এই শীতেই বিয়ের কথা ছিল রুম্পার

‘তোমরা আমার মেয়েটাকে কাটতে দিও না। আমি মামলাও করব না।’ একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে ঢাকা থেকে বারবার আসা মোবাইল ফোনগুলোর উত্তরে এ কথারই পুনরাবৃত্তি করছিলেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ডা. আখতার জাহান রুম্পার বাবা আখতারুজ্জামান। শোকে কাতর এই বৃদ্ধের চশমার নিচ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল কেবল অশ্রু। মেয়ে যে তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের লাশঘরে ময়নাতদন্তের অপেক্ষায়!

চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এ ব্লকের ‘মুক্তাঙ্গন’ নামের ছয়তলা বাড়িটির তৃতীয় তলায় শোকাতুর বাবাকে তখন সান্ত¦না দিতে এসেছিলেন আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা। রুম্পার মা নূরজাহান বেগমের কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই। মেয়ের মৃত্যুর খবর শোনার পর তিনি বাড়ির দোতলায় বিছানায় পড়ে আছেন। মাঝে মধ্যেই জ্ঞান হারাচ্ছেন।

রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আখতারুজ্জামানের দুই ছেলে এক মেয়ের মধ্যে ডা. রুম্পা (২৮) মেজো। আদরের মেয়েটিকে হারিয়ে শোকাহত বাবা কখনো চুপচাপ, কখনো আনমনে, আবার কখনো ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন চলমান অবস্থার ওপর। আখতারুজ্জামান বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ময়নাতদন্ত হচ্ছে, মামলা হচ্ছে। তাতে কী এমন হচ্ছে? আমরা মামলা চাই না। এই দেশে একজনকে জেল খাটিয়ে আমার কী লাভ? সব জায়গায় তো সমস্যা। রাস্তা পারাপারের সময় দুর্ঘটনায় পড়লে বলতামÑ আমার মেয়ের দোষ ছিল। কিন্তু আমার মেয়ে তো গাড়িতেই ছিল।’

আখতার জাহান রুম্পা চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজি থেকে বিএসসি ইন অপ্টোমেট্রি কোর্স শেষ করে চিকিৎসাপেশায় যোগ দেন। সর্বশেষ তিনি

সিলেটের ওসমানীনগরের বার্ডস আই হাসপাতালের কর্মরত ছিলেন। গতকাল সেখান থেকে রাজধানীর শ্যামলীর একটি চক্ষু হাসপাতালে চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে যাচ্ছিলেন।

রুম্পার মামাতো বোনের স্বামী সিরাজুল ইসলাম জানান, গত রবিবার চট্টগ্রাম থেকে সিলেট যান রুম্পা। এর পর সেখান থেকে সোমবার রাতে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। মধ্যরাতে ঢাকায় পৌঁছেই মাকে ফোন দিয়ে বলেনÑ সব ঠিক আছে। কিন্তু এর একটু পরই দুর্ঘটনায় পড়েন রুম্পা। পরে তার বাগ্দত্তা ডা. কাজী মোহাম্মদ মহসীনকে হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হয় দুর্ঘটনার কথা।

গত ৩ মে নগরীর আগ্রাবাদের একটি রেস্তোরাঁয় জমকালোভাবে চিকিৎসক কাজী মহসিন ফারুকের সঙ্গে রুম্পার এনগেজমেন্ট হয়। কথা ছিল ডিসেম্বরের শেষে বিয়ের পিঁড়িতে বসার। জাতীয় নির্বাচনের কারণে সময় পেছানো হয়। আগামী জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই অনুষ্ঠানের জন্য দুই পরিবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নতুন করে সাজানো হচ্ছিল রুম্পাদের ঘরও। এখন আনন্দের বদলে ঘরের প্রতিটি কোণেই বিষাদের ছায়া।

গতকাল মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকায় বাসের ধাক্কায় নিহত হন সিএনজি অটোরিকশার আরোহী চিকিৎসক রুম্পা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বিজয় সরণির মোড়ে বিপরীত দিক থেকে মহাখালীগামী গ্রিনলাইন পরিবহনের একটি বাস রুম্পার সিএনজিকে ধাক্কা দেয়। এ সময় সেটি রাস্তায় উল্টে পড়ে গেলে অটোরিকশাচালকসহ তিনি গুরুতর আহত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রম্পাকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ভোর সোয়া ৫টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন।

তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম জানান, ঢামেক হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার বিকালে ওই নারী চিকিৎসকের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। দুর্ঘটনাকবলিত সিএনজি অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনামতে ঘাতক বাসটি গ্রিনলাইন পরিবহনের। সেটিকেও আটকের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/কেএস