কারিমায় আল্লাহ্‌তাআলা বলেন, ‘হে মানবকুল! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং অন্তরসমূহের বিশুদ্ধতা, হেদায়েত এবং রহমত ইমানদারদের জন্য। হে নবী আপনি বলুন, আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তার দয়া প্রাপ্তিতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে। এটা তাদের সমস্ত ধন দৌলত সঞ্চয় করা অপেক্ষা শ্রেয়।’

পরিশেষে বলা যায় যে, ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদ্‌যাপনের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বিতর্ক থাকার পরেও ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে এ দিনটি কালক্রমে উৎসবে রূপ নিয়ে প্রতি বছর সাড়ম্বরে পালিত হয় এবং বাংলাদেশসহ কতিপয় মুসলিম দেশে এদিনটি সরকারি ছুটির দিন।

তথ্য সূত্রঃ ড. আবদুল আলীম তালুকদার : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর