‘বড় ছেলে’ এবং আমার টিউশনি

আনিস আলমগীর

দুই দফায় আমি ‘বড় ছেলে’ টিভি নাটকটি একবার দেখলাম। দেখলাম সোশ্যাল মিডিয়ায় লোকজনের হাউকাউ দেখে। বড় ছেলের জন্য সমবেদনা দেখে। তবে আমার অনুভুতি মনে হয় অন্যদের মতো নয়।

আমারতো মনে হল মধ্যবিত্ত সংসারের এই কাহিনীতে দর্শক ধরে রাখার বড় হুক হচ্ছে সুন্দরী নায়িকা, বড় ছেলে নয়। বড় ছেলের জন্য যারা কান্নাকাটি করেছেন তারা টিউশনি করেন এবং মনে মনে বড় লোকের এমন একটি সুন্দরী মেয়েকে বউ করার স্বপ্ন দেখেন। তারা কেঁদেছেন সে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায়।

এই নাটকে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে নায়িকার প্রথম সংলাপটি। ছেলেটি পড়াতে গিয়েছে। মেয়েটি ফোন করে প্রশ্ন করছে- নাস্তা দিয়েছে? কি নাস্তা?

যারা শখে টিউশনি করে তাদের বিষয়টা ভিন্ন। নাস্তা দিল কি না দিল কিছু আসে যায় না। তবে সংগ্রামী ঘরানার ছেলেদের জন্য নাস্তাটা একটা ইস্যু বটে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহপাঠি। হিন্দু ছেলে ছিল। পোশাক পরিচ্ছদ চলাফেরা সব দিক থেকে ওর গরীবানা ফুটে উঠতো। একদিন সে আমার কাছে টাকা চাইলো। দিলাম। বললো, তুমি কি জান আমি সারাদিন অপেক্ষায় থাকি টিউশনির নাস্তাটার জন্য। অনেক দিন ওটিই আমার একমাত্র খাবার। আমার প্রায় চোখে পানি আসার দশা। মধ্যবিত্তের সন্তান হলেও এমন পরিস্থিতি আমি মোকাবেলা করিনি।

সে কারণে হয়তো দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর কেউ আমার সঙ্গে দেখা করলে এখনও এই প্রশ্নটি করি, দুপুরে খেয়েছেন? আশ্চর্য! আমি অনেককে পেয়ে যাই– যে কোনও কারণে হোক, দুপুরে খেতে পারেনি। ওই একটি সময়ে আমি কাউকে খাইয়ে পরম তৃপ্তি পাই। হাতের কাছে কিচ্ছু পেলাম না- অন্তত ঘন দুধ চায়ের সঙ্গে এক প্যাকেট বিস্কুট খেতে দিতে পারি তাৎক্ষণিক। আমার তখন ওই বন্ধুটির কথা মনে হয়- যে সারা দিন না খেয়ে বিকেলে টিউশনির নাস্তার জন্য অপেক্ষা করতো।

ভালো কথা। এ জীবনে আমি আজও টিউশনি করার অভিজ্ঞতা অর্জণ করতে পারিনি। নিজেও চাইনি। কেউ অফারও করেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সময়টাতে ছাত্র ছাত্রীরা টিউশনি খুঁজে সে সময়টাতেই দৈনিক পত্রিকায় ভালো বেতনে রিপোর্টারের চাকরি পেয়ে যাওয়ায় হয়তো আমি এই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়েছি।
তবে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে পেয়েছি। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে রমজানে ছুটি পেয়েছিলাম। বাড়িতে বসে বসে করবো কী! আমার ছোট ভাই বোনকে পড়ানোর জন্য আমাদের বাসায় ছিলেন একজন লজিং মাস্টার। তিনি আমাদের পাশের ইউনিয়নের হাবিলদারবাসা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি আমাকে অফার করলেন রোজার মাসে তাদের স্কুলে পড়ানোর। ওইসময় স্কুল বন্ধ থাকলেও তারা পড়াচ্ছেন কোচিং এর নামে। যারা ক্লাস করবে তারা মোটামুটি একটা ভাল ফি দিবে। আমি চাইলে পড়াতে পারি।

ভাবলাম মন্দ কি! বসেইতো আছি। শুরু করলাম উনার সঙ্গে যাওয়া-আসা। নাইন টেন-এর ক্লাস নিতাম। ছাত্র-ছাত্রীরা নতুন স্যারকে পেয়ে এতো খুশি হল যে অল্প ক’দিনের মধ্যে অনেক অভিভাবক আমাকে ‘লজিং মাস্টার’ করার জন্য হেড স্যারকে ধরলেন। স্যার আমাকে অমুকের পোলা, তমুকের ভাই পরিচয় দেওয়ার পর তারা হতাশ হলেন!

একমাস পর বিদায় বেলায় শিক্ষার্থীদের জন্য আমার, আমার জন্য তাদের একটা বেদনা অনুভব হয়েছিল। আমার সে শিক্ষার্থীদের কাউকে আমি পরে চিনতে পারতাম না। তবে মাঝে মাঝে বাড়ি গিয়ে লোকাল বাসে উঠলে অনেকে আমাকে সিট ছেড়ে দিয়ে বলতো, স্যার বসেন। আজ আমি তাদের একজনকেও চিনি না। আহ কেন যে একটি ছবি তুলে রাখলাম না! জীবনে শিক্ষক হবো একবার চিন্তা না করলেও, সেই এক মাসের ‘শিক্ষকতা পেশার মাদকতা’ আমাকে পরে শিক্ষক বানিয়ে দিয়েছে কিনা কে জানে! ভালইতো এনজয় করছি এখনও দুই মাদকের আসক্তি– সাংবাদিকতা ও শিক্ষকতা। ডবল এডিকশন।

ও হ্যাঁ। প্রথম সম্মানী কত ছিল? বলেই দেই। প্রাপ্ত টাকা ভাগাভাগি হয়েছিল শিক্ষকদের মধ্যে। আমি নিতে আপত্তি করি। টোকেন মানি হিসেবে ১০০ টাকা রেখেছিলাম হেড স্যারের অনুরোধে। জীবনের প্রথম শিক্ষকতার কামাই।

(লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে সংগৃহীত)

বাংলাদেশ সময়: ১০৩৫ ঘণ্টা, ১২ সেপ্টেম্বর  ২০১৭

 

SHARE