নুসরাতের হত্যাকারী মনির গর্ভে সন্তান!

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকারী কামরুন নাহার মনির গর্ভে সন্তান। তার অনাগত সন্তানের বয়স পাঁচ মাস। হত্যায় জড়িত থাকার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন কামরুন নাহার মনি ও জাবেদ হোসেন। শনিবার (২০ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৯টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফ উদ্দিন আহমেদের আদালতে এ জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

নুসরাত হত্যা মামলায় কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেয়া মনি সব অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি তার গর্ভে সন্তানের বয়স পাঁচ মাস বলে জানিয়েছেন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শেষে তাকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

গর্ভে সন্তান ধারণ করে এরকম একটি নৃশংস হত্যাকান্ডে জড়ানোয় মনিকে নিয়ে ফেনীতে সকল মানুষের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা এখন তুঙ্গে।

২০ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে কড়া নিরাত্তার মধ্য দিয়ে ফেনীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফ উদ্দিন আহম্মদের আদালতে মনিকে হাজির করে করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রায় ছয় ঘন্টা ব্যাপি জবানবন্দি রেকর্ডের পর রাত ১০টার দিকে তাদের জবানবন্দির ব্যাপারে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পুলিশ ব‌্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর চট্টগ্রাম বিভাগের স্পেশাল পুলিশ সুপার মো. ইকবাল।

পুলিশ সুপার মো. ইকবাল বলেন, নুসরাত জাহান রাফি হত্যার কিলিং মিশিনে সরাসরি জড়িত ছিলো কামরুন নাহার মনি। নুসরাতের বুকসহ শরীর চেপে ধরেন। এবং তিনি বোরকা ব্যবস্থা করে দেন। উম্মে সুলতানা নুসরাতের পায়ে বেধে চলে যাওয়ার সময় মনি তাকে শম্পা বলে ডাকে। এই শম্পা দেয়া নামটি পপি ও মনির দেয়া নাম। এই কিলিং মিশনে আর কোনো ছদ্ম নাম ব্যবহার হয়নি। মনি আরো জানিয়েছে বর্তমানে সে ৫ মাসের অন্তঃস্বত্তা।

তিনি আরো বলেন, কয়েক ঘন্টা ব‌্যাপী এ স্বীকারোক্তিমূলক জবাবনন্দিতে মনি হত‌্যাকান্ডর ব‌্যাপারে আরো চাঞ্চল্যকর অনেক তথ‌্য দিয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা উল্লেখ করা যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল (শনিবার) সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যায় নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসার এক ছাত্রী সহপাঠি নিশাতকে ছাদের উপর কেউ মারধর করেছে, এমন সংবাদ দিলে সে (নুসরাত) ওই ভবনের তৃতীয় তলায় যায়। সেখানে মুখোশপরা ৫ জন ছাত্রী নুসরাতকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। নুসরাত অস্বীকৃতি জানালে তারা নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়।

গত ২৬ মার্চ নুসরাতের মা শিরীনা আক্তার মামলা করার পরদিন সিরাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই মামলা প্রত্যাহার না করায় ৬ এপ্রিল পরীক্ষার হল থেকে মাদ্রাসার একটি ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন দেয় বোরকা পরা কয়েকজন। আগুনে শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া নুসরাত ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, আগুন দেয়ার সময় প্রথমে চারজনের নাম পাওয়া গেলেও তদন্তে তারা নিশ্চিত হন যে সেখানে পাঁচজন ছিলেন। তারা হলেন- শাহাদাত হোসেন শামীম, যোবায়ের আহমেদ, জাবেদ হোসেন, অধ্যক্ষের ভায়রার মেয়ে উম্মে সুলতানা পপি ও কামরুন নাহার মনি। নুসরাতের সহপাঠী পপি ও মনিও এবার ওই মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

ওই পাঁচজনসহ মোট ১৭ জনকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুই আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক যে জবানবন্দি দিয়েছেন, সেখানে পুরো ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে প্রতিদিনই নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে প্রতিদিনই নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে সেই জবানবন্দি অনুযায়ী ৪ এপ্রিল রাতে এক গোপন বৈঠকে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা হয়। রাঙামাটি থেকে গ্রেপ্তার ইফতেখার উদ্দিন রানাও উপস্থিত ছিলেন ওই বৈঠকে। আর হত্যাকাণ্ডের দিন পপি কৌশলে নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে গেলে আরো কয়েকজনের সঙ্গে গেইটে পাহারায় ছিলেন রানা।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশেই নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করার কথা জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা, সোনাগাজী পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুকছুদ আলম, শিক্ষক আবছার উদ্দিন, নুসরাতের সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, ব্যাংকার কেফায়াত উল্যাহ জনি, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, যোবায়ের হোসেন, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, মো. শামীম, কামরুন নাহার মনি, আব্দুল কাদের, আব্দুর রহিম শরিফ ও ইফতেখার উদ্দিন রানা।