তরুণ প্রজন্মের উচ্চ শিক্ষায় শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ নোবিপ্রবি

রফিকুল ইসলাম রবি
দেশের বিদ্যমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) অনেক দ্রুততার সঙ্গেই এগিয়ে চলছে। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টি নোয়াখালীবাসির জীবনধারায় বহুমাত্রিক গতিবেগ সঞ্চারের পাশাপাশি দেশের প্রযুক্তি সেক্টরের সম্প্রসারণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া প্রতিযোগীতামূলক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার উ্ন্মোচন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে এভাবে বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা অবকাঠামোগতভাবে উন্নত, একাডেমিকভাবে আধুনিক ও গবেষণাবান্ধব করে গড়ে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এর উপাচার্য প্রফেসর ড. এম অহিদুজ্জামান। উপাচার্য দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন ‘নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হবে উন্নত আধুনিকতম একটি বিশ্ববিদ্যালয়, এটি হবে আজকের প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ’।

উপাচার্য হিসেবে প্রফেসর ড. এম অহিদুজ্জামান ২০১৫ সালের জুন মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি নোবিপ্রবিকে একটি স্থবির, বিশৃঙ্খল, অবস্থা থেকে মুক্ত করে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে আসছেন। ২০০১ এর ১৫ জুলাই সংসদে আইন জারি এবং ২২ জুন, ২০০৬ সালে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এ দীর্ঘ সময় আরো চার উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।

বলা হয়ে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়টি শুরু থেকেই নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলে আসছিল। কিন্তু বর্তমান উপাচার্যের সময়কালে এখানে সকলক্ষেত্রে শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে। ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে সম্পর্ক উন্নয়ন, ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও মান নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার ফল ‘ভিক্টোরিওপিসা ব্রুনেইসিস’ নামে নতুন অমেরুদন্ডী প্রাণীর উদ্ভাবন এবং গাছের শিকডে আলু আর টমেটো নামে ‘পমেটো’ সবজি আবিষ্কার । গবেষণায় এখানকার শিক্ষকরা যে অগ্রণ্য তার প্রমাণ জার্নাল অব নোয়াখালী সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি ‘জেএনএসটিইউ’ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা জার্নাল নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।

নোবিপ্রবিতে বর্তমানে ৫টি অনুষদ, ২৪টি বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউট নিয়ে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে উপকূলবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সমুদ্রসম্পদ কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে উচ্চতর পাঠদান ও গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে এখানে খোলা হয়েছে ওশানোগ্রাফি বিভাগ। বর্তমান বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য ও প্রযুক্তির শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে এখানে খোলা হয়েছে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনায় উজ্জ্বল বাংলাদেশ; আর এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নোবিপ্রবিতে চালু করা হয়েছে টুরিজম এ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের প্রতি লক্ষ্য রেখে নতুন করে খোলা হয়েছে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (অনার্স), ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস এবং সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ।

এখানে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসি, কৃষি, লাইব্রেরী সায়েন্স, আইআইটি বিষয়ে পড়ানো হয়। এছাড়া আছে ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং।

চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০১৭-১৮) এবারের নতুন ৫টি বিষয় সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং, শিক্ষা বিভাগ, টুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম এবং সমাজবিজ্ঞান সহ মোট ২৫টি বিষয়ে ১২০০ আসনে শিক্ষার্থীরা নোবিপ্রবিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে। ভর্তি পরীক্ষা আগামী ৩ এবং ৪ নভেম্বর ২০১৭ অনুষ্ঠিত হবে।

নোবিপ্রবিতে আগামী সেশনে রোবোটিক্স, মেকাট্রনিক্সের মতো প্রযুক্তি নির্ভর আন্তর্জাতিক বিষয় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রযুক্তি জ্ঞানের পাশাপাশি দেশমাতৃকা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ নামে একটি বাধ্যতামূলক কোর্স চালু আছে।

এছাড়া গত সেশনে ‘বাংলাদেশ এন্ড লিবারেশন ওয়ার স্টাডিজ বিভাগ’ নামে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মত একমাত্র নোবিপ্রবিতেই এ বিভাগ খোলা হয়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সকল বিভাগের কোর্স কারিকুলামকে ঢেলে সাজানো হয়েছে যাতে এখান থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করতে পারে।

এখানকার শিক্ষার্থীই পৃথিবীখ্যাত মাইক্রোসফটের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় টিমের সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছে।

এছাড়াও নোবিপ্রবির ছাত্র-ছাত্রীরা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ইউরোপের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএস, পিইচডি ও ফেলোসিফ কোর্সে অধ্যায়নরত। শিক্ষার্থীরা যাতে করে আরো বেশি পরিমাণে বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালসমূহে অধ্যায়নের সুযোগ পায় সে বিবেচনায় চেক প্রজাতন্ত্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ বোহেমিয়া, যুক্তরাজ্যের গ্লাডিয়া এঙ্গলিয়া রাসকিন, স্টারলিং এবং নর্থ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা সমন্বয় কার্যক্রম চালু করেছে নোবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ।

উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই জাপানের কুমামোতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শাকুরা একচেঞ্জ প্রোগ্রাম ইন সায়েন্স’ এর জন্য মনোনীত হয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই দুই শিক্ষার্থী।

একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেকদূর এগিয়েছে। গবেষণায় একটি বিশ্বমানের পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সমুদ্র ও সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ইনস্টিটিউট’। বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরেই ৮৭৫ একর জায়গায় এ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হবে।

এর আওতায় রয়েছে একটি পরিবেশবান্ধব ও উন্নতমানের ‘ট্যুরিস্ট জোন’ ও ‘ব্লু-ইকোনমিক’ জোন। এখানে বিশাল এলাকা জুড়ে ইকোপার্ক থাকবে।

এছাড়া এর ১২৫ একর জায়গা জুড়ে থাকবে সুবিশাল ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও সাফারি পার্ক। ওই ইনস্টিটিউট থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে একটি অত্যাধুনিক জেটি নির্মাণ করা হবে। যা হবে বিশ্বে প্রথম কোনো একক ইনস্টিটিউট যেখানে শিক্ষার্থী ও গবেষকরা জন্য সমুদ্র বিজ্ঞান, সামুদ্রিক সম্পদ, ডেল্টা গঠন, এনভায়রনমেন্টাল ইকোলজি এবং মহাকশ বিষয়সমূহে গবেষণা করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সময়োপযোগী শিক্ষাদানের পাশাপাশি মনস্তাত্বিক বিকাশ ও শারীরিক সক্ষমতা অর্জনের বিষয়টিকে অধিক প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।

সে লক্ষ্যে শরীরচর্চা ও শিক্ষা বিভাগকে সম্পূর্ণরুপে ঢেলে সাজানো হয়েছে। পৃথকভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের হলসমূহে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। বিদ্যমান সাংস্কৃতিক কমিটিগুলোকে উৎসাহিত করে শক্তিশালী করা হয়েছে। যারা এখন ক্যাম্পাসে নানাধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে। জাতীয় পর্যায় থেকেও নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে প্রতিবারই ‘বাংলাদেশ রসায়ন অলিম্পিয়াড ও জাতীয় হাই স্কুল প্রোগ্রামিং কনটেস্ট’ এর আয়োজন করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এম অহিদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ২০৪১ সালের একটি উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রধানমন্ত্রীর রুপকল্পের যথাযথ সফল বাস্তবায়নের সঙ্গে সাথী হয়ে এ লক্ষ্য পূরণে কাজ করে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় শিক্ষার্থী-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, নোয়াখালী অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় প্রশাসন সকলেরই সমর্থন ও সহযোগীতা পেয়ে আসছি। আমার চার বছরের মেয়াদকালের মধ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি আধুনিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের উপযোগী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলবো এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হবে এ প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ।

বাংলাদেশ সময়: ১২৩১ ঘণ্টা, ১৫ অক্টোবর ২০১৭
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এসএফ