ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিলার মাসুদ এখন ভারতের জামাই!

১৯৯৭ সাল। ঈদের কয়েক দিন বাকি। রমজানের শেষ সময়টায় রাজধানী খুব ব্যস্ত। মার্কেট, বিপণিবিতান, ফুটপাথ, রাস্তায় ভীষণ ভিড়। মানুষের দম ফেলার সময় নেই।

বিকালের দিকে মিরপুর চিড়িয়াখানা সড়ক দিয়ে মামুন তার স্ত্রীকে নিয়ে মার্কেটিং করে রিকশায় যাচ্ছিলেন। তাদের হাতে বেশ কয়েকটি ব্যাগ।

হঠাৎ তাদের রিকশার দুই পাশ দিয়ে দুটি মোটরসাইকেল অতিক্রম করে কয়েক গজ সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মামুন বিপদ আঁচ করেই তার নিজ কোমর থেকে দ্রুত পিস্তলটি হাতে তুলে নিলেন।

ততক্ষণে মোটরসাইকেল থেকে দুই যুবক নেমে দাঁড়িয়েছেন। একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল। আরেকজনের এক হাতে একটি। কালবিলম্ব না করে মামুন গুলি ছুড়তে শুরু করলেন।

মুহূর্তেই দুই হাতে দুই পিস্তল ধরা যুবকটি শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তার দুই হাতের পিস্তলও গর্জে উঠছে। অব্যর্থ গুলি। চারটি গুলি মামুনের শরীরে বিদ্ধ হলো।

মুহুর্মুহু গুলির শব্দে প্রকম্পিত গোটা এলাকা। শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়া যুবককে দেখে পথচারীরা তখন ভেবেছিল, সে প্রশাসনের লোক। যে কারণে যে যার মতো ঘটনাস্থল থেকে সরে গেল। রক্তাক্ত মামুনের দেহ পড়ে রইল রাস্তার ওপর।

তার স্ত্রীকেও আর দেখা যাচ্ছিল না। ঘাতক ওই যুবকটি মামুনের দেহের সামনে এসে দাঁড়াল। সে এতটাই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে যে, মামুনের নিথর দেহে আবারও গুলি চালাচ্ছে।

তার সহযোগীরা এসে তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে জোর করেই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে হাওয়া।

ঘাতক ওই যুবকটির নাম মাসুদ। আন্ডারওয়ার্ল্ডে মোল্লা মাসুদ নামে পরিচিত। সে নিজ হাতে অন্তত দুই ডজন খুন করেছে। অপরাধ সাম্রাজ্যে সবাই তাকে কিলিং মেশিন হিসেবে জানে।

সব কটি খুনই করেছে অপরাধ সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট দুর্ধর্ষ ডন সুব্রত বাইনের হয়ে। মোল্লা মাসুদ সেভেন স্টার গ্রুপের একমাত্র স্ট্রাইকার। আন্ডারওয়ার্ল্ডে খুনিকেই স্ট্রাইকার বলা হয়।

সেভেন স্টার গ্রুপের প্রধান সুব্রত বাইনের সেকেন্ড ইন কমান্ড মোল্লা মাসুদের বাড়ি ঝালকাঠির মহাদেবপুর। তার বাবার নাম আমজাদ হোসেন। বাসা ঢাকার রমনার মীরবাগে।

২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ঘোষণা করা হয়। এ তালিকায় মোল্লা মাসুদ ছিল ১৩ নম্বরে। তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণার পাশাপাশি সারা দেশেই ছবিসহ পোস্টারিং করা হয়। দেশের ইমিগ্রেশনে তার ছবি টাঙিয়ে দেওয়া হয়। ইন্টারপোল তার নামে রেড নোটিস হুলিয়া জারি করে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে।

মোল্লা মাসুদ পুলিশের তাড়া খেয়ে দেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আস্তানা গাড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেখানে গ্রেফতার হয় মোল্লা মাসুদ।

এসএসসি পাসের পর মোল্লা মাসুদ ভর্তি হয় সিদ্ধেশ্বরী কলেজে। ওই কলেজে থাকার সময় জড়িয়ে পড়ে অপরাধ কর্মকাণ্ডে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ছাত্রলীগ থেকে মনোনয়ন চায়। না পেয়ে ছাত্রদলে ধরনা দেয়। সেখান থেকেও সে মনোনয়ন পায় না। শেষে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করে ভিপি পদে নির্বাচন করে। নির্বাচনে হেরে যায় মাসুদ।

শিবিরে যোগদানের পর কয়েক মাস সে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের দেহরক্ষী হিসেবেও কাজ করেছে। যোগ দেয় সুব্রত বাইনের গ্রুপে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে মাসুদ নামে আরও বেশ কয়েকজন থাকায় তার নামের আগে যোগ হয় ‘মোল্লা’ শব্দটি। শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলেই তার নাম হয়ে ওঠে মোল্লা মাসুদ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সুব্রত বাইনের গ্রুপে যোগদানের পর মোল্লা মাসুদকে বেশ কয়েকটি কাজে পাঠানো হয়। যেখানে তাকে হুমকি-ধমকির জন্য পাঠানো হতো, সে খুন করে চলে আসত। চাঁদা দাবি করতে চিঠি নিয়ে গেলেও খুন করা ছাড়া ফিরে আসত না। যে কারণে শুধু খুনের কাজেই তাকে ব্যবহার করত সুব্রত বাইন।

মোল্লা মাসুদের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, মোল্লা মাসুদ তার গ্রুপের সবাইকে বলত, কাম (আন্ডারওয়ার্ল্ডে খুন করাকে কাম বলে) ছাড়া তার ভালো লাগে না। গুলি করার পর ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে না দেখলে তার মনে হয় না, কিছু একটা করেছে।

মাসুদের ভাষায়, ‘চোখের সামনে দাপড়ায়া দাপড়ায়া কেউ মরতাছে, তা দেখলে খুব ভালো লাগে।’

সূত্র জানায়, যে অপারেশনেই তাকে পাঠানো হতো শতভাগ সফল হয়ে আসত মোল্লা মাসুদ। খুব দ্রুত সে সুব্রত বাইনের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করে। সূত্র জানায়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুর্ধর্ষ অপরাধীরাও তাকে সমীহ করে চলত। কথার আগেই তার পিস্তলের গুলি বেরিয়ে যেত। যে কোনো অপারেশনে তার আগে কেউ গুলি ছুড়তে পারত না। ছোট-বড় যে কোনো ধরনের অস্ত্র চালাতে সে পারদর্শী।

মোল্লা মাসুদকে সুব্রত বাইনের দল থেকে ছাড়িয়ে নিতে বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপ চেষ্টা চালালেও তাকে শেষমেশ কেউ নিতে পারেনি।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি সূত্র জানায়, খুন করতেই মোল্লা মাসুদ ভালোবাসে। তার আগে কেউ গুলি চালালে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠত। একটি অপারেশনে সে গুলি করার আগে অন্য কারও গুলিতে খুনের ঘটনা ঘটার পর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল মাসুদ। ওই সময়ই নিজের গ্রুপের সদস্যকেই গুলি করেছিল সে। ১৯৯৯ সালের দিকে সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদসহ গ্রুপের অন্য সদস্যরা মগবাজারে দিনের বেলা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওত পেতে ছিল।

তাদের কাছে খবর ছিল, ওই স্থান দিয়ে যুবলীগ নেতা লিয়াকত যাবেন গাড়িতে করে। কিছু সময় পরই ওই স্থান দিয়ে লিয়াকত গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন। লিয়াকতের গাড়ি দেখেই সুব্রত বাইনের লোকজন এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে।

লিয়াকতের গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। গাড়ি থেকেও পাল্টা গুলি চালানো হয়। লিয়াকতের গাড়ির চালকের দুঃসাহসিকতায় সে যাত্রায় প্রাণে রক্ষা পান লিয়াকত। কিন্তু অস্ত্রহাতে ক্ষুব্ধ তখন মোল্লা মাসুদ। লিয়াকতকে হত্যা করতে না পারায় সে এক পথচারীকে গুলি করে হত্যা করে তখন।

এমনি বহু ঘটনা রয়েছে মোল্লা মাসুদের অপরাধ জীবনে। মোল্লা মাসুদের বিরুদ্ধে খিলগাঁওয়ের তিন হত্যা, মগবাজারের রফিক হত্যা, আদালত প্রাঙ্গণে মুরগি মিলন হত্যাসহ প্রায় দুই ডজন হত্যা মামলা রয়েছে। মুরগি মিলনকেও প্রথম গুলি করেছিল এই মোল্লা মাসুদ। সূত্রমতে, মগবাজারের একটি মার্কেটেই ছিল তাদের আস্তানা।

সেখানে একটি অফিস নিয়ে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করত। পাশাপাশি শিবিরের সঙ্গেও বেশকিছু অপরাধ কর্মকাণ্ড করেছে মোল্লা মাসুদ। ২০০৪ সালে ঢাকায় ক্রসফায়ারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় মোল্লা মাসুদ, সুব্রত বাইন দেশ থেকে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশের পুলিশের ধাওয়া খেয়ে সীমান্তের বেড়া ডিঙিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেয় ভারতে। সূত্রমতে, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর মোল্লা মাসুদ পরিচিতি পায় রাসেল মাসুদ নামে।

পরে মুরশিদাবাদে ভারতীয় নাগরিক রিজিয়া সুলতানাকে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। কিন্তু তার পরও থেমে থাকেনি মোল্লা মাসুদের চাঁদাবাজি। সে ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীকে টার্গেট করে বিভিন্ন সময় মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল। তার সহযোগীদের মাধ্যমে সে চাঁদা তুলত। কোনো কোনো ব্যবসায়ী হুন্ডির মাধ্যমে চাঁদার টাকা তার কাছে পৌঁছে দিতেন।

পশ্চিমবঙ্গে সুব্রত বাইনের সঙ্গে থেকে জাল নোটের কারবারে জড়িয়ে পড়ে। সেখানকার অপরাধী চক্রের সঙ্গে থেকে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় মোল্লা মাসুদ। দীর্ঘদিন অপরাধ জগতে জড়িয়ে থাকার পর ঢাকার এই শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ইন্টারপোলের রেড নোটিসধারী মোল্লা মাসুদ ভারতে গ্রেফতার হয় গত ফেব্রুয়ারিতে। পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি পুলিশ ফেব্রুয়ারিতে ব্যারাকপুর এলাকায় তাকে গ্রেফতার করে।

ইন্টারপোল দিল্লি তার গ্রেফতারের বিষয়টি সে সময় বাংলাদেশ সরকারকে নিশ্চিত করে। মোল্লা মাসুদের বিরুদ্ধে ব্যারাকপুর থানায় বিদেশি নাগরিক অনুপ্রবেশ আইনে মামলা হয়েছে। মামলা নম্বর ৯, তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে বিভিন্ন থানায় দুই ডজনের বেশি মামলা রয়েছে।

সরকারের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে পুরস্কার ঘোষণার পর ভারতে পালিয়ে যায় মোল্লা মাসুদ। ভারতে মূলত সে আবু রাসেল মো. মাসুদ নামে পরিচিত। ভারতীয় নাগরিক রিজিয়া সুলতানাকে বিয়ে করে এক যুগের বেশি সময় মোল্লা মাসুদ সেখানে বসবাস করছে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

বাংলাদেশ সময়: ১১৩০ ঘণ্টা, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৭,
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এ