অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং চাপে চ্যাপ্টা হওয়া সাধারণ মানুষ

কয়েকদিন আগের কথা। ঢাকা থেকে গাজিপুরের দিকে যাচ্ছিলাম। জয়দেবপুর চৌরাস্তার কয়েক কিলোমিটার আগেই হঠাৎ করে চরম যানজটে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি- উল্টোদিকের রাস্তায় একদল মানুষের হাতে লাঠি এবং তাদের সবার চেহারায় আক্রমণাত্মক ভাব। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, তারা গার্মেন্টস কর্মী এবং দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমেছে তারা।

ভাবলাম, আজ বিপদ আছে। ঐ লাঠিশোটা নিয়ে রণমূর্তিতে এগিয়ে আসা লোকজন যখন আমাদের গাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো, তখন তারা হঠাৎ করে দেখলো কোন একটা বিল্ডিং এর উপর থেকে কারা যেন তাদের কর্মকান্ড ভিডিও করছে। এটা দেখার পর, ঐ ব্যক্তিকে ধরার জন্য পঙ্গপালের মতো ছুটতে শুরু করলো তারা। হঠাৎ আমাদের গাড়ির ছাদের উপর একটা শব্দ হলো। তারা আসলে উপর পা রেখে লাফিয়ে লাফিয়ে পার হচ্ছিলো।

কি ভয়ংকর অবস্থা চিন্তা করুন!

সেদিন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামা ঐ গার্মেন্টস কর্মীদের চেয়ে শক্তিশালী কেউ ছিল না। এদিকে যানজটে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকা দূরপাল্লার গাড়ির চালকদের খুব অসহায় লাগছিল। তাদের সাথে টুকটাক কথা বলি। সে কথাতে তাদের অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠলো। আর আমার অন্য কথা মনে হতে লাগলো।

কথাটা হলো- কয়েকদিন আগের এক আন্দোলনে এই পরিবহন শ্রমিকদের চেয়ে শক্তিশালী কেউ ছিল না। এমনকি তারাও যখন তখন ধর্মঘট ডেকে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে বেশ শক্তিশালী। সেই সময়গুলোতে কিন্তু আবার গার্মেন্টস শ্রমিকরা অসহায় হয়ে পড়ে। আর সব সময় যারা অসহায় এবং বিভিন্ন পক্ষের চাপে চ্যাপ্টা হয়, তারা হলো সাধারণ মানুষ যারা কখনো তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করে না।
বছর দুয়েক আগের কথা-

সপরিবারে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে গিয়েছি। হঠাৎ করেই শুরু হলো পরিবহন ধর্মঘট। কিন্তু আমাদের বের না হয়ে কোন উপায় ছিল না। আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। একটু পর পরই পরিবহন শ্রমিকদের চেকপোস্ট। গাড়ি দেখে তাদের সবারই রুদ্রমূর্তি। বাস, ট্রাকের হেল্পার বা অটোরিক্সা চালকরা এসে গাড়ি আটকে দিচ্ছে, ভাবে মনে হচ্ছে যে কোন সময় ভেঙ্গে দিতে পারে- এমনকি গায়েও হাত তুলতে পারে।
তার চেয়েও বড় বিড়ম্বনা শুরু হলো যখন তারা পরিচয়পত্র চেক করতে শুরু করলো। কোন উপায় নেই। ছোট ছোট বাচ্চারা এসে পরিচয়পত্র চেক করে। মনের মধ্যে প্রশ্ন এলো- আমার পরিচয়পত্রে কি লেখা আছে, সেটা কি তারা বুঝে?
কোটা আন্দোলন-

কোটার বাতিল বা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন এখনো স্মৃতির পর্যায়ে যায়নি। আমরা সাধারণ মানুষেরা অবশ্য সব যৌক্তিক আন্দোলনকেই সমর্থন দেই। কিন্তু এর বিপরীতে কিছু পাওয়া হয়ে ওঠে না। কোটার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন আমাদের সাধারণ মানুষদের ভোগান্তিও তুঙ্গে। এই যানজটের শহরে একটা রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে তো পাড়ায় পাড়ায় যৌক্তিক যানজট তৈরি হওয়া।
সে আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন হয়ে গেলো। সেটার রেশ এখনো কেটেছে কি না জানি না। কিন্তু এবার শুরু হয়েছে ‘কোটা চাই’ আন্দোলন। আবার শাহবাগ বন্ধ। ভোগান্তিটা কার?

আবার ঐ সাধারণ মানুষেরই। যারা আন্দোলন করে তারাও জানে মানুষের ভোগান্তি যখন চরমে পৌঁছায় কেবলমাত্র তখনই আন্দোলন সফল হয়। আজ আবার দেখলাম সড়ক দূর্ঘটনা প্রতিরোধে যে আইন হয়েছে তা সংশোধনের দাবিতে পণ্য পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। আন্দোলনের যেন উৎসব। শেষই হয় না।

সবশেষে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কথা বলি-

রাজধানী ঢাকায় রাস্তা দিয়ে কোন ভিআইপি বা ভিভিআইপি চলাচল করলে কি হয় তা আমরা সবাই জানি। আর অন্য কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি আসতে তো কোন কথাই নেই।

আমি একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই না। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর কোন অবকাশ যাপন কেন্দ্র নেই কেন? বিভিন্ন দেশেই তো দেখি- রাষ্ট্রীয় অতিথিরা যখন সেই দেশে যান তখন ঐ দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির অবকাশযাপন কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং বা কার্যক্রম চলে।
আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রীর অবশ্যই অবকাশ যাপন কেন্দ্র থাকা উচিত। কারণ আমরা ধীরে ধীরে উন্নত দেশ হচ্ছি। আমাদের একটা প্রেস্টিজের ব্যাপারও আছে। সেটা কক্সবাজার, সিলেট বা বান্দরবানে হতে পারে।

মুনজুরুল করিম: হেড অব ইনভেস্টিগেশন

ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন