রেসকোর্স থেকে ইউনেস্কো

তোফায়েল আহমেদ

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ- যে ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়কেই নাড়া দেয়নি, ভাষণটি সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আমরা আগে বলতাম, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। আমরা এই ভাষণকে অনেক সময় তুলনা করতাম গেটিসবার্গ অ্যাড্রেসের আব্রাহাম লিঙ্কনের ভাষণের সঙ্গে। কিন্তু আজকে বিশ্ববাসীর কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ। কারণ এই ভাষণের মধ্য দিয়ে তিনি সমগ্র জাতিকে জাতীয় মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়েছিলেন। একটি ভাষণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।

পাক-ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে জাতির সামনে তিনি ৬ দফা দাবি পেশ করেছিলেন। ৬ দফা দেওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে সভা করেছেন, গ্রেফতার হয়েছেন, আবার সভা করেছেন, ফের গ্রেফতার হয়েছেন, জামিন পেয়েছেন। অনেক নির্যাতন করার পরও থেমে থাকেননি। যখন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান অনুভব করেছিলেন যে, তাঁর কণ্ঠ দাবানো যাবে না। তাঁকে চিরদিনের জন্য শেষ করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার নামে একটি মামলা দিয়ে তাঁকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোর চেষ্টা করেছিলেন। আমরা জাগ্রত ছাত্রসমাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর ভিপি, জিএস এবং চারটি ছাত্র সংগঠনের আটজন ছাত্রনেতা ঐক্যবদ্ধভাবে ১০ ছাত্রনেতা আমরা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু করি। ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রিয় নেতাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ লক্ষাধিক লোকের সামনে কৃতজ্ঞচিত্তে জাতির পিতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল।

৭ মার্চ। সেদিন ছিল রোববার। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা শুরু করেন ৩টা ৩০ মিনিটে এবং ১৮ মিনিটের একটি বক্তৃতা দিলেন, যা ঐতিহাসিক যুগান্তকারী। বঙ্গবন্ধুর সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। একদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত না হওয়া, অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা। এটা কোনো লিখিত বক্তব্য ছিল না। এই বক্তৃতাটি ছিল তার হৃদয়ের গভীরে যে বিশ্বাস, সেই বিশ্বাস থেকে উৎসারিত। শ্রদ্ধেয়া ভাবি অর্থাৎ বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বলেছিলেন, ‘তোমার এতো চিন্তার কারণ কী? সারা জীবন তুমি একটি লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছো, তোমার জীবনের যৌবন তুমি কারাগারে কাটিয়েছ, ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছ, তুমি যা বিশ্বাস করো, সেই বিশ্বাস থেকেই বক্তৃতা করবে।’ ঠিক সেই বিশ্বাস নিয়েই তিনি বক্তৃতা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর নাম যখন ঘোষিত হলো, তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালেন- আপনারা জানেন সেই ৭ই মার্চের ভাষণ- ‘ভাইয়েরা আমার’ বললেন। বঙ্গবন্ধুর বৈশিষ্ট্য ছিল, যেখানেই জনসভা করতেন বাংলার মানুষকে হৃদয়ের গভীরতা থেকে অন্তরের সঙ্গে সম্বোধন করতেন ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে। সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কানায় কানায় পূর্ণ, লোকে লোকারণ্য। কারোর হাতে বৈঠা, কারোর হাতে কৃষকের লাঙলের ফলা, শ্রমিকের হাতে লাঠি। তিনি যখন বক্তৃতা শুরু করলেন ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে পিনপতন নিস্তব্ধতা চারদিকে। কাছে থেকে আমাদের মনে হয়েছিল এই দিনটির জন্যই তো বঙ্গবন্ধু অপেক্ষা করেছিলেন। সুন্দর একটি বক্তৃতা তিনি রাখলেন। খুব সতর্কতার সঙ্গে তাঁকে বক্তৃতা দিতে হয়েছে। একদিকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন, অন্যদিকে যাতে তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করতে না পারে, সে ব্যাপারে তিনি সজাগ ছিলেন। বক্তৃতার মাঝখানে তিনি চারটি শর্ত আরোপ করে দিলেন। মার্শাল ল’ প্রত্যাহার করো, সেনাবাহিনী ব্যারাকে নিয়ে যাও, নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করো এবং গত কয়েকদিনে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করো। এই চারটি শর্ত দিয়ে বোঝালেন যে, তিনি পাকিস্তান ভাঙতে চান না। তার পরই বললেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো, বাংলার মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো।’ প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কথা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করলেন। অলিখিত এই ভাষণে সারাজীবন যার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, সেই স্বাধীনতার কথা তিনি হৃদয়ের গভীর থেকে বলেছিলেন। তারপর বললেন, ‘ওদেরকে ভাতে মারবো, পানিতে মারবো’- সব কথা তিনি বললেন। অর্থাৎ একটি মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে হয়, একটি গেরিলা যুদ্ধ কীভাবে সংঘটিত করা যায়, তার সব দিকনির্দেশনা তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন। শেষ করলেন এই কথা বলে যে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। সুতরাং এই ভাষণটি যে একদিন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণের মর্যাদা পাবে, এই আস্থা এবং বিশ্বাস আমাদের ছিল। আজ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, ভাষণটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ভাষণ। পৃথিবীর কোনো ভাষণ কোনো দেশে এতবার উচ্চারিত হয়নি। অথচ একদিন এই ভাষণ আমরা বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকীতে বাজাতে পারিনি। তখন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার আমাদের মাইক কেড়ে নিয়ে গেছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমনকি ৭ মার্চেও আমরা এই ভাষণ বাজাতে পারিনি। যখন ‘৯১তে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেছেন, তখন নির্যাতন চলেছে এবং এই ভাষণ আমাদের বাজাতে দেয়নি। তার আগে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে আমরা যখন কাঙালিভোজ করতাম, শহরের প্রতিটি জায়গায় আমরা যেতাম, সেখানে ৭ মার্চের ভাষণ তারা আমাদের উচ্চারণ করতে দিত না।

মনে পড়ে, ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত শত শহীদের রক্তস্নাত মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ‘৯৩-এর ৭ মার্চ দাবি তুলে বলেছিলাম, “মাননীয় স্পিকার, আপনি জানেন যে, আজকে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। এই দিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, যার ওপর ভিত্তি করে ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধ করে আমরা আমাদের প্রিয় এই বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছি…। কিন্তু আজকে ৭ই মার্চের কোনো কর্মসূচি আমাদের টিভি, আমাদের রেডিও কোনো জায়গায় নাই। এটা উপেক্ষিত। এর সঙ্গে সঙ্গে যারা স্বাধীনতাবিরোধী, তারা এই সুযোগে স্বাধীনতার ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এই স্বাধীনতার ইতিহাসকে ম্লান করছে। আমরা ভেবেছিলাম যে, একটা নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে এই স্বাধীনতার ইতিহাসকে তারা সমুন্নত রাখবে। আমাদের তিন জোটের রূপরেখা, সেই ঐতিহাসিক ঘোষণায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, ‘স্বাধীনতার মূল্যবোধকে আমরা যে কোনো প্রকারেই রক্ষা করব।’ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই বাস্তব যে, এটাই সত্য যে, আজকে এই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে এই ৭ই মার্চ পালন করা হচ্ছে না। যে ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে, সেই দিন পালন করা হচ্ছে না…। এই ৭ই মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিব বলেছিলেন যে, ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থেকো, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ সেই ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সামনে রেখে, ৯ মাস যুদ্ধ করে যে দেশ আমরা স্বাধীন করেছি, সেই দেশে আজ পতাকা আছে, জাতীয় সঙ্গীত আছে, নাই সেই স্বাধীনতার মূল্যবোধ। আজকে রেডিও-টিভিতে নাই সেই ঐতিহাসিক ভাষণ, যেই ভাষণ আমাদের ৯ মাসের যুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছিল। তাই আজকে এর তীব্র প্রতিবাদ করছি এই সরকারের কাছে, এই সংসদে দাঁড়িয়ে এখনও আমি অনুরোধ করছি, যাতে আজকে রাতের বেলায় টিভিতে যে অনুষ্ঠান হবে, সেই অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণ যেন প্রচার করা হয়।”

আজ আমরা গর্ববোধ করি। আজ জাতির জনক নেই, তিনি টুঙ্গিপাড়ায় ঘুমিয়ে আছেন। এই বাংলাদেশ তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ তাঁর রক্তে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের জন্যই তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই বাংলাদেশের জন্যই তিনি জীবনের যৌবন তথা ৪,৬৮২ দিন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বে মর্যাদার আসনে আসীন হয়েছে। তিনিও আজ শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন।

৭ মার্চের ভাষণের মূল চালিকাশক্তিই ছিল নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করা। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে যেতাম- সেই দেরাদুনে আমাদের মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং হতো। আমরা বক্তৃতা করতাম, ‘প্রিয় নেতা আপনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আমরা জানি না। যতক্ষণ বাংলাদেশকে আমরা হানাদারমুক্ত করতে না পারব প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু, ততক্ষণ আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাবো না।’ ১৬ ডিসেম্বর দেশকে হানাদারমুক্ত করে আমরা মায়ের কোলে ফিরে এসেছিলাম। আজ ইউনেস্কো কর্তৃক ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্বসভায় স্বীকৃতির এই গৌরবের দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

tofailahmed69@gmail.com

লেখকঃ আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, বাণিজ্যমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

বাংলাদেশ সময়: ১২৫৫ ঘণ্টা, ১৩  নভেম্বর  ২০১৭

SHARE