রাজকীয় খেলা ক্রিকেট: এত টাকা দেখে রেগে যান মা

বাবা ডিসি অফিসের গাড়িচালক। কিন্তু ছেলের ধরেছে রাজকীয় খেলা ক্রিকেটরোগ। ১২ বছর বয়স থেকে পাড়ায় টেপ টেনিস বল দিয়ে খেলা ছেলেটিকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তি করতেই হলো। তাও অবসরের পর পাওয়া শেষ সম্বল টাকা দিয়ে। টানাটানির সংসারে ক্রিকেটের মতো ব্যয়বহুল খেলা চালিয়ে যাওয়া যে বেশ কঠিন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। মনে একটাই লক্ষ্য খেলতে হবে জাতীয় দলে। ২০০৬ সালে দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। ২৫ বছর বয়সে বিপিএলে খুলনা টাইটান্সের হয়ে দারুণ নৈপুণ্য তার বুকের ভেতরের সেই লালিত স্বপ্ন ডানা মেলেছে। এখন শুধু অপেক্ষা। রংপুরের ছেলে আরিফুল তার ক্রিকেট, জীবন ও স্বপ্ন নিয়ে কথা বলেছেন স্পোর্টস রিপোর্টার ইশতিয়াক পারভেজের সঙ্গে। তার কথোপকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন: ক্রিকেট খেলা শুরু কিভাবে?

আরিফুল: তখন বয়স ১২ হবে। খেলতাম টেপ টেনিসে রংপুরের পাড়ার ভাইদের সঙ্গেই খেলা শুরু। তখন বেশ কয়েকজন বড় ভাই আমার খেলা দেখে দারুণ উৎসাহ দেন। বলেন ক্রিকেট কোচিং শুরু করতে। আমিও ভর্তি হয়ে যাই। কিন্তু আমার বাসা থেকে ক্রিকেট খেলা কেউ পছন্দই করতো না। বলতে গেলে আমাদের বংশে কোনো ক্রিকেটার নেই। বাসার ছোট ছেলে তাই বাবা- ইচ্ছা থাকলেও চাপ দিয়ে খেলা বন্ধ করতে পারেননি। এরপর অনুর্ধ্ব-১৩ দলে খেলি। তখন আমাদের কোচ ছিলেন নাজমুল আবেদিন ফাহিম স্যার। সেই শুরু, অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে খেলতে যাই মালয়েশিয়াতে। পরে বাধ্য হয়ে বাবা-মা আমাকে বিকেএসপিতে ভর্তি করে দেন ২০০৪ সালে। তখন কোচ সালাউদ্দিন স্যারের কাছে অনেক কিছুই শিখি। আমি দ্বিতীয় বিভাগে খেললেও প্রথম বিভাগ খেলেনি। সরাসরি মোহামেডানের হয়ে প্রিমিয়অর লীগে খেলি ২০০৭ সালে। এভাবেই ক্রিকেটার।

প্রশ্ন: ক্রিকেটে পরিবারের সমর্থন কতটা পেয়েছেন?

আরিফুল: শুরুতে তো একেবারেই পরিবারকে পাশে পাইনি। আমার বাবা জেলা প্রশাসকের অফিসে সরকারি চাকরি করতেন। গাড়ি চালাতেন তিনি। কতটা আর বেতন বলেন! আমার বড় আরো তিন ভাইবোন চাইতেন ক্রিকেট না খেলে যেন পড়ালেখা করে অন্য কিছু করি। কিন্তু আমার ইচ্ছা দেখে শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে বিকেএসপিতে ভর্তি করেন। তখন বিকেএসপিতে প্যারেন্টস ডে হতো। কিন্তু আমার বাবা, মা এমনকি পরিবারের কেউ দেখা করতে আসতো না। রংপুর থেকে অনেক দূরে ছিল। এছাড়াও বাবা রিটায়ারমেন্টের পর যে টাকা পেয়েছিলেন তা দিয়ে আমাকে ভর্তি করেছেন। যে কারণে সবার মধ্যেই একটা চাপা অভিমান ছিল।

প্রশ্ন: ক্রিকেট খেলে এখন অনেকটাই সফল, পরিবারের সবার কী মনোভাব?

আরিফুল: এখন সবাই খুশি যে আমি আমার লক্ষ্যে অবিচল আছি, সফলও হচ্ছি। সবাই আসলে গর্ববোধ করে। মা, ভাই, বোন, আমার স্ত্রী সবাই অনেক খুশি। তবে বাবা মারা গেছেন ২০১০ সালে। বেঁচে থাকলে তিনিও অনেক খুশি হতেন।

প্রশ্ন: ক্রিকেট খেলে প্রথম যেদিন টাকা পেয়েছিলেন সেদিনের অনুভূতি কেমন ছিল?

আরিফুল: প্রথম বড় অঙ্কের টাকা পাই মোহামেডান ক্লাব থেকে। ৮০ হাজার টাকা নিয়ে বাসায় গিয়েছিলাম। অবশ্য সেই টাকা থেকে আমি দামি একটা ব্যাট কিনেছি আগে। কারণ দেখতাম জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা নানা রকম ব্রান্ডের ব্যাট দিয়ে খেলতেন। তাই ভালো একটা ব্যাট কেনার লোভ সামলাতে পারিনি। বাকি টাকা যখন আম্মার হাতে দিলাম তখন তিনি রেগে যান। বারবার প্রশ্ন করছিলেন এত টাকা আমি কোথায় পেয়েছি। বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে ক্রিকেট খেলার জন্য এত টাকা পাব। সেবার বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবি ও মায়ের জন্য একটা শাড়িও কিনেছিলাম। এখন বিপিএল খেলে যে টাকা পেয়েছি সেটি দিয়ে বাড়ির কাজে হাত দিয়েছি। জানেনই তো এ দেশের ক্রিকেটারদের জীবন। কখন ইনজুরি হয় বলা যায় না। আর খেলতে না পারলে টাকা কে দেবে!

প্রশ্ন: আমাদের দেশের বেশির ভাগ ক্রিকেটারকেই আগে পরিবার ও টাকার চিন্তা করতে হয়। এটি ভালো ক্রিকেটার তৈরির পথে কতটা অন্তরায়?

আরিফুল: এই যে বিপিএলে বিদেশি যারা আসেন তাদের দেখে অবাক হই যে, এরা ক্রিকেটকে আগে এনজয় করেন। পরে টাকা নিয়ে ভাবেন। তাদের জীবন চালানোর জন্য এত ভাবতে হয় না বলে ক্রিকেট খেলার পেছনে অনেক সময় দিতে পারেন। আমাদের দেশে উলটো, দেখেন অনেক ক্রিকেটার বিপিএলে খেলতেই পারেন না। তখন তাদের জন্য ঢাকা প্রিমিয়ার লীগটা সারা বছরের রুটি-রুজির জন্য জরুরি হয়ে পড়ে। সেখানে এখন আবার ‘প্লেয়ার বাই চয়েজ’ করে ক্রিকেটারদের অসহায় করে দিয়েছে। সত্যি এটি বড় চাপ। কারণ তখন খারাপ করলেই মনে হয় দল পাবো না, দল না পেলে সংসার চালাবো কিভাবে!

প্রশ্ন: প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪ সেঞ্চুরি ১৬ ফিফটি, উইকেটও পেয়েছেন ৭৯টি। নিজেকে অলরাউন্ডার মনে করেন কিনা?

আরিফুল: আমি আসলে ব্যাটিং অলরাউন্ডার। সত্যি কথা বলতে কি আমি মাশরাফি ভাইয়ের মতো হতে চাই। যদিও আমি মিডিয়াম পেস বোলার, কিন্তু আশা করি সুযোগ পেলে ব্যাট-বলে কিছু করে দেখাতে পারবো। গতবার বিপিএলে বলও করেছিলাম। এবার বিদেশি ক্রিকেটার এত ছিল যে সেই সুযোগই পাইনি।

প্রশ্ন: আপনার খেলা ৪৪ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে এখনো ফিফটির দেখা পাননি। এ নিয়ে কতটা চিন্তিত?

আরিফুল: চিন্তা তো অবশ্যই আছে। কিন্তু আমি যেখানে খেলি ৭ কিংবা ৮ নম্বরে নেমে বলও খুব পাই না। সুযোগও থাকে কম। আবার যেদিন দেখি বল বেশি খেলার সুযোগ আছে কিন্তু দলের এমন অবস্থা সেখানে আমাকে অনেক সাবধানে ব্যাট করতে হবে। কিংবা অনেক কম বলে ২০/২৫ রান করতে হবে। তখন স্কোরটা বড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। সত্যি বলতে কি আমি কখনো নিজের জন্য খেলি না। দলের যে প্রয়োজন সেভাবেই খেলি।

প্রশ্ন: বিপিএলে বিদেশিদের কাছ থেকে কী শিখলেন?

আরিফুল: আমার কোচ মাহেলার সঙ্গে কথা হয়েছে, এছাড়াও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রেথহোয়াইটের সঙ্গেও কথা বলেছি। ক্যারিবীয়ানরা টি-টোয়েন্টিতে এত ভালো, কারণ ওরা অনেক জোরে মারতে পারে। তবে ব্র্যাথওয়েট আমাকে শিখিয়েছে জোরে মারলেই হবে না শরীরের ভারসাম্যও ঠিক রাখতে হবে। মাহেলাও একই কথা বলেছেন। তাদের কথামতোই কাজ করছি। এখন অনেক ভালো হচ্ছে। এছাড়া বিদেশিদের সঙ্গে আমাদের অনেক পার্থক্য। ওরা যেভাবে সারা বছর ভালো অনুশীলনের সুবিধা পায় আমরা কিন্তু তা পাই না।

প্রশ্ন: ফাইনাল খেলতে না পারার দুঃখ কতটা?

আরিফুল: কষ্ট পেয়েছি, হতাশ হইনি। কারণ গেইল যেদিন খেলে সেদিন আসলে কারো কিছু করার থাকে না। গেইলকে আউট করতে পারলে সেদিন আমাদের আর কেউ হারাতে পারতো না।
প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী?

আরিফুল: ক্রিকেট খেলার শুরু থেকেই একটা স্বপ্ন জাতীয় দলে খেলা। তবে আমার লক্ষ্য একটু বেশি, একবার সুযোগ পেলে এমন ভাবে খেলতে চাই যতদিন খেলবো ততদিন যেন কেউ সরাতে না পারে। জায়গা ছাড়বো না। বিকেএসপিতে আমার সঙ্গে ছিলেন নাসির ও মুমিনুল ভাই। ওদের দেখে অনুপ্রেরণা পাই। ভারতের সাবেক অধিনায়ক ধোনি একটা কথা বলেন যে, শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করতে হবে। আমি চাই তেমনই কিছু করতে।-মানবজমিন

বাংলাদেশ সময়: ১৫৫৫ ঘণ্টা, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৭,
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এ