বেগুনী একটি রঙ

সামিয়া কালাম

মার্চ মাসের শুর থেকেই একটা সাজ সাজ রব। মিডিয়া হাউজ গুলোতে, কর্পরেট অফিস গুলোতে আর বিশেষত ফ্যাশন হাউজ গুলোতে। কর্ম সূত্রে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে যাওয়া আসা করতে হয় প্রতিনিয়ত। একটি অফিসের দুজন নারী কর্মীর আলাপ চারিতা কানে এলো, “আট ই মার্চ কি পড়বে?, শাড়ি নাকি কামিজ?” তখনই চিন্তাটা মনে এলো, আটই মার্চ একটি দিবস। এই দিবসটিকে কেন্দ্র করে বিশ্বের নারীদের সম্মান জানানো হয়। আমি ভালো বোধ করি। টিভি চ্যানেল গুলোর দিকে নজর রাখি কোন কোন নারী কি কি ।অ্যাওয়ার্ড পেলেন। ভালো লাগে দেখতে। কেননা এই যে অ্যাওয়ার্ড, এটা রাতারাতি অর্জন করা যায় না। নারীকে রাত-দিন এক করে পরিশ্রম করে এটা অর্জন করতে হয়। কখনো মিষ্টি ভাষায়, কখনো ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে আবার কখনো সংসার- সংস্কার কে বাজি রেখে বার বার নিজেকে প্রমাণ করে, অর্জন করতে হয় পুরস্কার।

পাশাপাশি এটাও ভাবি, আট ই মার্চ এর এই একটা দিনই কি শুধু নারীদের সম্মান জানানোর জন্য নির্ধারিত? তা কি হওয়া উচিত। এই বিতর্ক বহুদিনের। তাই এই বিষয়ে খুব বেশি কিছু লেখার নেই। পুরস্কার অথবা এওয়ার্ড অথবা প্রপ্তির যে খবর গুলো আমরা সেই দিন পত্রিকায় অথবা টিভিতে দেখতে পাই, সেতো আমাদের জানা হয়ে গেল। এর বাইরে যে অজানা নারীরা রোজকার রুটিন বাঁধা জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন; পরিবার, স্বামী সন্তানের জন্য অথবা বলা যায় সবার জন্য তাদের কথাও কি আমরা ভাবি! হতে পারে তিনি একজন পোশাক শ্রমিক, যৌন কর্মী, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহ সহকারী, গৃহিণী, মা, শাশুড়ি অথবা তাঁর পরিচয় কেবল ‘নারী’।

খুব ভোরে রান্না শেষ করে বেরিয়ে পড়তে হয় বীথিকে, বাচ্চাটা তখনো ঘুমিয়ে থাকে। নাকে মুখে কিছু একটু গুজে সে ছোটে। পেছন ফিরে তাকাবার সময় নেই, পাশের বাড়ির খালাকে বলা আছে, যেন তিনি বাচ্চাটার দিকে একটু নজর রাখেন। এই তো, এভাবেই পিছুটান কে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় বীথি সাথে থাকে তাঁর আরও সারথি। দিন শেষ আবার ছুটতে ছুটতে বাড়ি নামের এক কামরার ঘরটিতে ফেরা, অনেক আশঙ্কা আর চিন্তা মাথায় নিয়ে। ফেরার পথে সস্তায় টুকটাক বাজার। সকালের রান্না, চুলার সিরিয়াল নিয়ে ঝগড়া বিবাদ। দিন কেটে যায় বীথির। নারী দিবস আসে যায়, বীথির কোন বেগুনী পোশাক নেই। সেটার কোন প্রয়োজন সে বোধ করেনা।

পরিকে এক রাতে নিতে হয় চার জন ক্রেতা। কেননা গত মাসে অসুস্থতার কারনে সে অনেক দিন কাজ করতে পারেনি। ঘর ভাড়া বাকি। এ মাসের ঘর ভাড়া বাকি পড়লে তাকেও তাড়িয়ে দেওয়া হবে। তখন ভ্রাম্যমাণ জীবন আর হিজড়াদের সাথে নানা বিবাদ করে টিকে থাকা আরো মুশকিল। এসব ভেবে কষ্ট হলেও সে এক রাতে চার জন ক্রেতার কাছ থেকে সে তাঁর পাওনা বুঝে নেয়। পরির কাছে একটি মাস শেষ হওয়া মানে ঘর ভাড়া, মাশির মাসোয়ারা, এবং খাবার খরচ। তাঁর কাছে ফেবুয়ারী অথবা মার্চ এর খুব বেশি ভেদাভেদ নেই।

ফাতেমা খানম এর স্বামী মারা যাবার পর থেকেই পুরো সংসারের ভার তাঁর ওপর। ছেলেরা যে যার মত কিছু করে, কিন্তু থাকে মা’এর সাথে। বড় মেয়ের বাচ্চা হবে, সেও চলে এসেছে। দুটো মানুষ এর খাবারের বাড়তি যোগান দিতে হয় ফাতেমাকে। পুরুষদের সমান সমান সেও আটটা আস্ত ইট একটানে তুলে নেয় পাঁচ তালায়। ছাদ ঢালাই এর সময় এক নাগারে কাজ করে আট নয় ঘন্টা। শীত কি গ্রীষ্ম সব সময় তাঁর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে। কিন্তু ফাতেমার বিশ্রাম নেই। মাথায় মাথায় দুটো মেয়ে এখনো বিয়ের বাকি। একটা করে মাস পার হয়, আর চিন্তা বাড়ে। ফাতেমাও মার্চ- এপ্রিল এর হিসেব বোঝে না। বহুদিন আগে তাঁর একটি ভাল বেগুনী শাড়ি ছিল। গতবছরের বন্যায় সেটা নষ্ট হয়ে গেছে।

এভাবে বলে চলা যায় কোটি কোটি নারীর গল্প। তাঁরা তাদের দৈনন্দিনের অলিখিত রুটিনে চলতে থাকে। নীল, বেগুনী সবুজের হিসেবের বাইরে কেবল চাহিদা-যোগান এর ভাবনায় যাদের দিন কেটে যায় চলুন তাদের কথা শুনি। তাঁদেরকে নিয়ে ভাবি, তাঁদেরকেও সমান ভাবে সম্মান জানাই।

সামিয়া কালাম

প্রোডিউসার এবং আর জে

সিটি এফ এম ৯৬.০

বাংলাদেশ সময়: ১২০৫ ঘণ্টা, ০৮ মার্চ, ২০১৮

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস