দুই শিশুর লাশের ওপর শুয়ে টিভি দেখছিল মোস্তফা

রাজধানীর ডেমরা কোনাপাড়া এলাকার শাহজালাল রোডের ‘নাসিমা ভিলা’র নিচতলার সাবলেট ভাড়াটিয়া গোলাম মোস্তফা। গত সোমবার দুপুর থেকেই উচ্চ শব্দে টেলিভিশন দেখছিলেন এই পাষণ্ড। দুপুরে প্রতিবেশী ফুটফুটে দুই শিশু ফারিয়া আকতার দোলা (৫) ও নুসরাত জাহানের (৫) নিখোঁজ সংবাদে বিচলিত পাশের ঘরের আরেক ভাড়াটিয়া আসমা আকতার এতে বিরক্ত হলেও কিছু বলেননি। কী মনে করেন ভেবে মোস্তফার বন্ধ দরজায় ধাক্কা না দিয়ে শিশুদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন তিনি।

কোথাও যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন নাসিমা ভিলার পাশের পুকুরে নুসরাত-দোলা পড়ে গেছে কিনা দেখতে বিকালের দিকে সেই বাড়ির পাশে এসে দাঁড়ান দোলার মামি নূপুর ও খালা মিম। অজানা সন্দেহ থেকেই তারা বাসায় ঢুকে দেখতে পান মোস্তফার ঘরের দরজা খোলা। তিনি খাটে শুয়ে উচ্চ স্বরে দেখছেন টিভি। শিশুদের নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্ষেপে যান। এক হাত নিয়ে নূপুর ও মিমকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেন তিনি। অবশেষে হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্ত্রী আঁখি খানমের সঙ্গে মোস্তফার হট্টগোলে ঘটনা জানাজানি হয়। খবর পেয়ে সোমবার রাতে মোস্তফার খাটের পাটাতনের নিচ থেকেই নুসরাত ও দোলার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এ কথা জানান দোলার চাচি মাফিয়া আফরিন।

নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল দোলার বাবা পলাশ হাওলাদার বাদী হয়ে ডেমরা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এদিকে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত মোস্তফাকে আটক করা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ জানিয়েছে, মোস্তফাকে আটকের জোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে শিশু দোলার স্বজনরা বলছেন, মোস্তফা পুলিশের হেফাজতেই রয়েছে। এ ঘটনায় তার স্ত্রী ও শ্যালককে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

মঙ্গলবার দুপুরে মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে শিশু দুটির লাশের ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক নওশাদ মাহমুদ জানান, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের আগে ওই দুই শিশুর মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ বলা যাচ্ছে না। তবে তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে; শ্বাসরোধে মৃত্যুর আলামতও মিলেছে। মৃত্যুর আগে তারা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ভিসেরা রিপোর্ট পেলে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যাবে।

পুলিশের তৈরি সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নুসরাতের নাক ও বাম চোখের ওপর চাপলাগা কালচে দাগ রয়েছে। তবে তার কান ও যৌনাঙ্গ স্বাভাবিক। যৌনাঙ্গ, নাক ও কান স্বাভাবিক পাওয়া গেলেও দোলার গলার ডানপাশের সামনের দিকে কালচে দাগ রয়েছে।

এদিকে দোলা ও নুসরাতের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কোমলমতি দুই শিশু হত্যার প্রতিবাদে গতকাল অভিযুক্ত মোস্তফাকে প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন ও মিছিল করে স্থানীয় এলাকাবাসী। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কের কোনাপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে দোলার মা পারভিন আকতার ও নুসরাতের মা ফাহিমা বেগম এবং তাদের স্বজন ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অংশ নেন।

দুপুরে মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে নিহত দোলার মামা মো. হাসান বলেন, ‘দুই শিশু হত্যার ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হলে সোমবার গভীর রাতে যাত্রাবাড়ীর শেখদি এলাকা থেকে মোস্তফার শ্যালক তাকে ধরে থানা পুলিশে সোপর্দ করে। রাতেই ওসির রুমে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। থানায় মোস্তফাকেও আমরা দেখেছি। কিন্তু পুলিশ কেন বিষয়টি অস্বীকার করছে বুঝতে পারছি না।’ ডেমরা থানার ওসি সিদ্দিকুর রহমান বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। প্রধান অভিযুক্তকে ধরতে অভিযান অব্যাহত। ধারণা করা হচ্ছে, ধর্ষণের চেষ্টায় শিশু দুটিকে হত্যা করেছে তাদের প্রতিবেশী গোলাম মোস্তফা।’

অসমর্থিত একটি সূত্র জানিয়েছে, কিছু দিন আগেই মোস্তফাকে ইয়াবা সেবনে বাধা দিয়ে গালমন্দ করেছিলেন দোলার বাবা। সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই দোলাকে হত্যার পরিকল্পনা করে মোস্তফা। একসঙ্গে আসায় পরিস্থিতির শিকার হয়ে প্রাণ যায় নুসরাতেরও। তবে দোলার বাবা মো. ফরিদুল ইসলাম এ তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছেন।

কোনাপাড়ার সামিউল আহসান রোডের ৮ নম্বর লেনের ৮ নম্বর বাড়ির নিচতলায় নানার পরিবারের ১০ সদস্যের সঙ্গে থাকত কোনাপাড়া একে আইডিয়াল স্কুলের নার্সারির শিক্ষার্থী দোলা। গতকাল দুপুরে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সন্তান হারিয়ে শোকের মাতম করছেন তার স্বজনরা। বাসার চারটি কক্ষের শেষ ঘরে মা-বাবার সঙ্গে থাকত তাদের একমাত্র সন্তান দোলা। ঘরে ঢুকতেই নজরে পড়ে বিছানায় তার বই-খাতা, কাপড়-সোয়েটার ধরে বিলাপ করে কাঁদছেন মা পারভিন আকতার। আনমনে বলছিলেন, ‘নুসরাতের সঙ্গে খেলা করে তাড়াতাড়ি আসবি বলে গা-গোসল দিয়া তড়িঘড়ি করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলি। আর তো এলি নারে মা। আমার আগে কেন চইল্যা গেলি। আমি এখন কারে নিয়া বাঁচব।’ বলতে বলতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন সদ্য বুকের ধন হারানো এই মা। উপস্থিত কারও সান্ত্বনাই তাকে দমাতে পারেনি।

দোলার চাচি মাফিয়া আফরিন আমাদের সময়কে জানান, সোমবার রাত ৮টার দিকে মোস্তফার স্ত্রী গার্মেন্টসকর্মী আঁখি খানম কাজ শেষে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। আসার পথেই তিনি দুই শিশুর নিখোঁজের বিষয়টি জাানতে পারেন। এর পর ঘরে ঢুকে দুটি বাচ্চার স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখে মাদকাসক্ত স্বামী মোস্তফাকে কড়া প্রশ্ন করেন। এ সময় তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে আঁখি গালি দিয়ে মোস্তফাকে বলেন তুই এই সর্বনাশ কেমনে করলি। এর পর আঁখি দৌড়ে পাশের সাবলেট ঘরে আশ্রয় নেন। তাদের হট্টগোলেই সাবলেট এক ভাড়াটিয়া ঘটনা জানতে পারেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়। দোলাদের বাড়ির পাশেই একটি টিনশেড ঘরে মা-বাবার সঙ্গে থাকত তার খেলার সাথি নুসরাত। গতকাল এই শিশুটির বাসায় গিয়ে স্বজনদের শোকের মাতম করতে দেখা গেছে। খাটে মেয়ের বইখাতা হাতড়ে মোবাইল ফোনে ছবি ধরে কাঁদছিলেন মা ফাহিমা বেগম। ঘটনার দিনই নুসরাত ভর্তি হয়েছিল কোনাপাড়া একে আইডিয়াল স্কুলে। তার বান্ধবী নিহত দোলাও স্কুলটির নার্সারিতে পড়ত।

অশ্রুশিক্ত ফাহিমা বেগম জানান, সোমবার দুপুরে নুসরাতকে স্কুলে প্লে-বেবি শ্রেণিতে ভর্তি করলে নতুন বই নিয়ে বাড়ি ফেরে তাদের একমাত্র মেয়ে নুসরাত। বাবা পলাশ যাত্রাবাড়ীতে কাঁচামালের ব্যবসার কাজ শেষে বাড়ি ফিরে নিজেই নুসরাতকে গোসল করিয়ে দেন। গায়ে লোশন লাগিয়ে দেন মা ফাহিমা। দুপুর ২টার দিকে দোলা এসে খেলার জন্য নুসরাতকে ডাকে। হাত ধরে হাসাহাসি করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় তারা। এর ১০ মিনিট পর তাদের খুনি মোস্তফার বাড়ির পাশে কালাম সাহেবের বিল্ডিংয়ের পাশের মাঠে খেলতে দেখেছিলেন ফাহিমা। এর মিনিট ১৫ পর দোলার নানি এসে শিশুদের খবর জানতে চাইলে তাদের খুঁজতে বের হন তারা। কিন্তু খোঁজে না পেয়ে বিকালে এলাকায় মাইকিং করা হয়। এর পর রাতে মোস্তফার খাটের নিচে মেলে নুসরাত ও তার বান্ধীর লাশ। মেয়ের খুনির ফাঁসি দাবি করেন ফাহিমা বেগম।

দোলা ও নুসরাতের বাসার মতো শিশুদের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ঘাতক মোস্তফার বাড়িতেও। সেখানে দুপুরে কথা হয় বাড়ির মালিক নাসিমা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় মোস্তফার ঘরের দরজা খোলা দেখতে পান। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও তিনি জানতে পারেননি ওই ঘরেই ৪ মাস আগে ভাড়া নেওয়া মোস্তফার খাটের নিচে গুম করে রাখা হয়েছে দুই শিশুর লাশ। ঘণ্টাখানেক পর নিচতলায় হট্টগোল শুনে তিনি নেমে দেখেন মোস্তফার স্ত্রী কাঁদছেন। তাকে মারধর করে পালিয়ে গেছে ওই পাষণ্ড।

পাশের ঘরের ভাড়াটিয়া নারায়ণগঞ্জ ইপিজেডে কর্মরত রানী জানান, সোমবার সকাল থেকেই তিনি কাজে ছিলেন। রাতে ফিরে জানেন ঘটনা। সাবলেট ভাড়াটিয়া আসমা আকতার জানান, সেদিন দুপুর থেকে উচ্চ স্বরে টিভি চালিয়ে রেখেছিলেন মোস্তফা। দুই শিশুর নিখোঁজের খবরে তিনিও তাদের খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। বাসায় ফিরে মোস্তফা ও তার স্ত্রীর মধ্যে তর্ক বিতর্ক শুনতে পান। এ সময় আঁখিকে তিনি বলতে শুনেছেন, ‘কী সর্বনাশ করলি। আমি সবাইরে বইলা দিমু।’ এ সময় মোস্তফা আঁখিকে মারধর করছিলেন।

পুলিশের ডেমরা জোনের এসি ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। প্রধান অভিযুক্ত মোস্তফাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা হবে।’ সূত্রঃ আমাদের সময় ডটকম