তিনি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন!

ফারজানা হুসাইন সুমনা

হ্যা যা ভাবছেন তাই, তিনি-তবে তার নাম নিচ্ছি না। তাকে আমি চিনি তার ফেসবুকের লম্বা লম্বা পোস্ট দেখে। তাকে চিনি তার ঝরঝরে লেখনির জন্য, সুস্পষ্ট চিন্তার জন্য, নবীশ কিন্তু চমৎকার ফটোগ্রাফির জন্য, তার বুদ্ধিদীপ্ত চাহনির জন্য। কখনও ব্যক্তিগত আলাপ-চারিতা না হওয়া সত্বেও তাকে আপনজন মনে হয় আইনপেশার জন্য। তিনি বলিষ্ঠ কন্ঠ, মেয়েদের প্রিয় বোকা বাবা, স্ত্রীর গৃহপালিত শান্তশিষ্ট স্বামী। তিনি স্ত্রীকে জ্ঞান করেন দূর্গারূপে, অকুন্ঠ প্রশংসা করেন সাহসী স্ত্রীর।এমন একজন ব্যক্তিকে ভালো না বেসে পারা যায় না, একে শ্রদ্ধা না করলে তবে আর কাকে?

প্রশ্ন করতেই পারেন এত কিছু জানি কেমন করে তার সম্পর্কে? ওই যে তার লম্বা লম্বা পোস্ট আর সুখী পারিবারিক জীবনের ছবি যা তিনি বরাবরই শেয়ার করেন তার ফেসবুকের বন্ধু আর অনুসারীদের সাথে।
হঠাৎ গতকাল দেখি এক নারী ফেসবুকে হাজির হয়েছেন কতগুলো নিজস্ব আলাপচারিতার স্ক্রীনশট নিয়ে। সেই প্রেমালাপের একপক্ষ হলেন সেই নারী অন্যপক্ষ আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন তিনি ! দেখি আর নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না মোটেও। হয়ত বলবেন কেন, নারী পুরুষের প্রেম, অসম প্রেম, বিষম প্রেম, স্বকীয়া বা পরকীয়া কি এই প্রথম দেখছি আমি? না, একেবারেই না। কিন্তু ওই যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে আমরা এখন ব্যবহার করি নিজেকে প্রকাশ করতে, অন্যকে জানতে। তিনি ফেসবুকে পাবলিক শেয়ার দেওয়া পোস্টগুলো আর ছবিগুলোর মাধ্যমে আমাকে যে ব্যক্তিসত্ত্বার সাথে পরিচয় করিয়েছেন সে ব্যক্তি স্রেফ গল্প লেখার ছলে প্রিয়তমা স্ত্রী আর পরিবারিক জীবনের প্রেমময় এক রূপকথা ফেঁদেছেন তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় বৈকি। আমি তো কোন গল্পের বই পড়ে, সিনেমা দেখে তার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হইনি। তিনি গণমানুষের সামনে লিখিতভাবে যাহা বলিতেছেন সত্য বলিতেছেন সেই বিশ্বাস থেকে তাকে পছন্দ করেছি। তার প্রেমিকার স্ক্রীনশট থেকে যে ব্যক্তিকে এখন জানছি তিনি নিঃসন্দেহে প্রতারক!

তিনি স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করেছেন কিনা তা কেবল তার স্ত্রী বলতে পারবেন। বদ্ধ দরজার ওপাশে তাদের সম্পর্ক কেমন তা কেবল তারা দুজনেই জানেন। কেবল বিয়ে নামক এক সামাজিক বন্ধনে আছেন বিধায় বিশ্বস্ত থাকবেন একে অপরের প্রতি সদা সর্বদা তা খুব খেলো শোনায়। কিন্তু সঙ্গী না জানিয়ে অন্যত্র প্রেম বা অন্য কোন সম্পর্ক গড়বেন কিনা তা মানুষের বিবেকবোধ তাকে বলে দেয়।

তিনি তার প্রেমিকার সাথে প্রতারণা করেছেন কিনা তা কেবল তার প্রেমিকাই বলতে পারবে। প্রেমিকা তো জানতেন তার প্রেমিকটি বিবাহিত, গৃহী মানুষ। তারপরও তাদের মাঝে কি ধরনের প্রতিশ্রুতি ছিল তা কেবল কয়েকটি স্ক্রীনশট দেখে বলে দেওয়া যায় না মোটেও। সম্পর্কের গতিপথই এমন, শুরুতে একটুখানি কথা, ভালোলাগা দিয়েই হুট করে একটা কিছুর যাত্রা শুরু হয় কিন্তু যত দিন গড়ায় ততই সামন্ত প্রভুর মত সম্পর্কের চাই অধিকার, আরও অধিকার, বেশি বেশি সর্বগ্রাসী অধিকার। আর তখনই দেখা দেয় সম্পর্কের টানাপোড়েন। ব্যক্তিগত কথা-কাব্য প্রেম নিঃশেষ হয়ে গেলে জনসম্মুখে প্রকাশ আর প্রচার করা কতখানি যুক্তি বা বোধসম্মত সে প্রসঙ্গে নাই বা গেলাম আমি আজ।

কিন্তু একজন পাঠক হিসাবে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তার অনুসারী হিসাবে আমার সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেছেন নিঃসন্দেহে। সাবলীল লেখনিতে, প্রেমময় ছবিতে তিনি যখন দিনের পর দিন আমাকে অন্য আর সব পাঠক-অনুসারীর মত বিশ্বাস করিয়েছেন তিনি অনন্য সাধারণ, ঠিক তখনই প্রেমিকার সাথে লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রেমালাপ আর অভিসার চালিয়ে গেছেন সমান্তরালে।

প্রশ্ন করতে পারেন তিনি কী তার ব্যক্তি জীবন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেবেন অবলীলায়? এরকম অঙ্গীকার তিনি কি কখনও করেছেন?

না, করেন নি। তিনি তার সুখী, স্ত্রী-পরায়ন জীবনের চিত্র আমাকে দেখিয়ে বাকি অর্ধেকটা যখন গোপন করেছেন তখন তিনি আসলেই অর্ধসত্য বলেছেন দিনের পর দিন। আর আইনের লোক হয়ে তিনি নিশ্চয়ই জানেন অর্ধসত্য আসলে পুরোটাই মিথ্যা!

তিনি তার স্ত্রী কিংবা প্রেমিকার সাথে প্রতারণা করেছেন কিনা তা বিচারের দায় আমি ঘাড়ে উঠিয়ে নেব না, তবে নিঃসন্দেহে তিনি আমার সাথে, আমার মত অন্য পাঠক-অনুসারীদের সাথে প্রতারণা করেছেন।

লেখকঃ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

বাংলাদেশ সময়: ১৫৩২ ঘণ্টা, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৮

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এস পি

SHARE