তবুও থামছে না সাগর পথে মালয়েশিয়া যাত্রা!

দালালদের মাধ্যমে মানুষ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন

মোহাম্মদ ওমর ফারুক
ট্রলার ডুবে মৃত্যু। আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে দীর্ঘ কারাবাসের আশংকা, পথে পথে নানা বিপদ-নির্যাতনের তোয়াক্কা না করেই অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়ছেন অসংখ্য মানুষ। মূলত উন্নত জীবনের আশায় দালালদের মাধ্যমে ভিন্নদেশে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেও এদের অনেকেই মারা যাচ্ছে সাগর পথে। কারো বা ঠিকানা হচ্ছে কারাগার। এরপরও সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়া বন্ধ হচ্ছে না।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ২ লাখের বেশি মানুষ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে গত কয়েক বছরে র‌্যাব-পুলিশ ও বিজিবি ছাড়াও অন্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। আটকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিভিন্ন সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণত প্রথমে ছোট নৌকাযোগে উপকূল থেকে সমুদ্রে বড় জাহাজে তুলে দেয়া হয়। সেই জাহাজ ১০ দিন পর থাইল্যান্ডে পৌঁছায়। থাইল্যান্ড থেকে পরে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়। মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে দেশের সীমানায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কোন বাংলাদেশি আটক হলে সাধারণত আত্মীয়-স্বজনের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয় এবং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ ফেরত পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
সূত্র জানায়, মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে নৌকাডুবিতে গত বছরের মে মাসে মারা গেছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। এরমধ্যে শিশুসহ ৩৮ রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধারের পর দেশে দাফন করা হয়। এছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে একজন, দুইজন করে আরো প্রায় দেড় ডজন অজ্ঞাত মানুষের লাশ উদ্ধার হয়েছে। তবে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবির সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালে। সে সময় দু’টি ট্রলারডুবিতে ২ শতাধিক মানুষ মারা যান। যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। এর মধ্যে দেশের উপকূলে উদ্ধার হয় মাত্র ৮০ জনের লাশ।

সূত্র আরো জানায়, কয়েক মাস আগে থাইল্যান্ডে দালালদের জিম্মিখানায় (বন্দীখানা) মারা গেছেন কক্সবাজারের চকরিয়ার খুটাখালী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়ার শুক্কুর আহমদ ড্রাইভারের ২৩ বছর বয়সী ছেলে পুতিয়া। মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে একই ইউনিয়নের সেগুনবাগিচা এলাকার শাহ আলমের মেয়েজামাই আবুল হাশেম দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। এরকম কক্সবাজারের বিভিন্ন গ্রামের মালয়েশিয়াগামী অসংখ্য যুবকের দীর্ঘদিন ধরে কোন খোঁজ নেই। তবে প্রকৃতপক্ষে কতজন নিখোঁজ রয়েছেন – তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান সরকারি-বেসরকারি কোন দপ্তরে নেই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আজাদ মিয়া বলেন, মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে কতজন মারা গেছে কিংবা নিখোঁজ রয়েছে- তার কোন পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে নেই। তবে কেউ অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে আটক করে এবং মানব পাচারকারী দালালদের বিরূদ্ধে মামলা করে।

জানা গেছে, এভাবে প্রতিবছর মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে বিভিন্ন দেশের বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। গত বছর শ্রীলংকার নৌ-বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন ২ শতাধিক বাংলাদেশি। এছাড়া একই বছরের আগস্টে মিয়ানমার নৌ-বাহিনীর হাতে আটক হন ৩ শতাধিক বাংলাদেশি। থাইল্যান্ডের নৌ-বাহিনীর হাতেও অজ্ঞাত সংখ্যক মানুষ বর্তমানে আটক রয়েছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের জন্য সারাদেশে দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। এরা হতাশাগ্রস্ত মানুষদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে দেড় থেকে ২ লাখ টাকার চুক্তিতে মালয়েশিয়া পাচার করছে। তবে নগদ হিসাবে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে মালয়েশিয়া পৌঁছার পর বাকি টাকা দেয়ার কথা বললেও দালালরা মালয়েশিয়াগামীদের থাইল্যান্ডের জিম্মিখানায় বন্দী করে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে বাকি টাকা আদায় করে। পরে মালয়েশিয়ার জঙ্গলে তাদের ঠেলে দেয়া হয়। এভাবে মালয়েশিয়া গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে চার মাস ধরে জেল খাটছেন খুটাখালী পূর্বপাড়ার মোহাম্মদ শফির ছেলে সিরাজ। তার মতই একই পরিণতি হয়েছে কুতুপালং এর আবদুর রশীদ, ভারুয়াখালীর নুরুল আমিন ও জোয়ারিয়ানালা ইলিশিয়াপাড়ার মনির ও আবদুল মালেকের।

জানাগেছে, মালয়েশিয়া যাবার পথে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও নৌ-বাহিনী পৃথক অভিযানে ১৫ দালালসহ প্রায় ৪ শতাধিক যাত্রীকে আটক করেছে। এসময় ৩টি ট্রলারও জব্দ করা হয়। কিন্তু প্রত্যেকবার ট্রলারসহ যাত্রী আটক হলেও রহস্যজনক কারণে ট্রলারগুলো ছাড় পেয়ে যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টেকনাফের সর্বত্র পাচারকারী চক্রের কয়েকশ’ দালাল রয়েছে। এ পাচারকারী চক্রের প্রধান ও মাঝিরা অধিকাংশ মিয়ানমারের নাগরিক। স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মানব পাচারের সাথে জড়িত থাকার দায়ে কয়েকদিন আগে শরিফ হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।