বিপিএলে টাকার খেলা?

চিররঞ্জন সরকার
রাজকুমার হিরানি পরিচালিত আমির খান অভিনীত বিখ্যাত হিন্দি সিনেমা ‘পিকে’-র একটি দৃশ্য: টিভি অফিসে কন্ডোমের প্যাকেট দেখে তার প্রশ্ন: এটা কার? কেউ স্বীকার করে না। এ বার প্রশ্ন: টাকা হলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে, কন্ডোমের বেলায় কেন নয়? টিভি চ্যানেলের কর্তা বোমান ইরানি তাকে বোঝান, সেক্স এই দুনিয়ায় ব্যক্তিগত বিষয়। তাই কন্ডোমের প্যাকেট কেউ সরাসরি নিতে চায় না। তারপর মোক্ষম প্রশ্ন, ‘সে কি? এখানে সেক্স ব্যক্তিগত? তা হলে সবাই ব্যান্ড পার্টি বাজিয়ে বিয়ে করতে যায় কেন?’ সামাজিক সংস্কার নিয়ে এই এমন রঙ্গ-ব্যঙ্গ সত্যিই অসাধারণ!
.
না, আমরা ‘পিকে’ সিনেমা বা ‘কন্ডোম’ নিয়ে নয়, আলোচনা করব ‘টাকা’ নিয়ে। বিপিএলের টাকা নিয়ে। ‘টাকা হলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে’- কথা মিথ্যে নয়।

নভেম্বরের ২ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) পঞ্চম আসর। প্রতিদিন খেলা হচ্ছে। টি-টুয়েন্টি। ধুম-ধাড়াক্কা মাইর। চার-ছয়ের জোয়ার। বিশ্বের অনেক নামজাদা খেলোয়াড় এসে খেলছেন আমাদের রংপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা, ঢাকার হয়ে খেলতে। বিকেল থেকে বিভিন্ন টেলিভিশনের সামনে ভিড়। সবাই খেলা উপভোগ করতে আগ্রহী। রাজধানীতে বিভিন্ন টিভির শোরুমগুলোর সামনে দেখেছি, রিকশাওয়ালারাও দাঁড়িয়ে খেলা দেখছেন। ক্রিকেট বোঝেন না, তবু তারা খেলার খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যার বাড়ি যে অঞ্চলে, সে সেই দলের সমর্থক বনে যাচ্ছেন। ‘আনন্দ-বিনোদনে’ কেটে যাচ্ছে আমাদের একঘেয়ে জীবন।

প্রশ্ন হলো এই ‘আনন্দ-বিনোদনের’ আয়োজন যারা করেছেন, কত টাকার বিনিময়ে তারা তা করেছেন? আর এই টাকা তারা পেলেন কোথায়? বিপিএলে একেকটি দল গড়তে আসলে কত টাকা লেগেছে, আর এই টাকার উৎসই বা কী? যে টাকা বিপিএলে বিনিয়োগ করা হয়েছে, সব টাকার কি আয়কর দেয়া হয়েছে? নাকি এখানে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ নামের আড়ালে থাকা ব্যবসায়ীরা কালো টাকা বিনিয়োগ করে আরও অনেক ‘টাকা বানানোর একটি উৎসব’ করছেন? এসব তথ্য কি কখনও জানা যাবে? আমাদের সরকার, সরকারের আয়কর বিভাগ কী এ ব্যাপারে উদ্যোগী হবেন?

এবারের বিপিএল আসরে সাতটি দল অংশগ্রহণ করছে। বিসিবি’র কাছে দলগুলো একটা করে খরচের হিসেবও দিয়েছে। বিসিবি’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের বিপিএল আসরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ও রংপুর রাইডার্স সব থেকে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। তাদের খরচের পরিমাণ সমান- দুই কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আর কুমিল্লা ও রংপুরের পর পরই খেলোয়াড় ক্রয়ের অঙ্কে খুলনা টাইটানস দ্বিতীয় স্থানে। তাদের ব্যয় দুই কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অন্যরাও কাছাকাছি অংকের টাকা ব্যয় করে দল গড়েছে। সব মিলিয়ে এবারের বিপিএল আসরের সাতটি ফ্র্যাঞ্চাইজির দল গড়তে মোট খরচ হয়েছে ১৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

বিপিএল ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বেশি ২০৮ জন বিদেশি খেলোয়াড় নিলামে উঠেছেন। এই তালিকায় ক্রিস গেইল থেকে শুরু করে বড় বড় রথি-মহারথিরাও আছেন। বিদেশি ক্রিকেটারদের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করেছে ৭০ হাজার ডলার। প্রশ্ন হচ্ছে, এত কম টাকায় কি সত্যি সত্যি গেইলরা খেলতে এসেছেন বাংলাদেশে? বলা হচ্ছে, দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৫ লাখ টাকায় খেলছেন সাকিব। অনেকেরই প্রশ্ন: বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানদেরও কি মূল্য এত কম?

মজার ব্যাপার হলো প্রতিটি দলে ১০ থেকে ১৪ জন পর্যন্ত বিদেশি খেলোয়াড় খেলছেন। কিন্তু দলগুলো প্রকাশ করেছে মাত্র দুইজন বিদেশি খেলোয়াড়ের মূল্য তালিকা। যেমন ঢাকা ডায়নামাইটস ১৪ জন বিদেশি তারকাদের মধ্যে মাত্র ২ জন খেলোয়াড়ের মূল্য প্রকাশ করেছে। জো ডেনলি ও আকিল হোসেনের সম্মিলিত মূল্য ৪৮ লাখ টাকা। বাকি ১২ জনের দাম প্রকাশ করা হয়নি। দলটিতে রয়েছেন কুমার সাঙ্গাকারা, শেন ওয়াটসন, শহীদ আফ্রিদি, মোহাম্মদ আমির, সুনিল নারিনের মতো তারকা ক্রিকেটার।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স প্রকাশ করেছে শুধু দুইজন বিদেশি খোলোয়াড়ের দাম। সলোমান মায়ার ও রুম্মান রইসের মূল্য নাকি ৫৬ লাখ টাকা। বাকি ৯ জন বিদেশি খেলোয়াড় কত দামে কিনছে? রাজশাহী কিংস দলটিতে আছেন ১০ জন বিদেশি খেলোয়াড়। তবে এ দলটিও মাত্র দুই জন বিদেশির মূল্য প্রকাশ করেছে। ওসামা মির ও রাজা আলি দারের মূল্য ৩২ লাখ টাকা।

খুলনা টাইটান্সে মোট ১৩ জন বিদেশি খেলোয়াড় রয়েছে। এ দলটিও মাত্র ২ জন বিদেশির মূল্য প্রকাশ করেছে। শিহান জয়াসুরিয়া ও জফরা আর্চারের মূল্য ৩২ লাখ টাকা।

রংপুর রাইডার্স মোট ১১ জন বিদেশি খেলোয়াড়ের মধ্যে মাত্র দলটি ৩ জন বিদেশি ক্রিকেটারের মূল্য প্রকাশ করেছে। স্যাম হেইন, সামিউল্লাহ শেনওয়ারি ও জহির খানের মূল্য ৪৪ লাখ টাকা। গেইল, বোপারা, সহ অন্যরা কত পাচ্ছেন? আসল সত্যটা কখনও জানা যাবে কি?

চিটাগাং ভাইকিংস ৯ জন বিদেশির মধ্যে মূল্য প্রকাশ করেছে ২ জনের। নাজিবুল্লাহ জাদরান ও লুইস রিসের মূল্য ২৪ লাখ টাকা। বাকিদের দাম অজানা। সিলেট সিক্সার্সে আছে ১৩ জন বিদেশি। তবে মূল্য প্রকাশ করেছে মাত্র ২ জনের। চতুরঙ্গা ডি সিলভা ও গোলাম মুদাসসির খানের মূল্য ৩২ লাখ টাকা।

দুই বছর আগে বিপিএলে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় ছিলেন গেইল। প্রতি ম্যাচপ্রতি নিয়েছিলেন বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৮ লাখ টাকা! এবার তিনি কত নেবেন? দুই বছর আগে আফ্রিদি নিয়েছিলেন ৭২ লাখ টাকা। এবার তিনি কত নিচ্ছেন?

শোনা যায় খেলোয়াড়দের সঙ্গে দলগুলোর গোপন ‘ডিল’ হয়। তাদের যে টাকায় চুক্তিবদ্ধ ‘দেখানো’ হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা তারা নেন। আর এ সব লেনদেন হয় অবৈধ পন্থায়, অনেক সময় হুন্ডির মাধ্যমে।

এতো গেল খেলোয়াড়দের টাকা-র লুকোচুরির গল্প। এর বাইরে বিবিএলকে ঘিরে জমে উঠেছে জুয়ার আসর। কয়েকদিন আগে ডয়চে ভেলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, এতে বলা হয়: বাংলাদেশে এখন আলোচিত শব্দ ‘বিপিএল জুয়া’৷ এই জুয়া এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামে৷ একে কেউ কেউ বলে টাকা লাগানো৷ আবার কেউ বলেন বাজি৷

প্রতি খেলাতেই মার্কেট এলাকার একটি ক্লাবে টাকা লাগানো হয়৷ ৪০ থেকে ৫০ জন বাজিতে অংশ নেন৷ একেকজন দলপ্রতি ২০-৩০ হাজার টাকা বাজি ধরেন৷ আর টাকা জমা রাখা হয় একটি মাত্র লোকের কাছে৷ যারা জেতেন তারা টাকা নিয়ে যান৷ দলের সক্ষমতা অনুযায়ী বাজির টাকা ওঠা-নামা করে৷।

এমনকি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে অনলাইনেও জুয়া খেলা হয়৷ আন্তর্জাতিক জুয়াড়িরা নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে এই জুযার আসর বসায়৷ বিপিএল নিয়ে যে ঢাকার অলিতে-গলিতে জুয়ার আসর বসে, বিষয়টা সামনে এসেছে বাড্ডায় বিপিএল জুয়া নিয়ে এক তরুণের নিহত হওয়ার পর। আগেও বিপিএলের জুয়া কেন্দ্র করে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষ হয়েছে।

বিপিএলের উদ্বোধনী দিনের প্রথম ম্যাচেই কয়েকশত কোটি টাকার জুয়ার কারবার হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। শত শত কোটি টাকার জুয়া খেলা হচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন বড় বড় হোটেল এবং রেস্তোরাগুলোতে। কম-বেশি সারা দেশেই নাকি চলছে জুয়া খেলা। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় হোটেল-রেস্তোরাঁ এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়েও চলছে বিপিএল নিয়ে জুয়ার এই ভয়ঙ্কর আসর।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জুয়াড়িরা সামনাসামনি না থেকে ব্যবহার করছেন মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এসবের মাধ্যমেই তারা প্রতি ম্যাচ, বল, ওভার কিংবা ব্যাটসম্যানের রানের দর ঠিক করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে গ্রুপ করে বল প্রতি জুয়া খেলা চলছে।

এর আগে বিপিএলে খেলা দেখতে এসে মাঠে বসেই জুয়া খেলতে থাকায় মোট ৭৭ জনকে চিহ্নিত করেছে বিসিবির দুর্নীতি দমন ইউনিট। এরমধ্যে ৬৫ জন বাংলাদেশি। বাকিদের মধ্যে ১০জনই ভারতীয়। এই জুয়ায় অংশ নিয়ে অনেকে নিঃস্ব হচ্ছেন। অনেকে আবার আঙ্গুল ফুলে কলাগাছও বনে যাচ্ছেন।

বোঝাই যাচ্ছে, এই জুয়া-চক্র এক দিনে গজায়নি। ধীরে ধীরে ডানা ছড়িয়েছে। এইসব নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব সরকারের। এর ফলে যে অবৈধ অর্থের লেনদেন হচ্ছে, তার ক্ষতিটা বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে।

সরকারি স্তরে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে এই জুয়া ঠেকানো অসম্ভব নয়। ক্রিকেট বেটিং বা স্পোর্টস জুয়া প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রণয়ন এবং অনলাইন বেটিং সাইট বন্ধে বিটিআরসিকে অবিলম্বে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও খেলোয়াড়দের এই সংক্রান্ত সচেতনতায় এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর ও কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এভাবে ক্রিকেট জুয়ার প্রভাব বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের যে সুন্দর ভাবমূর্তি আছে, তা নষ্ট হবে এবং ক্রিকেট তার সৌন্দর্য হারাবে। ক্রিকেট বেটিংয়ের এর কুপ্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এখনই জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।

মনে রাখতে হবে যে, জুয়ার টাকা খারাপ টাকা। খারাপ টাকা ভালো কাজে নয়, খারাপ কাজেই লাগে। সন্ত্রাসীরাও এই টাকার প্রতীক্ষায় থাকে। যে দেশেই তারা থাকুক, তাদের প্রথম লক্ষ্য সে দেশের অর্থনীতির ভিত ভেঙ্গে চুরমার করে নিজেদের ঐশ্বর্য বৃদ্ধি। নাশকতায় সক্রিয় হওয়ার সহজ রাস্তাও কিন্তু সেটাই। কাজেই সাধু সাবধান!

চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট।
chiroranjan@gmail.com

বাংলাদেশ সময়: ১১২০ ঘণ্টা, ৩০ নভেম্বর ২০১৭
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এসডিএম

SHARE