মাসিকের সময় মানসিক সমস্যায় ভুগে কিশোরীরা

মোহাম্মদ ওমর ফারুকঃ 

আভিনা হক রাজধানীর একটি মাধ্যমিক স্কুলে নবম শ্রেনীর শিক্ষার্থী। তার যখন ঋতুস্রাব বা মাসিক হয় তখন সে ভয় পেয়ে যায়। ভেবেছিল সে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। তবে পরে তার ধারনা পাল্টেছে। কিন্তু আভিনা যখন ক্লাসে যেতো অনেক সময় অপ্রস্তুতভাবে মাসিক শুরু হতো। এমন একটি গল্প শুনি তার মুখেই।

আভিনা বলেন,একদিন হঠাৎ করে টের না পেতেই ক্লাসে মধ্যে রক্ত বের হওয়া শুরু হয়েছে। আমি তখনো বলতে পারছি না। কিন্তু আমি যখন ওঠে দাড়িয়েছি তখন সবাই বলছিল আমার পিছনে রক্ত কেন। আমার যেহেতু বিষয়টি জানা ছিল আমি খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। অনেকে আবার মজাও করেছিল।এমন নানা পরিস্থিতি তৈরী হয়। তখন নিজের সাথে খুব জেদ হয়,বিরক্ত লাগে।

আরেকজন,কুমিল্লার মহিষমারা উচ্চ বিদ্যালয়ের জেএসসি পরীক্ষার্থী বিথী আক্তার বলে, ‘শরীর খারাপ (্ঋতুস্রাব বা মাসিক) হলে খুব ভয় পাই। মুরব্বিরা বলেন, শরীরে খারাপ রক্ত থাকলে এভাবে বের হয়। রক্ত থেকে মাছের আঁশটে গন্ধ বের হবে, তাই মাছ-মাংস খাওয়াও বারণ। ঘর থেকে বের হতে না করে। আমার এসব ভালো লাগে না। এসব কারনে সবসময় আমার মন খারাপ থাকে। বিথী আরও বলে, মাসিক অপবিত্র এমন কথা বলে ঘরের কাজ,ঘরের কাজ করতে দেয় না। মাসিকের সময় ব্যবহার করা কাপড় যাতে অন্যরা দেখতে না পায়, সে জন্য আলনার পাশে স্যাঁতসেঁতে জায়গায় শুকাতে হতো। সাবান দিয়ে ধুতে দিত না। এই সমস্যা একা আসমার নয়। দেশের লক্ষ কিশোরী এমন সমস্যার সম্মুখীন হয়।

মাসিক মেয়েদের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। বিশেষ করে মেয়ে ৯ বছর বয়স থেকে মাসিক হতে পারে। নারীদেহকে সুস্থ্য ও গর্ভধারণে সক্ষম করতে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখ থেকে স্বাভাবিক নিয়মে কয়েকদিন ব্যাপী পিরিয়ড হয়। এ সময় মেয়েদের জরায়ু থেকে কার্ভিক্স পার হয়ে জননেন্দ্রিয় দিয়ে রক্ত নির্গত হয়। এই অবস্থার অর্থ তাদের শরীর স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে; স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় হরমোন পাচ্ছে শরীর।

তবে বিশেষ কিছু অনিয়ম ও অবহেলার কারণে মেয়েদের মাসিকের সমস্যা দেখা দেয়। মাসিকের এসব সমস্যার মধ্যে অনিয়মিত মাসিক, সাদা স্রাব, তলপেটে অস্বাভাবিক ব্যাথা ইত্যাদি অন্যতম। সাধারণত ১২ থেকে ৪৫ বছর বয়সী সব নারীরই মাসিক বা ঋতুস্রাব হওয়ার সময়কাল হয়ে থাকে ৩-৫ দিন পর্যন্ত। কিন্তু এর স্বাভাবিক সময়কাল হল কমপক্ষে ২ দিন থেকে ৭ দিন পর্যন্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭ দিনের একটু বেশি সময় ধরে অল্প অল্প করে রক্তস্রাব হওয়াটা স্বাভাবিক; তবে যদি রক্তপ্রবাহ অনেক বেশি হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই অস্বাভাবিক।

মাসিক চলাকালীন দৈহিক পরিবর্তন

মাসিকের সময় কিশোরীদের স্বাভাবিক চিন্তা করার ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পায়। তখন সময়ে সময়ে পেট ব্যথা, পিঠ ব্যথা, বমি বমি ভাব, যৌন কামনা, এসবকিছু মেয়েদের চিন্তা প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। ২০১৪ সালে পেইন জার্নালের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিরিয়ডের সময় মেয়েদের কিছু কিছু বিষয়ে মনোযোগ, মনোযোগের সময়কাল এবং দুটি কাজের মধ্যে মনোযোগ ভাগ হয়ে যাওয়া ও পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি বাধাগ্রস্থ হয়। সেই, পিরিয়ডের সময় মেয়েদের ব্যথা স্নায়ু ক্ষমতার বাইরে।

এই সময়টায় গলার স্বর পরিবর্তন হতে পারে। স্বরতন্ত্র এবং নারীর জননেন্দ্রিয়ের কোষগুলি একই ধরনের এবং হরমোনের কারণে তারা একই রকম আচরণ করে। কিশোরীদের প্রতি মাসিকে গড়ে এক কাপেরও কম রক্ত নিঃসৃত হয়। মেয়েদের হয়ত মনে হতে পারে; শরীর থেকে রক্তের বিরাট প্রবাহ বের হয়ে যাচ্ছে, বক্স বক্স প্যাড হয়ত ব্যবহৃত হয়, কিন্তু নিঃসৃত রক্তের পরিমাণ কম। সাধারণত প্রথম দুই দিন বেশি রক্ত নিঃসৃত হয়। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের মতে, প্রতি মাসে কয়েক চামচ থেকে বড়জোর এক কাপ পরিমাণ রক্ত বের হয় শরীর থেকে। যদি ব্যবহার শুরু করার দুই ঘণ্টার কম সময়ে প্যাড সম্পূর্ণ ভিজে যায় এবং বদলানোর মত হয় তাহলে বুঝতে হবে এটি স্বাভাবিকের বাইরে এবং তখন অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। মেয়েদের মাসিক ২ থেকে ৭দিন পর্যন্ত চলতে পারে। মাসে ২-৩ বার হওয়া বা একেবারেই না হওয়া একটি খারাপ লক্ষণ। তবে হঠাৎ করে এর স্বাভাবিক সময় পরিবর্তন হওয়াটাও খারাপ একটি লক্ষণ। এর জন্য অবশ্যই অভিজ্ঞ কোন ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া জরুরী হয়ে পড়লেও অনেক কিশোরী বিষয়টিই বুঝতে পারে না।

বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার চিত্র ভয়াবহ

‘জাতীয় স্বাস্থ্য পরিচর্যা’ বিষয়ক প্রাথমিক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৮৫ ভাগ নারী ও কিশোরী মাসিক চলাকালীন পুরাতন কাপড় ব্যবহার করেন এবং গ্রামাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে এটি বেশি দেখা যায়। মেয়েদের বিদ্যালয়গুলোতে মাসিককালীন পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার চিত্রটি আরও ভয়াবহ।এই সকল সমস্যার প্রধান কারণ হলো, সচেতনতার অভাব ও সামাজিক কুসংস্কার এবং স্বল্পমূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিনের অপ্রতুলতা। কিন্তু নারী স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য এই প্রচলিত কুসংস্কার বা প্রথাগুলো ভেঙ্গে এটিকে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াটার এইডের সহায়তায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ২০১৩ সালে দেশের সব জেলা থেকে মোট আড়াই হাজার পরিবারের দুই হাজার ১০৭ জন বয়স্ক নারী ও ৩৭৭ জন কিশোরীর তথ্য নেয়। এ ছাড়া ৭০০ স্কুলের ২ হাজার ৩৩২ জন ছাত্রীর মতামত নেয়া হয়। জরিপে দেখা গেছে, ছাত্রীদের ৬৮ শতাংশ বলেছে, প্রথমবার মাসিক হওয়ার আগে তারা এ বিষয়ে জানত না। ছাত্রীদের ৮২ শতাংশ মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় ব্যবহার করে। মাত্র ১ শতাংশ স্কুলে ব্যবহার করা প্যাড ফেলার ব্যবস্থা আছে। জরিপে ৪০ শতাংশ ছাত্রী বলেছে, মাসিকের কারণে গড়ে মাসে তারা তিনদিন স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। অন্যদিকে ৩৮ শতাংশ কিশোরীকে এবং ৪৮ শতাংশ বয়স্ক নারীকে মাসিকের সময় ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয় না। সমাজে এখনো মাসিকের বিষয়টি লুকিয়ে রাখার বিষয় হয়ে আছে। তাই ৪৯ শতাংশ নারী মাসিকের সময় ব্যবহার করা কাপড় শুকানোর জন্য ঘরের অন্ধকার স্থান বা গোপন স্থান বেছে নেন।

কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন

যখন একটি মেয়ে ১০-১২ বছর বয়সে পৌঁছে, তখন তার শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয় । যেমন- উচ্চতা বাড়ে, মাসিক শুরু হয়, স্তন বড় হয়, বগলে ও যৌনাঙ্গে লোম গজায় । কোমর সরু হয়, উরু ও নিত্মদ ভারি হয়, জরায়ু ও ডিম্বাশয় বড় হয়। এই পরিবর্তনগুলোই হচ্ছে মেয়েদের বড় হওয়ার লক্ষণ । মাসিক একটি মেয়ের শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা সাধারণত ১০-১৩ বছর বয়সে শুরু হয় এবং স্বাভাবিক নিয়মে ৪৫-৪৯ বছর বয়স পর্যন্ত চলে । তবে কারও ৯ বছর বয়স থেকেও মাসিক স্রাব শুরু হতে পারে । মাসিক স্রাব শুরু হওয়ার প্রথম বছরগুলোতে কিছুটা অনিয়ম হতে পারে এবং তলপেটে ব্যথা হতে পারে । যদিও এ বয়স থেকেই মেয়েরা গর্ভবতী হতে পারে, তবুও ২০ বছর বয়সের আগে শরীরের বৃদ্ধি পুরোপুরি না হওয়ার কারণে কম বয়সে গর্ভধারণ একটি মেয়ের ও তার গর্ভের শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ।

এই বিষয়ে মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, মাসিকের সময় কিশোরীরা বিষন্নতায় ভুগে। অনেক সময় তারা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ঠিক এমন সময় অনেকে পরিবারের সহযোগিতা বা সার্পোট পায় না। যার কারনেই তারা আরো মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। সেই জন্য প্রয়োজন মানসিক ভাবে তাদেরকে সমর্থন করা। আর মাসিকের যে ব্যপারটি সেটি তো সুস্বাস্থ্যের লক্ষ্যন।

সিমাভি, টিএনও, বিএনপিএস, ডর্প এবং নেদারল্যান্ড সরকারের সহায়তায় ঋতু প্রকল্পের মাধ্যমে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে রড অরেঞ্জ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন্স। এ বিষয়ে রেড অরেঞ্জ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন্স-এর হেড অব প্রোগ্রামস নকীব রাজীব আহমেদ বলেন, মাসিকের সময় কিশোরীদের একটু মানসিক সমস্যা হয় এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সময় বিশেষ করে পরিবারের সার্পোট খুবই জরুরী। যেহেতু মাসিক প্রতিমাসে হয় যারফলে মাসিকের সাথে তার পড়াশোনা ,স্বাভাবিক কাজকর্ম গুলো জড়িত সেই ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যেতে পারে।

নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী বলেন,মাসিক কোন লোকানোর বিষয় নয়। মাসিক নিয়ে সমাজের কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তাহলেই সম্ভব মাসিকের সময় কিশোরীদেও সুরক্ষা দেয়া।

বাংলাদেশ সময়: ১৪০০ ঘণ্টা, ২৩ এপ্রিল, ২০১৮,
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এ