একজন ‘সবুজ’ মেয়রের বিদায়

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম

মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত শোকাহত। যদিও বেশ কিছুদিন ধরেই তার গুরুতর অসুস্থতার কথা শোনা যাচ্ছিল; তবুও আশা ছিল তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। পুনরায় মেয়রের দায়িত্ব পালন শুরু করবেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, তিনি আর ফিরলেন না। আমরা জানি, দেশের রাজধানী শহর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নামে দুই ভাগে ভাগ হয়েছে। দুই অংশই অনেক দিন পর্যন্ত প্রশাসক দিয়ে চলছিল। ২০১৫ সালে আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত যে দু’জন মেয়র পেলাম, তাদের একজন হিসেবে আনিসুল হক উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব পেলেন।

তিনি অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে পরিচিত মুখ ছিলেন। কেবল ব্যবসায়ী নন, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বও। তাকে আমরা চিনতাম টেলিভিশনে উন্নত মানের অনুষ্ঠানের সফল উপস্থাপক হিসেবে। উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত, মেধাবী ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যম ব্যক্তিকে মেয়র হিসেবে পেয়ে আমরা খুশি হয়েছিলাম। এ প্রসঙ্গে অবশ্যই বলতে হবে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে নতুন ভূমিকার জন্য বেছে নিয়েছিলেন এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিলেন। রাজনীতির বাইরে থেকে এসে প্রধানমন্ত্রীর এমন আস্থা পাওয়া কম কথা নয়।

নির্বাচিত হওয়ার পর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই তিনি একটি নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। প্রথমেই জানার চেষ্টা করেছিলেন সমস্যাগুলো কী কী। এ জন্য একটি জরিপও পরিচালনা করেছিলেন। নগর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা সভার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখানে আমারও থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেই সভায় খোলামনে মতামত গ্রহণ করতে দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, তার দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সময়ও তার দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য দেখা গেছে। আমরা বলে থাকি, শহর সবার জন্য- ধনী, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, দরিদ্র, সবার। ঢাকা বরং নিম্নবিত্ত ও দরিদ্রদের জন্য বেশি; কারণ তারা সংখ্যায় বেশি এবং তারা ভোটারও বটে। আনিসুল হকও সম্ভবত এভাবেই ভাবতেন। আমরা দেখলাম, নির্বাচনী প্রচারণার জন্য আনিসুল হক প্রথমেই গেলেন মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে পরিচিত হতে। সেখানকার সমস্যা, তাদের মতামত শুনলেন, আস্থা লাভের চেষ্টা করলেন। পরবর্তীকালেও তাদের কথা ভুলে যাননি।

গত বছর কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড হলো, তিনি ছুটে গেলেন ও তাদের পাশে দাঁড়ালেন। মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্রথমেই নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে মনোযোগ দিয়েছিলেন। নগর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, বর্জ্য অপসারণ করা সিটি করপোরেশনের মূল দায়িত্ব। দায়িত্বের মধ্যে যদিও পড়ে না, নতুন মেয়রকে আমরা দেখলাম নগরের যানজট, পরিবহন ব্যবস্থা ঠিক করতে নেমে গেলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, গণপরিবহন ছাড়া সুশৃঙ্খল নগর হবে না। আমাদের মেট্রোরেল নেই, আছে বাস এবং তা খুবই বিশৃঙ্খল। তিনি প্রথমেই বাস পরিবহনকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসতে চাইলেন। শত শত কোম্পানি ও মালিক থেকে পাঁচ-ছয়টি কোম্পানি করে শৃঙ্খলায় আনতে চাইলেন। যদিও তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পেলেন না। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের বিশৃঙ্খলা কুখ্যাত। সংবাদমাধ্যমে অনেক আলোচনার প্রশাসনের অনেক পদক্ষেপ সত্ত্বেও সুরাহা হয়নি। আবার বিষয়টি ‘ঝুঁকিপূর্ণও’ বটে। তিনি শক্ত হাতে সেটা সম্ভব করলেন। মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনালে শৃঙ্খলার কৃতিত্বও তাকে দিতে হবে।

বর্জ্য অপসারণেও মেয়র আনিসুল হক প্রথাগত দায়িত্ব পালনের বাইরে নতুন কিছু করতে চেয়েছেন। যেমন বাড়িঘর বা ভবন থেকে বর্জ্য নিয়ে প্রথমে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার সেন্টারে নিয়ে জড়ো করা। পরিবেশসম্মত স্থাপত্যসমেত মডেলটি ভালো, উপকারে এসেছিল। আগে এসব বিষয়ে কাউকে চিন্তা করতেও দেখিনি। পাবলিক টয়লেটের দিকেও নজর দিয়েছিলেন। আমি বলব, এ ব্যাপারে উদাহরণ তৈরি করেছেন। আমরা বলে থাকি, নগরের দক্ষতা বৃদ্ধি করা, নগরকে চলমান রাখা সবচেয়ে জরুরি। আনিসুল হক সেদিকেই নজর দিয়েছিলেন। নগরকে দক্ষ ও সচল রাখতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ জন্য রাজউক, ওয়াসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পরিবেশ, ভূমি ব্যবহার, পরিবহন সংক্রান্ত পরিকল্পনা থাকতে হয়। তাহলে মেয়রের জন্য কাজ করা সফল হয়। আমরা দেখেছি, আগে এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও পারস্পরিক দোষারোপের প্রবণতা ছিল।

আনিসুল হক ও ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন- উভয়ের ক্ষেত্রেই নগর সংশ্নিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হতে দেখছি আমরা। আনিসুল হক একই সঙ্গে সৌন্দর্যের পূজারি ছিলেন। যে কারণে ফুট ওভারব্রিজে ফুলের টব দিয়েছিলেন। বনানী, গুলশানে ফুটপাত উদ্ধার করতে বেশ সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বনানীতে প্রতিবন্ধীদের জন্যও এখন ফুটপাত ব্যবহার সহজ হয়েছে। এই কাজটা এত সহজ ছিল না। আমাদের শহরে এখনও ৩০-৪০ ভাগ মানুষ হেঁটে কাজে যায়। ফলে ফুটপাত নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হওয়া জরুরি। তিনি কিছু এলাকায় সেটা সম্ভব করেছেন। বেঁচে থাকলে, দায়িত্বে থাকলে অন্যান্য এলাকাতেও করতেন।
আনিসুল হক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। একটা ভবিষ্যতে কী হবে, কীভাবে গড়ে ওঠা দরকার- এটা ভাবা নগরপিতার অন্যতম দায়িত্ব। এই চেষ্টা তিনি করেছেন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে। আমরা একজন নির্ভীক, স্বচ্ছ ধারণাসম্পন্ন ও দক্ষ নগরপিতা বা নগর নেতা পেয়েছিলাম। তাকে হারাতে হলো। আমি আশা করি, তার দৃষ্টান্তগুলো পরবর্তী মেয়ররা কাজে লাগাবেন। পার্ক, খাল, লেক, মাঠ উদ্ধারেও আনিসুল হকের নজর ছিল; নগরবিদ ছাড়াও সাহিত্যিক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এমনকি কৃষিবিজ্ঞানীদের নিয়েও তিনি একটি ‘সবুজ শহর’ গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে বিদায় জানাতে হলো। নগরবাসী আনিসুল হকের অভাববোধ করবে। একটি ছোট বিষয় বলে শেষ করি। আনিসুল হক মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর পাঞ্জাবি-পাজামাই পরতেন। আগের মতো স্যুট-কোট পরতেন না। পোশাক, ভাষা, দেহভঙ্গি যে নেতৃত্বের প্রতীকী পরিচয়, এটা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি, আন্তরিক সমবেদনা নগরবাসীর পক্ষ থেকে।

লেখকঃ নগর বিশেষজ্ঞ

SHARE