শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আর্থ-সামাজিক অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ

অন্যায়, অবিচার আর শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে আনবে বলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে বীর বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে নেমেছিল। বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিল একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের। ১৯৭৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে সদ্য স্বাধীন দেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত শোষক এবং শোষিত; আমি শোষিতের পক্ষে’। স্বাধীনতার পরপরই অকৃত্রিম দরদ দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের উন্নয়নে কাজ শুরু করেন বঙ্গবন্ধু।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট বঙ্গবন্ধুকে কেড়ে নিলেও সৃষ্টিকর্তা বুঝি ঠিক করে রেখেছিলেন তার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ করাবেন তারই কন্যার হাত দিয়ে। জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা এলেন সেই দুর্গম পথের আলোকবর্তিকা হয়ে। ইস্পাতকঠিন মনোবল, অদম্য সাহস আর দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা-সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুই যেন নতুনভাবে আবির্ভূত হলেন তার কন্যার মধ্যে। একুশ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুকন্যা হাত দিলেন সোনার বাংলা গঠনে। একটি দেশের উন্নয়নের প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। সারাদেশে সুষম উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়নে শেখ হাসিনা কাজ করলেন নিরলসভাবে।

২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করে দেশকে অবনতির রাস্তায় টেনে নিল। ক্ষমতালিপ্সু মনোভাব, ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল আর দলীয়করণের রাজনীতি চলার কারণে এই সময়ে দেশের কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। ২০০৮ সালে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে আবারো দুর্বার গতিতে দেশ গঠনের কাজ শুরু হলো। একটি দেশের জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে জীবনযাত্রার অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করণে ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। বিগত দশ বছরে ধারাবাহিকভাবে মোট দেশজ উৎপাদন বেড়েছে, বেড়েছে আমদানি ও রফতানির পরিমাণ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০০৬ সালে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার যা ২০১৮ সালে ১৭৫২ ডলারে পৌঁছেছে।২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.৬৫% যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ছিল ৫.০৪%। খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের ফলে বৈদেশিক বিনিয়োগের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ঝামেলাহীন বিনিয়োগে বিদেশীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সব সূচক বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি খুবই দৃশ্যমান। মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, সাক্ষরতার হার, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের গৃহীত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ প্রকল্প, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা প্রভৃতি প্রদানের ফলে দারিদ্র্যের হার কমে এসেছে বহুলাংশে। ২০০৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১.৫% যা বর্তমানে প্রায় ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। বছরের প্রথম দিনে ৩৫ কোটিরও বেশি বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে।

শেখ হাসিনার সরকার কর্তৃক অবকাঠামোগত উন্নয়নে গৃহীত ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের চেহারাই বদলে যাবে। উন্নয়নকে টেকসইকরণে পরিবেশের স্থিতিশীলতার কথাটি মাথায় রেখে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতের সুখী ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গঠনে হাতে নেয়া হয়েছে ডেল্টা প্ল্যান ২১০০। দেশের প্রতিটি সেক্টরে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়ায় আধুনিকতার পাশাপাশি দুর্নীতিকে কমিয়ে দিয়েছে। কর্মসংস্থানের নতুন নতুন খাত সৃষ্টি, সরকারি পর্যায়ে প্রচুর লোকবল নিয়োগ বেকারত্ব রোধে ভূমিকা রাখছে। জনসংখ্যার বোনাস সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দেশে এবং বিদেশে বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী নিয়োগ আর্থ-সামাজিক অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা এখন সারাবিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে রোলমডেল। বিশ্বব্যাংক প্রধানের উচ্চকণ্ঠে প্রশংসা আমাদের অগ্রগতির কথা সারাবিশ্বে জানান দিয়েছে।

বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নতির স্বীকৃতিস্বরূপ শেখ হাসিনার ঝুলিতে জমেছে অনেক আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পদক। পরপর দুই মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। বিএনপি- জামায়াতের চরম রাজনৈতিক সহিংসতা, আগুন সন্ত্রাস, ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে তার পিতার মতো আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ছিল সমালোচকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও হাস্যরসের খোরাক, সেই বাংলাদেশ আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে আপন যোগ্যতায় প্রস্ফুটিত হয়ে। আগামী ২০২১ সালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করার স্বপ্ন নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা কাজ করে চলেছেন অবিচল। পিতার হাত ধরে স্বাধীনতা এসেছে, কন্যার হাত ধরে স্বনির্ভরতা আসবে এ আমাদের বিশ্বাস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ উন্নতির স্বর্ণশিখরে উঠেছে দেশের সাধারণ জনগণের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর সুদক্ষ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে। সততা, ত্যাগ, দায়বদ্ধতা আর নিঃস্বার্থভাবে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করার জন্য শেখ হাসিনাই আমাদের সর্বোত্তম বিকল্প।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতায় আনতে কিছু দলত্যাগী, নামসর্বস্ব পার্টির নেতারা ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে জনগণকে ধোঁকা দেয়ার মিশনে নেমেছেন। এই ফ্রন্টের নেতৃত্বদানকারীদের অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে কঠিন হওয়ার কথা নয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সবকিছুই পানির মতো পরিষ্কার হওয়ায় সব মিথ্যাচার আর গুজবের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখছে এ দেশের ছাত্র ও যুবসমাজ। অতীতের মতো সব বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে প্রিয় নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ এ বিশ্বাস আমাদের সবার। সেদিন খুব বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাতারে নিজের নামটি লেখাবে। তাই, এই অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখে লাল-সবুজের পতাকাটি আরো ওপরে তুলে ধরতে তারুণ্যের ভোটটি হোক নৌকা মার্কায়।

রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন: সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ