আর বাড়ছে না লকডাউনের মেয়াদ

রাজধানীতে গতকাল স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই কেনাকাটার ধুম

২৮ এপ্রিলের পর আর বাড়ছে না লকডাউনের মেয়াদ। সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই খুলে দেওয়া হচ্ছে সবকিছু। জীবন-জীবিকার বিষয়টি মাথায় রেখে লকডাউনের মধ্যেই গত রবিবার থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে শপিং মল, মার্কেট, দোকানপাটসহ সব ধরনের বিপণিবিতান। গণপরিবহনও চালু হবে ২৯ এপ্রিল থেকে। প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বাস, লঞ্চ ও ট্রেন চালুর। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটও এরই মধ্যে চালু হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই জীবন-জীবিকার তাগিদে সবকিছু খোলা হচ্ছে। গণপরিবহনেও নেওয়া হবে অর্ধেক যাত্রী। বন্ধ থাকবে শুধু পর্যটন কেন্দ্র, সভা-সমাবেশ কিংবা বড় কোনো জমায়েত। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, “সামনে ঈদ। মানুষের বাড়ি ফেরা ও ঢাকায় আসার ঢল নামবে। কেনাকাটায় শপিং মলে মানুষ যাবে। এখন স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন করাই হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে করোনাভাইরাস সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।”

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অবশ্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “লকডাউনের পর গণপরিবহন চলাচলে সুযোগ দেওয়া হলে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তা না হলে সরকার আবারও কঠোর লকডাউন দিতে বাধ্য হবে।”

গত রবিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিধিনিষেধ শিথিল করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান ও শপিং মল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর পরিবর্তন এনে বলা হয়, রাত ৯টা পর্যন্ত দোকান ও শপিং মল খোলা রাখা যাবে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. মুনিবুর রহমান জানালেন, সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত ছিল, তা পরিবর্তন হয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চলমান বিধিনিষেধের সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর ২৯ এপ্রিল থেকে গণপরিবহনও চালু হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক গতকাল সাংবাদিকদেরকে জানান, “সরকার যে লকডাউন দিয়েছে এটা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কিছু খোলা থাকবে, কিছু থাকবে না-এটা লকডাউন নয়। তালা যখন মেরে দেওয়া হয়, তখন কিছু খোলা কিছু বন্ধ রাখা হয় না। ঠিক লকডাউনও তেমনই। লকডাউনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষের চলাচল সীমিত করে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু বাংলাদেশে লকডাউনে অনেক কিছুই খোলা রাখা হয়। আবার রাস্তায় কোথাও কোথাও কঠোরতা অবলম্বন করা হয়। লকডাউন ন্যূনতম দুই সপ্তাহ আর আইডিয়াল হচ্ছে তিন সপ্তাহ। লকডাউনে করোনা সংক্রমণ যাতে ছড়াতে না পারে সেজন্য কোনো ধরনের শিথিলতা কাম্য নয়। এখন লকডাউন দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই সব খুলে দেওয়া হচ্ছে। এতে হয়তো আংশিক সফলতা আসতে পারে। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী কোনো প্রভাব পড়বে না।”

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “লকডাউন তুলে নেওয়া হচ্ছে এটা ঠিক নয়। কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হচ্ছে। আমরা পরামর্শ দিয়েছি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট খুলতে। গাড়িতে অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করতে বলেছি। পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ, সভা-সমাবেশ বা নির্বাচন বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। সামনে ঈদ আসছে। আমাদের বাড়ি ফেরার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। গাদাগাদি করে গণপরিবহনে বাড়ি ফেরা যাবে না। এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নইলে আমাদের সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।” আসন্ন ঈদুল ফিতরে মানুষের বাড়ি ফেরা এবং ঈদ-পরবর্তী সময়ে ঢাকায় প্রবেশে সংক্রমণ বাড়তে পারে। সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করেই সড়ক এবং নৌপথে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। ঈদের আগের দিনে মানুষের স্রোত দেখা যায় বাস টার্মিনাল, লঞ্চ এবং ফেরিঘাটগুলোতে। ঢাকার সঙ্গে উত্তরের জেলাগুলোর যোগাযোগের মহাসড়ক টাঙ্গাইল জেলায় কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যানজটে মানুষকে ভোগান্তিও পোহাতে হয়। দক্ষিণাঞ্চলমুখী সব লঞ্চে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। রাস্তায় মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই থাকে না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ জন্য সরকারকে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। গণপরিবহনে কোনোভাবেই অর্ধেকের বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। এ জন্য সরকারের উচিত আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বৈঠক করে মানুষের বাড়ি ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করা। গত ঈদে লকডাউনের মধ্যে সরকারের নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার পরও মানুষের গ্রামে যাওয়া ঠেকানো যায়নি। এবার সরকারকে আগে থেকেই এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, “করোনা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে যত দ্রুত সম্ভব সাড়ে ১২ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। এ জন্য ২৫ কোটি ডোজ টিকা সংগ্রহ করতে হবে। এতে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হওয়ার জন্য জরুরি। সরকারের উচিত হলো সেই লক্ষ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ২৫ কোটি টিকা সংগ্রহ করে সাড়ে ১২ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনা। পাশাপাশি করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি সম্পৃক্ত করতে হবে। টিকা নেওয়ার জন্য সচেতন করতে হবে। এটা স্বল্প সময়ের মধ্যেই করতে হবে। এ জন্য জাতীয় করোনা নিয়ন্ত্রণ কৌশল সরকারকে তৈরি করতে হবে। এর সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। জনগণকে এই কৌশল জানাতে হবে। সরকারকে এমন একটি কৌশল নিতে হবে যাতে স্থায়ীভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। কিন্তু কিছু কমল কিছু বাড়ল তাতে সমাধান করা যাবে না।”