নতুন কিছু খুঁজে পাই না

মোঃ দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা
যদি বাংলা সাহিত্যের যুগের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগগুলোর মধ্যে তৎকালীন লেখকগণ সমসাময়িক বিষয়াবলী তাদের লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ ততটা সমৃদ্ধ না হলেও যতটুকু তথ্যাদি পাওয়া যায় সেটা মূলত বিভিন্ন রাজবংশের গুণকীর্তন, কোন যুদ্ধের বর্ণনা। মূলত তারা রাজ কবি ছিলেন আর রাজার মন জয় করার লক্ষ্যে রাজাকে নিয়ে তারা কাল্পনিক নানা কাহিনী লিখতেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্মকেও স্থান দেওয়া হতো। তবে প্রাচীন যুগের একটা বড় অংশ ইতিহাস নির্ভর। তবে সেখানেও পক্ষ পাতিত্ব লক্ষ্য করা যায়। যে ইতিহাস তারা লিখেছেন সেটা মূলত সমাজের উচ্চ শ্রেণীর। সেখানে নিম্ন শ্রেনীর কোন স্থান নেই। তবে লেখক শ্রেণীর সংখ্য খুবই কম।

যদি বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের কথা বলি তাহলে দেখা যাবে সেই যুগের লেখকগণ তাদের লেখনীতে সবার আগে ধর্মকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এ সময় হিন্দু লেখকগণ তাদের লেখনীর মাধ্যমে বিভিন্ন দেব-দেবীর নানা গুণ ও শক্তি তুলে ধরেছেন। অন্য দিকে এ সময় বাংলা মুসলমান শাসকদের অধীনে আসলে মুসলিম লেখকগণ তাদের লেখনীতে বিভিন্ন নবী-রাসুল ও পয়গম্বরের নানা গুণকীর্তন তুলে ধরেছেন। দেখা যাচ্ছে হিন্দু মুসলিম ধর্মীয়ভাবে অতিরক্ষণশীলতার কারণে সমাজে অনেক নির্যাতন আর অমানবীয় ঘটনা ঘটেছে। সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করতে গিয়ে অনেককে বলিদান হতে হয়েছে।

এ যুগের চিত্র কর্মতেও ধর্মের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের শেষের লেখকগণ ধর্মের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে মানব প্রেমের উপর জোর দিয়েছেন। এ সময় বেশকিছু প্রেম নির্ভর সাহিত্য রচিত হয়েছে। যেমন ইউসুফ-জুলেখা, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম ইত্যাদি। দেখা যাচ্ছে প্রাচীন যুগ এবং মধ্য যুগে যা কিছু হয়েছে সেটার মধ্যে সৃজনশীলতাই প্রধান ছিল। এই সময় কিছু সাহিত্য রচিত হয়েছে যা মূলত বিদেশী ভাষা থেকে বাংলায় অনুদিত করা হয়েছে। তখনকার লেখকগণের সাহিত্যে বিচরণের যে জায়গাটুকু ছিল তারা সেভাবেই বিচরণ করেছেন। তাদের লেখার মাধ্যমে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার ইতিহাস তারা লিপিবদ্ধ করেছেন যা আমাদের কাছে অমূল্য দলীল।

বাংলা সাহিত্যের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছে আধুনিক যুগে এসে। আধুনিক যুগের প্রথম দিকের লেখকগণ ইতিহাস ও ধর্মের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে তারা নতুন ধারা সৃষ্টি করে সেটা হলো মানব প্রেম, সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষের জীবনবোধ, তাদের সুখ -দুঃখ, সমাজের নানা অসঙ্গতি তারা তুলে ধরেছেন। সমাজকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন। তাদের লেখনীর মাধ্যমে সাহিত্য জগতে সৃষ্টি নানামুখী প্রতিবাদী নারী ও পুরুষ চরিত্র। এ সময় পদ্যের পাশা পাশি গদ্য রীতির প্রচলনও দেখা যায়। যাদের হাত ধরে বাংলা সাহিত্য আজ পরিপূর্ণ প্রায় তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, মীর মোশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, প্রমথ চৌধুরী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. সুনীতি কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, জসিমউদ্দিন প্রমুখ সাহিত্যগণ অন্যতম।

উত্তর অাধুনিক যুগে এসে আমরা আরও কিছু প্রতিভাবান সাহিত্যিক দেখতে পাই তাদের লেখার মাধ্যমে সমসাময়িক সমাজব্যবস্থা ফুটে ওঠেছে। সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, জহির রায়হান,আল মাহমুদ,হুমায়ুন আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, হুমায়ুন আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, মুনতাসির মামুন, ইমদাদুল হক মিলন প্রমুখ।

মূলত তাদের লেখনীর মাধ্যমে সমসাময়িক সমাজের সকল বিষয় ফুটে উঠেছে।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হল আমাদের প্রজন্ম বাংলা সাহিত্যকে কি দিবে? আমি তো লেখার মতো কোন কিছু খুঁজে পাই না। প্রেম ভালবাসা নিয়ে সব যুগেই লেখা হয়েছে। তাদের প্রেমের একটা ধারা ছিল। কিন্তু বর্তমান যুগের প্রেম আমি কোন ধারায় ফেলবো। আজ হলো তো আগামীকাল ভেঙে যাবে। আধুনিক প্রেম হতেও সময় লাগে না আবার ভেঙে যেতেও সময় লাগে।

তাছাড়াও ইন্টারনেটের যুগে প্রেম সহজলভ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে। শুধু নামে প্রেম আছে কিন্তু কারও মধ্যে অনুভুতি নেই। আবার ইন্টারনেটে আসক্তি হওয়ার কারণে তরুণ প্রজন্ম সাহিত্য বিমুখ হয়ে পড়েছে। বর্তমান সমাজের মানুষের মধ্যে মানবতার তেমন কোন বালাই নাই। সব সাহিত্যিক তাদের সমসাময়িক সমাজব্যবস্থা নিয়ে লিখেছেন, সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন কিন্তু আমি কোন সমাজ নিয়ে লিখব? এ সমাজের মানুষ এখন রোবট, অনুভুতিহীন, তাদের জীবন যান্ত্রিকময়, তারা অর্থলোভী, “ক্যারিয়ার গড়তে হবে” নামে বিশেষ শব্দের পিছনে তারা ছুটে চলেছে অবিরাম। তাদের কি একটু সময় হবে আমার সাহিত্য পড়ার? তাই একজন তরুণ হিসেবে আমি সাহিত্যে কি লিখব খুঁজে পাই না। হয় তো একই সমস্যায় ভুগছে আমার মতো অনেকেই।

সমস্যটা এমন হয়েছে যে আমি যে বিষয় নিয়ে লিখবো সেই একই বিষয় আরও অনেকে আগে লিখছেন। আমি যা চিন্তা ভাবনা করি সেই একই বিষয় নিয়ে আগে কেউ না কেউ লিখেছেন। তাহলে সমাধান কি? সমাধান একটাই সিরিজ বের করা। অর্থাৎ পূর্বের লেখকরা তাদের বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস যেখানে শেষ করেছেন সেই একই বিষয় নিয়ে শেষ থেকে শুরু করতে চাই। সেই চরিত্রগুলোতে আধুনিকতার ছোঁয়া কেমন লাগবে তা দেখতে চাই। আপেক্ষায় আছি কিছু লেখার স্কোপ খুঁজে বের করার।

লেখকঃ দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

বাংলাদেশ সময়: ১৩৫৫ ঘণ্টা, ১৬ অক্টোবর ২০১৭
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এসএফ