সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে আসছে নতুন আইনঃ আইসিটি প্রতিমন্ত্রী

Zunaid Ahmed Palak

অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মানেই যেন বিপদে পরার আশংকা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য, গুজব ও অপপ্রচারসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর সে কারণে একটি নতুন আইন করা হচ্ছে।

আইনটি পাস হলে সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো যেন দেশে অফিস স্থাপনে বাধ্য হয়, সে বিধান রাখা হচ্ছে আইনে। একইসঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী অপপ্রচারকারীদের তালিকাও তৈরি করছে সরকার।

সম্প্রতি সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব জানান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তার সঙ্গে কথা বলেছেন আমাদের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শাওন সোলায়মান।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকার বিরোধী নানা পোস্ট দেখা যায়। কিছু জায়গায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়েও এমন মন্তব্য বা কন্টেন্ট লক্ষ্য করা যায়। এসব নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী? সরকার কী করছে?

পলক: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক অনেক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উৎসে পরিণত হচ্ছে। উস্কানি এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মাধ্যম হিসেবে অনেকেই এটি ব্যবহার করছেন। ফেসবুকের জন্মই হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম হিসেবে। অনেকে এটাকে চমৎকারভাবে ভালো কাজে ব্যবহার করছেন। ইদানিং দেখা যাচ্ছে, অনেকে এটাকে খারাপ কাজে ব্যবহার করছেন।

এজন্য ফেসবুকের কোনো দায় নেই, এটা আমাদের নৈতিকতা, মানসিকতার বিষয়। ফেসবুকে রাষ্ট্র ও সরকার বিরোধী অনেক পোস্ট ও মন্তব্য দেখা যায়। সবার আগে আমাদের বুঝতে হবে যে, অন্য কেউ যদি এগুলো দেখে পোষ্ট বা লাইক শেয়ার না করে তাহলে কিন্তু এটা ছড়ায় না। আমরা যদি তাদের কাজে সাড়া না দেই তাহলে দেখা যাবে একসময় রাষ্ট্র ও সরকার বিরোধী পোস্ট আর কেউ দেবে না এবং এ কাজ থেকে বিরত থাকবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকার বিরোধী পোস্ট নিয়ন্ত্রণে আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে। কেউ যদি এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট বা গুজব ছড়ায়, তাহলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার কি এমন কিছু চাচ্ছে বা এমন কিছুর সুযোগ কি আছে?

পলক: হ্যাঁ, জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলোতে (ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ও অন্যান্য) নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার। এসব মাধ্যমে গুজব প্রচার করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এমনকি ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল খুলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ কমানো ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

সামাজিত যোগাযোগ মাধ্যমসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছড়ানো সব ধরনের অপরাধ অপপ্রচার ঠেকাতে নতুন আইন করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত আইনে দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অফিস স্থাপনেরও বিধান রাখা হবে। এরইমধে সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, তুরস্ক এ ধরনের আইন করেছে। তাদের আইনের ধারাগুলো পর্যালোচনা করে এই আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। ’

প্রস্তাবিত নতুন আইনে পুরো সামাজিক মাধ্যম নিয়ে আমরা কাজ করছি। আইনে ডেটা নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’ প্রথম আইন, যেটা ডিজিটাল নিরাপত্তাকে অ্যাড্রেস করে।

যারা দেশের বাইরে বসে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কি উপায় আছে?

পলক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ দেশবিরোধী কিছু মানুষ দেশের বাইরে বসে নানাভাবে পোস্ট ও কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে মানুষকে উস্কে দিচ্ছে। তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের তালিকা তৈরি করছে। তালিকা অনুযায়ী ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গে রাষ্টদূতের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী ও শিশুর নিরাপত্তার জন্য যে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিল তার সর্বশেষ অবস্থা জানাবেন? অনলাইনে নারীরা অসংখ্য হয়রানির শিকার হন।

পলক: প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে নারী ও শিশুদের আধুনিকতম সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর অ্যাপ এবং কিছু কল সেন্টার নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কাজ করছে। বিপদে সেগুলোই বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বা এসওএস অ্যাপ ব্যবহার করে নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার নারীরা প্রতিনিয়ত সেবা গ্রহণ করছেন।

‘জয় মোবাইল অ্যাপ’- এর মাধ্যমে সেবা পাচ্ছে। রাস্তাঘাটসহ যে কোনো জায়গায় হুট করে কোনো নির্যাতনের শিকার হলে গোপনে মোবাইল ফোনের পাওয়ার বাটনে পরপর চারবার চাপ দিতে হবে। এরপর মোবাইল ফোন ভাইব্রেট হবে। তারপর পাওয়ার বাটনে আর একবার চাপ (মোট পাঁচবার) দিতে পারলেই তিনি যে বিপদে পড়েছেন সে সংকেত চলে যাবে ‘জয় মোবাইল অ্যাপে’।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘উত্তরণ’ এর মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টার (ন্যাশনাল টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১০৯), ন্যাশনাল সেন্টার অন জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক নারী সেবা পাচ্ছেন।

অন্যদিকে ডিএমপি ও র‌্যাবের অ্যাপও নারী ও শিশুদের সেবা দিচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অবাধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে কোন গাইড লাইন তৈরি হবে কি না?

পলক: দেশে সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে নজরদারি করার বিষয়ে সরকার ভাবছে; যেমনটা বলছিলাম। অবাধ তথ্য প্রবাহের কারণে জাতীয়ভাবে সমাজ বিভ্রান্তিতে পড়ে। মানবতাবিরোধী, সমাজবিরোধী বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ হওয়া জরুরি। ‘সরকার ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াকে বাংলাদেশে অফিস খোলা বা অন্তত একজন প্রতিনিধি নিয়োগের কথা বলবে। এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে সরকার যাতে তাদের জানাতে পারে এবং তারা যাতে ব্যবস্থা নিতে পারে সেজন্য এই ব্যবস্থার কথা ভাবা হয়েছে।