Home মতামত ডাকসু নির্বাচনে একজন শিক্ষক হিসেবে আমার ভূমিকা কি ছিল?

ডাকসু নির্বাচনে একজন শিক্ষক হিসেবে আমার ভূমিকা কি ছিল?

- Advertisement -

আমি গর্বিত কারন শিক্ষক হিসেবে ২৮ বছর পরে একটি শতভাগ সুষ্ঠু ডাকসু ও অমর একুশে হল সংসদ নির্বাচন উপহার দিয়েছি। এই নির্বাচনে অমর একুশে হলের একজন আবাসিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। শিক্ষক হিসেবে, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে আমার বিবেক ছিল পরিষ্কার। সৎ থাকলে যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব তা করে দেখিয়েছি। নির্বাচনের প্রায় ১ মাস আগে থেকেই নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে আমরা যে কঠোর পরিশ্রম করেছি সেখানে আমাদের বিশ্বস্ততা ও সততার জায়গা থেকে বিন্দু মাত্র কেউ টলাতে পারেনি। অমর একুশে হলের প্রাধ্যক্ষ মহোদয় আনোয়ার স্যার, রিটার্নিং স্যার দুইজন ইশতিয়াক স্যার এবং আফতাব আলী শেখ স্যার এর মত সৎ ও নির্ভীক চরিত্রের শিক্ষকের সাথে কাজ করে আমরা আবাসিক শিক্ষকগণ আসলেই ধন্য। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে আমরা বিন্দুমাত্র কারচুপির সুযোগ দেইনি। নির্বাচনের আগের দিন থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত কিছু ঘটনাক্রম আপনাদের জানিয়ে রাখি।

১০.০৩.১৯ (ভোটের আগের দিন)
বিকাল ২.০ টাঃ আমরা হলের সকল আবাসিক শিক্ষক একত্রিত হয়েছি। ভোটের বুথ তৈরি করার জন্য। নেতৃত্ব দিয়েছে জাভিদ (আবাসিক শিক্ষক) বন্ধু। আমাদের হলে ১৩৪৬ ভোটার। তাই ২০ টি বুথ তৈরি করা হয়েছিল। ৫ মিনিটে ১ জন ভোট দিলে ২০ বুথে ২০ জন দিতে পারবে। অর্থাৎ ঘণ্টায় ২৪০ জন। ৬ ঘণ্টায় ১৪৪০ জন দিতে পারবে। আমাদের হিসেবের সাথে বাস্তবেও মিলে গিয়েছে। আমরা ৯৫৪ জনের ভোট কাস্ট করেছি যা প্রায় দুপুর ১ টার মাঝেই শেষ হয়ে যায়। শেষের দিকে ভোটকেন্দ্র ফাঁকা থাকে।
বিকাল ৫.০ টাঃ আর্চওয়ে এবং মেটাল ডিটেক্টর বসানো হয়।
বিকাল ৬.০ টাঃ ভোটের টেবিল থেকে শুরু করে অন্যান্য জিনিস প্রস্তুত করা। ৭ টা টেবিল থেকে ব্যালট দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ৭ টেবিলে ১৪ জন শিক্ষক প্রত্যেকে ২০০ জন করে ছাত্রকে স্বাক্ষরসহ ব্যালট প্রদান করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। 
সন্ধ্যা ৭ থেকে ১০ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়েছিল ব্যালট আসার জন্য। 
সেই ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনের অন্যান্য জিনিস কেন্দ্র থেকে আসে রাত ১০ টার একটু পরে। একেবারে দুইটি ট্রাঙ্কে তালাবদ্ধ অবস্থায়। সবকিছু সিলগালা করা। ব্যালট পেপার আমরা খুলেও দেখিনি। যদিও নিয়ম ছিল খুলে দেখে গণনা করার। আমরা তা করিনি। অথচ যদি কোন কারনে নির্বাচনের দিন দেখা যেত ভুল ব্যালট এসেছে, আমরা বিপদে পরে যেতাম। কিন্তু সততার স্বার্থে আমরা তা না খুলেই যেমন অবস্থায় পেয়েছি তেমনই রেখেছি। সবকিছু গ্রহণ করে তা বাক্সবন্দী করে আমাদের হলের প্রাধ্যক্ষ মহোদয়ের কক্ষের ভল্টে রেখে চাবি ইশতিয়াক স্যারের কাছে জমা রাখি। 
১০.০ থেকে রাত ১.০ পর্যন্ত আমরা ১৩ জন শিক্ষক সেই ব্যালট বাক্সসহ সবকিছু পাহারা দেই। ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ২ টা।

- Advertisement -

১১.০৩.১৯

সকাল ৬.০ টাঃ ঘুম থেকে উঠে হলে গিয়ে দেখি প্রভোস্ট স্যার সহ ইশতিয়াক স্যার পাহারা দিচ্ছেন। ভল্ট থেকে এখনো বের করা হয়নি। 
৭.০ টাঃ ভল্ট সকল শিক্ষকের সামনে খুলে ব্যালট বাক্স সহ সরঞ্জাম ভোট কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলো। 
৭.১৫ তে প্রথম ব্যালট বাক্স ট্রাঙ্ক থেকে খোলা হলো। এই প্রথম ব্যালট দেখার সুযোগ হলো। আমরা ব্যালট পেপার বের করে রিটার্নিং অফিসার স্যারের নির্দিষ্ট সিল নির্দিষ্ট জায়গায় মারতে শুরু করলাম। ১০০ টা করে ৭ টেবিলে ৭ জন শিক্ষকের কাছে বিলি করা হল।
৭.৩০ টাঃ সকল প্রার্থীকে ভোট কেন্দ্রে ডেকে জমাদানের ব্যালট বাক্স খুলে দেখানো হয়। সেখানে উপস্থিত ছিল ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বাম দল, স্বতন্ত্র জোটসহ প্রায় ৪০ জনের মতো। তাদের সামনেই ব্যালট বাক্স খুলে দেখিয়ে নিশ্চিত করে আবার সিলগালা করা হয়। স্বতন্ত্র জোটের দুই নেতা অনেকক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় ধন্যবাদ দিয়ে গেল। 
শিকল দিয়ে তালা মেরে দেয়ালের সাথে ব্যালট বাক্স বেঁধে রাখা হয় যেন কেউ টান দিয়ে নিয়ে যেতে না পারে।
৭.৫০ টায় আমরা ভোট গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। আমি নিজে ৩ নম্বর টেবিলে অম্লান গাঙ্গুলি (আমার ফার্মেসী বিভাগের সহকর্মী) অবস্থান নেই। আমার টেবিলে ৪০০-৬০০ ক্রমিক নম্বরের ভোটার আসে।
বাইরে পাঁচজন শিক্ষক ছাত্রদের লাইনে দাড় করানোর কাজ করেছে সুজনের (আবাসিক শিক্ষক) নেতৃত্বে। আমরা জানতাম সুজন এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র অবহেলা করবেনা। কোন অছাত্র কিংবা কেউ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে সে প্রশ্রয় দিবে না। সে, সাইদ ও মুইদ অসাধারণ কাজ করেছে। একজন ছাত্রকে একাধিকবার লাইনে দাঁড়াবার কোন সুযোগই দেয়নি। ছাত্রলীগসহ কোন দলের ছাত্র সংঘটনকে কোন বিশৃঙ্খলা করতে দেয়নি।

৮.০ টাঃ ভোট গ্রহণ শুরু। 
প্রথমে একটু চাপ ছিল। একজন ছাত্র হল সংসদের ১ টি ব্যালট, ডাকসুর ৩ টি ব্যালট সহ মোট ৪ টি ব্যালট পেয়েছে। মোট ২৬০ জনের নাম থেকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী প্রার্থীকে বাছাই করতে একটু সময় লাগছিল। তবে আমরা একটু পর পর তাদের কে তাড়া দিচ্ছিলাম যেন দ্রুত শেষ করে। পিছনে একটু লাইন লেগেছিল। তবে ধীরে ধীরে আমাদের লাইনও এগিয়ে যাচ্ছিল।

একজন ছাত্রের, ভোটার নম্বর ও আইডি কার্ড দেখে তার স্বাক্ষর নিয়ে তাকে ৪টি ব্যালট পেপার বুঝিয়ে দিয়েছি। সাথে সাথে এসআইএফ ফর্ম দেখে তাদের চেহারা মিলিয়েছি।

এরই ফাঁকে সাংবাদিক, নানান প্রার্থী বেশ কয়েকবার ভোটকেন্দ্রের ভিতরে এসে ঘুরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে গিয়েছে। অথচ অনেক তথাকথিত শিক্ষক পর্যবেক্ষককে একবারও আমার চোখে পড়েনি।

মাঝখানে ১১ টার দিকে শুনলাম হল গেটের বাইরে কারা যেন ভিড় করেছে। সঙ্গে সঙ্গে আফতাব স্যার গিয়ে তাদের সরিয়ে দিয়ে আসে। ১১.৩০ টার দিকে ডেইলি স্টার সহ আরো একটি পত্রিকার সাংবাদিক ভোট কেন্দ্রের ভিতরে আসে। তারা ভোটগ্রহন সুষ্ঠু হচ্ছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করে।

হলের আবাসিক ছাত্রসহ অনেক অনাবাসিক ছাত্র আসছিল। তাদের আমি জিজ্ঞাসা করেছি, তোমাদের এখানে আসতে কোথাও কোন সমস্যা হয়েছে কি না? তারা প্রত্যেকে খুশি নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরে। আমার লাইনে ২০০ জনের মাঝে ১৫৪ জন ভোট দিয়েছে। তাদের অধিকাংশই অনাবাসিক ছাত্র ছিল।

১ টার দিকে লাইন শেষ। আমরা বসে আছি। এরপর আর ২-১ জন এসেছিল। আমরা ঠিক ২ টায় ভোট গ্রহণ শেষ করে ফেলি।

দুপুর ২.১৫ মিনিটঃ সকল প্রার্থীকে ডাকা হয় ভোট কেন্দ্রে ভিতরে। তাদের উপস্থিতিতেই ভোট গণনা শুরু করা হবে।
আমরা অপেক্ষা করছিলাম ভোট গণনার মেশিন আসার জন্য। এরই মধ্যে প্রার্থীসহ আমরা সবাই মিলে একসাথে দুপুরের খাবার খেলাম। মেশিন এলো ৩ টার দিকে। 
৩.১৫ টায় সবার উপস্থিতিতে ব্যালটবাক্সের মুখ খোলা হলো। তাদের সামনেই ব্যালটগুলো একে একে বের করা হলো বাক্স থেকে। আমরা ১০০ টা করে বান্ডিল করতে শুরু করলাম গণনার সুবিধার জন্য। মোট ভোট পড়েছে ৯৫৪ জনের। হল সংসদের টা আগে গণনা করা হবে। তাই হল সংসদের ব্যালট আমি, দেওয়ান, সাব্বির, জাভিদ ও ইশতিয়াক স্যার সাজানো শুরু করলাম।
অপরদিকে ডাকসুর ব্যালট গুলো বান্ডিল করছিল সাইদ, সুজন, আজাদ ভাই, মাহফুজ, মুইদ ও মাহিদুল।

৪.০ টাঃ মেশিনে হল সংসদের ৩৩ টি ব্যালট দেয়া হলো। মেশিনের ফলাফলের সাথে আমাদের ম্যানুয়াল ভোটের ফলাফল মেলানো হল। একেবারে শতভাগ মিলে গেল। এই ঘটনাটি পুরোপুরি সকল প্রার্থীদের উপস্থিতিতে করা হল। তারা সন্তোষ প্রকাশ করলো।

এরপর বাকি ৯২১টি ওএমআর ব্যালট স্ক্যান করা হল। রেজাল্ট প্রস্তুত হয়ে গেল। এবং সকল কিছুর অবসান ঘটিয়ে হল সংসদে ভিপিসহ ৬ টি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হলো। জিএস সহ ৭টি পদে ছাত্রলীগ প্যানেল বিজয়ী।

একইভাবে আমাদের কেন্দ্রের ডাকসুর ফলাফল তৈরি হয়ে গেল। ভোট গণনার সময়ই অর্থাৎ রাত ৬.৩০-৭.০ টার দিকে আমরা জানলাম ডাকসুর ভিপি পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে কোটা সংস্কারের নুরু এবং ছাত্রলীগের শোভনের মাঝে। নুরু আমাদের হলে বেশিই ভোট পেয়েছে। রাত ১০ টা পর্যন্ত হলে থেকে সবকিছু ফলাফল তৈরি করে আমরা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিলাম। রাতে জানা গেল নুরু নির্বাচিত হয়েছে।

এরপরেও শুনতে হয় ভোট সুষ্ঠু হয়নি। আমি একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে বলতে পারি আমার কেন্দ্রে ভোট একেবারেই নিখুঁত ও সুষ্ঠু হয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমাকে ক্লাশে শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়াতে হবে। তাই নিজের বিবেকের কাছে আমরা দায়বদ্ধ ছিলাম। আমরা কোন আপোষ করিনি নির্বাচনের মান নিয়ে। অনেকে ভোটকেন্দ্রে না এসে লন্ডন, আমেরিকা থেকে স্ট্যাটাস দিয়ে ফেসবুক গরম করে ফেলছে। কিন্তু আমরা যে কয়েকজন শিক্ষক উপস্থিত থেকে কাজ করেছি, তাদেরকে একবারো জিজ্ঞাসা করেনি তারা। সবচেয়ে কষ্ট লাগে আমাদেরই অনেক সহকর্মী আমাদের বিবেক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একটি হলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সকল শিক্ষককে একই পাল্লায় মাপছে। এর চেয়ে কষ্টের কিছু হতে পারে না।

আমাদের একুশে হলের প্রত্যেক শিক্ষকের সততা, বিবেক, আস্থার কোন মূল্যায়ন দিল না এই তথাকথিত ফেসবুক সমাজ কিংবা সাংবাদিক সমাজ। এরকম সমালোচনা করলে পরবর্তীতে কোন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী থাকতে পারবো কি আমরা? আপনারা কি তাই চান আমরা সরে দাড়াই?

অবশ্য কে কি বলল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি বুক ফুলে আগামিকাল ক্লাসে আমার শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়াবো, এটাই আমার সান্তনা।

লেখকঃ মোঃ আব্দুল মুহিত

সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মেসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

- Advertisement -