পঞ্চম বছরে শেখ হাসিনা সরকারঃ সামগ্রিক উন্নয়ন সাফল্যে ব্যাপক প্রশংসিত বাংলাদেশ

স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় মেয়াদের বর্তমান সরকার অর্থনীতি, অবকাঠামো, কূটনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের মধ্যদিয়ে সাফল্যের সঙ্গে দেশ পরিচালনা করে পঞ্চম ও শেষ বছরে পদার্পণ করেছে আজ। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব ও সাফল্য গত চার বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এই সময়ে মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত মিয়ানমারের কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনা মানবতা ও শান্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এর জন্য আন্তর্জাতিক মহল তাকে ‘মাদার অফ হিউমিনিটি’ এবং ‘নিউ স্টার অব দ্য ইস্ট’ অভিধায় ভূষিত করে। সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার তৃতীয় জাতীয় উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো যেন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়; সে জন্য সকলের সহযোগিতা একান্তভাবে দরকার। সরকারের সাফল্য ও উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে দেশ সেবায় আবারও সুযোগ চেয়ে আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর ওই ভাষণে উন্নয়নের চিত্র বিস্তারিত ফুটে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও দফতরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গত বছরে বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পুষ্টি, মাতৃত্ব এবং শিশু স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। দেশ আর্থ-সামাজিক সূচকসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যাশাজনক সাফল্য অর্জন করেছে এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ এখন মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহত ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) হার ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৩২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার এবং রফতানির পরিমাণ ৩৮ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার দাঁড়িয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬১০ ডলার। এ সময়ে মুদ্রাস্ফীতি বিগত ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। দারিদ্র্য হার ৫৭ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশ। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছর। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্য পূরণের সুবাদে দেশের ১৬২ মিলিয়ন জনসংখ্যা একটি ডিজিটালাইজড জ্ঞানভিত্তিক সমাজে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই মেয়াদে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ও ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মেগা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দেশের সক্ষমতা বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশে পরিণত করতে চায়। সাম্প্রতিককালে দেশের খাদ্যশস্যের চাহিদা মিটিয়ে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে কৃষি খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকারের যথাযথ সমর্থন এবং কিছু কার্যকর নীতির কারণে বর্তমানে কৃষিখাত ভালো অবস্থানে রয়েছে।

দেশের টেলিকম খাতেও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। দেশের মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০১৭ সালে নভেম্বরে দাঁড়িয়েছে ১৪৩ দশমিক ১০৬ মিলিয়ন। এ সময় মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ দশমিক ১৬৬ মিলিয়ন। দেশের ৫৭ দশমিক ৬৭ লাখ লোককে তাদের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে আর্থিক সহযোগিতা দিতে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রসার এবং বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। দেশের ৮৩ শতাংশের বেশি লোক এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট। জেন্ডার সক্ষমতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে।

গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৬-তে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। পদ্মা সেতু রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রো রেল, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রাসমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু রেল লিংক এবং দোহাজারি-কক্সবাজার-গুনদুম রেল লাইনের মতো মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে। গত বছরের ৩০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু প্রতীক্ষিত দেশের প্রথম রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান নির্মাণকাজ উদ্বোধন করায় বাংলাদেশ গ্লোবাল নিউক্লিয়ার ক্লাবে প্রবেশ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প বহুমুখী পদ্মা সেতু প্রকল্প। দেশের বৃহত্তম এই অবকাঠামোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ইতিমধ্যেই ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দেশের প্রথম ৬ লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ জানুয়ারি ফেনী জেলার মহিপালে এই ফ্লাইওভার উদ্বোধন করেন। দেশের আইটি খাতের নতুন সম্ভাবনা যশোরে ‘শেখ হাসিনা সফটওয়ার টেকনোলজি পার্ক’ প্রধানমন্ত্রী ১০ ডিসেম্বর উদ্বোধন করেছেন। মাতারবাড়িতে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) সুমিতোমো’র নেতৃত্বাধীন জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানের জন্য যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অফ হিউমিনিটি’ বা ‘মানবতার জননী’ আখ্যা দিয়েছে। চ্যানেল ফোর তাদের রিপোর্টে বলেছে- ‘হাজার-হাজার নিঃস্ব ও নির্যাতিত ব্যক্তি যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল নারী ও শিশু দেখেছে তাদেরকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিভাবে তার বিশাল হৃদয় দিয়ে আগলে রেখেছেন।’

মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক খালিজ টাইমস, রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে ‘নিউ স্টার অব দ্য ইস্ট ’ বা ‘পূর্বের নতুন তারকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিশিষ্ট সাংবাদিক ও দৈনিক খালিজ টাইমস-এর সম্পাদক অ্যালান জ্যাকব তার মতামত কলামে লিখেছেন- ‘শেখ হাসিনা সমবেদনা শৈলী জানেন।’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের হাজার-হাজার নিঃস্ব ও নির্যাতিত রোহিঙ্গার জন্য মানবতা ও সমবেদনা জানিয়ে সীমান্ত খুলে দিয়ে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েছেন, তাইতো তিনি ‘পূর্বের নতুন তারকা’। বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদগণ শেখ হাসিনাকে এভাবে বর্ণনা করেছেন- ‘বিশ্ব শান্তির রাষ্ট্রদূত’ এবং ‘বিশ্ব মানবিকতার শীর্ষ নেতা’। তারা বলেছেন- বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে বর্বর নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি অভূতপূর্ব মানবিকতার কাজ করেছেন।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ভার্ড ডিভিনিটি স্কুলের ডীন ডেবিট হ্যাম্পটন, মনে করেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে শান্তির এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

ক্যানবেরায় অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শান্তি ও গবেষণা ইনস্টিউটের প্রধান অধ্যাপক ড. হেনরিক উরদাল বিশ্বাস করেন- বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার অবদানের জন্য শেখ হাসিনা বিশ্ব শান্তির নেতা হিসেবে বিবেচিত হবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য পাঁচ দফা প্রস্তাব সম্বলিত যে ভাষণ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার ভূয়সী প্রশংসা করেছে।

বাংলাদেশ সময়: ১২৪০ ঘণ্টা, ১২  জানুয়ারি, ২০১৮

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/কেএসপি