তারেক পাসপোর্ট পরিত্যাগ করেছেন, বলল আ.লীগও

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান বাংলাদেশি পাসপোর্ট পরিত্যাগ করেছেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের পর এবার এই তথ্য জানালেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন।

ক্ষমতাসীন দলের নেতা সংবাদ সম্মেলন করে জানান, যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত তারেক রহমান ব্রিটিশ হোম অফিসের মাধ্যমে ডাক যোগে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের পাসপোর্ট পরিত্যাগ করার বিষয়ে বক্তব্য দেয়ায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমকে তারেক রহমানের উকিল নোটিশ পাঠানোর মধ্যেই সোমবার স্বপন এ কথা জানান।

রবিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে দলের ১৯ নেতা ভারত যাওয়ার পর স্বপনকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়। আর দায়িত্ব পাওয়ার পর সোমবার বিকালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডি রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলন করলেন তিনি।

স্বপন বলেন, ‘আপনাদের অবগতির জন্য আমি জানাতে চাচ্ছি, তারেক রহমান ওয়ান ইলেভেনের সময় মুচলেকা দিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরে একবার তিনি পাসপোর্ট রিনিউ করেছেন বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে। এরপরে তিনি ব্রিটেন হোম অফিসের মাধ্যমে বাংলাদেশ দূতাবাসে তাঁর পাসপোর্ট স্যারেন্ডার (সমর্পণ) করেছেন।’

‘বাংলাদেশের পাসপোর্ট রিনিউ করার জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনে কোনো আবেদন করেছেন কি না এটা যদি তারা দেখাতে পারে তাহলে আমরা তাদের বক্তব্যকে স্বাগত জানাব। মূলত তিনি বাংলাদেশের পাসপোর্ট স্যারেন্ডার করেছেন এবং তিনি ব্রিটেনে এখন কী স্ট্যাটাসে আছেন এটা আপনারা সবাই জানেন।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে তারেক রহমানের আইনি নোটিশ পাঠানোর বিষয়ে স্বপন বলেন, ‘পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কোনো মিথ্যাচার করেননি। তিনি সত্য তথ্য উপস্থাপন করেছেন। এ বিষয়ে যদি কোনো আইনি নোটিশ দেওয়া হয়, সে নোটিশ প্রাপ্ত হলে সে অবশ্যই যথাযথ জবাব দেবেন। সত্য তথ্য তিনি প্রকাশ করেছেন, সত্য তথ্য প্রকাশ করার জন্য যদি ক্ষমা চাইতে হয় তাহলে সেটা দুর্ভাগ্যজনক বিষয়।’

গত শনিবার যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেয়া এক সংবর্ধনা সভায় তারেক রহমানের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পরিত্যাগের তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি সেদিন বলেন, ‘লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাসপোর্ট জমা দিয়ে তারেক এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে সবুজ পাসপোর্ট জমা দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন তারেক রহমান। সেই তারেক রহমান কীভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন?’

রবিবার দেশের গণমাধ্যমগুলোতে এই সংবাদ প্রকাশের পর বিএনপির মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী সংবাদ সম্মেলন করে এই তথ্যকে মিথ্যাচার আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান যদি বাংলাদেশি পাসপোর্ট লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা দিয়ে থাকেন তাহলে সেটি প্রদর্শন করুন। হাইকমিশন তো সরকারের অধীন, তাদের বলুন সেটি দেখাতে।’

রিজভী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারির মধ্যে দুপুরে তারেক রহমানের আইনজীবী ও বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং দুটি পত্রিকার সম্পাদক বাংলাদেশ প্রতিদিনের নঈম নিজাম ও কালের কণ্ঠের ইমদাদুল হক মিলনকে আইনি নোটিশ পাঠান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য এই দুটি গণমাধ্যম প্রকাশ করেছিল। নোটিশে ১০ দিনের মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার করা না হলে তিনজনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক স্বপন তার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ব্রিটিশ হোম অফিসের মাধ্যমে ডাক যোগে বাংলাদেশের পাসপোর্ট স্যালেন্ডার করেছেন তারেক রহমান।’

তারেক রহমানের জমা দেয়া পাসপোর্ট দেখাতে রিজভীর চ্যালেঞ্জের পর পাল্টা চ্যালেঞ্জ দেন স্বপন। বলেন, ‘তারেক রহমানের কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকলে দেখাতে বলেন।’

‘এটা আমাদের চ্যালেঞ্জ নয়, আমরা এ তথ্য জানতে চাই। ওনার কাছে কোন পাসপোর্ট থাকলে উনি আমাদের দেখাতে পারেন।’

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন দলের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার চাপা, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, উপদপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, নির্বাহী সদস্য আনোয়ার হোসেন, ইকবাল হোসেন অপু প্রমুখ।

১০ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে তারেক

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তারের পর অসুস্থতার কারণে পরের বছরের শেষ দিকে তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সুযোগ করে দেয় সরকার। চিকিৎসা শেষে তার ফেরার কথা থাকলেও তিনি ফেরেননি।

দুই বছর আগে বিদেশে অর্থপাচার মামলায় তারেককে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা করে হাইকোর্ট। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় তার ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ‍দুই কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা হয়েছে।

এই মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হওয়া মা খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তারেককে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেছে বিএনপি।

তারেকের বিরুদ্ধে আরও বিভিন্ন মামলা চলছে। এর মধ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার বিচার একেবারে শেষ পর্যায়ে। এই মামলায় বিএনপি নেতার মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

এর মধ্যে সাম্প্রতিক যুক্তরাজ্য সফরে গিয়ে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার অঙ্গীকারের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে রওয়ানা হওয়ার আগের দিন স্থানীয় সময় শনিবার যুক্তরাজ্যে এক সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খুনিদের কাছ থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে, যেভাবেই তারককে দেশে ফেরত নেবই নেব। ব্রিটিশ সরকারের সাথে আমি কথা বলেছি।’

বাংলাদেশ সময়ঃ ১৮৪৮ ঘণ্টা, ২৩ এপ্রিল, ২০১৮