দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে উদাহরণ এক বিচারক

মহিউদ্দিন মাহী

ছয় মাসে ৩০০ দেওয়ানি এবং ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন মেহেরপুরের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ তাজুল ইসলাম। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে একে দৃষ্টান্ত বলছেন আদালত সংশ্লিষ্টরা।

সারাদেশে ৩০ লাখেরও বেশি মামলা জট রয়েছে। বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ ও অর্থনেতিক ক্ষতি থেকে মুক্তি দিতে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে বিচারক তাজুলের উদ্যোগের প্রশংসা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মুখে।

আইন সচিব আবু সালেহ মো. জহিরুল হক বলেন, ‘দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি অবশ্যই ভালো দিক। একজন দক্ষ অফিসারের এটিই প্রধান বৈশিষ্ট্য।’ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নিম্ন আদালতের একজন বিচারকের মাসে ছয়টি করে দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি করতে হয়। আর ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে কোনো ধরা বাধা নিয়ম নেই।
কত মামলা নিষ্পত্তি

জেলা জজ আদালত সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুরে চলতি বছরের ২০ এপ্রিল যোগদান করেন তাজুল ইসলাম। তিনি জেলার যুগ্ম দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালত, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল চতুর্থ, অর্থঋণ আদালত, অতিরিক্ত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ ট্রাইব্যুনাল এবং যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আদালতে যোগদানের পর ফৌজদারি, দেওয়ানি, অর্পিত সম্পত্তি মোকাদ্দমাসহ এক হাজার তিনশর বেশি মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন তাজুল ইসলাম। দায়িত্ব নেয়ার সময় তার এখতিয়ারে বিচারাধীন সেশন মামলা ছিল- ২২৮টি, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল মামলা ছিল ২৫৫টি, সর্বমোট মামলা ছিল ৫৫৯টি, আর দেওয়ানিসহ অন্যান্য মামলা ছিল পাঁচশর বেশি।

দায়িত্ব পালনের ছয় মাসে সেশন ও স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল মামলা দুইশরও বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে। এরমধ্যে ৮০টি মামলা বেশ পুরানো। এই মামলাগুলো ২০০৪ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে হয়েছে। এগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

অস্ত্র মামলা ও ডাকাতি মামলাসহ আরও গুরুত্বপূ্র্ণ মামলা ২৫টির বেশি নতুন ও পুরনো মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এই ছয় মাসে ফৌজদারি মামলায় পুলিশ ও স্থানীয় প্রায় ৮০০ সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছেন বিচারক। দেওয়ানি মামলায়ও ২০০ এরও বেশি সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ১০০ ফৌজদারি মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

যেসব মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে মার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অস্ত্র মামলা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফাইল হয়েছে। এই মামলাটির নম্বর এসটিসি ১৭/১৭। এই মামলা রায় হয়েছে গত ২ নভেম্বর। এছাড়া আরও একটি অস্ত্র মামলা এপ্রিলে মাসে আদালতে এসেছে। এই মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে অভিযোগ গঠনের চারমাসের মধ্যে। এমন আরও অনেক মামলা চার/পাঁচ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সারা দেশে কোথাও স্টেনোগ্রাফার নেই। তা সত্ত্বেও মেহেরপুরের যুগ্ম জজ তাজুল ইসলাম নিজে টাইপ করে রায় লিখে ঘোষণা করছেন। রাত-অবধি তিনি বিচারিক কাজ করছেন।

নিজে উদ্যোগী হয়ে পুলিশের সহায়তায় মামলার সাক্ষীদের হাজির করে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিচ্ছেন। এসব কারণে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হচ্ছেন এই বিচারক।

যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর এই বিচারক ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা জজ আদালতের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের দায়িত্বে থাকাকালে ওই আদালতের ফৌজদারি ৪০০ মামলা এবং দেওয়ানি ২০০ মামলা নিষ্পত্তি করেছেন।

বিচারক তাজুল ইসলাম

জানতে চাইলে মেহেরপুরের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের এপিপি রুস্তুম আলী বলেন, ‘এই আদালতের বিচারক সবসময়ই চেষ্টা করেন দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে। তিনি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে বেশ গুরুত্ব দেন। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি বিচার কাজ করেন। অনেক সময় দেন। অফিসের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও তিনি কাজ করেন। ফলে আমাদের জেলা জজ আদালতে সবচেয়ে বেশি মামলা নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হচ্ছেন তিনি।’

মেহেরপুর জেলা জজ আদালতের পিপি পল্লব ভটাচার্য বলেন, ‘আমাদের আদালতে সাক্ষীর উপস্থিতির হার ভালো। সাক্ষী গ্রহণ হয় ভালো। বিশেষ করে আমাদের বিচারকরা বেশ আন্তরিক। তারাও চেষ্টা করছেন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে। বিশেষ করে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ তাজুল ইসলাম অত্যন্ত দক্ষ একজন বিচারক। তিনি অনেক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করছেন। তিনি যে হারে মামলা নিষ্পত্তি করেছেন তাকে রেকর্ড বলা যায়।’

বিচারক যা বলছেন

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেরপুরের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমার আদালতে সাক্ষী এলে ফেরত যায় না। আদালতের সময় শেষ হলেও সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে তাকে বিদায় দিই।’

পুরাতন মামলার সাক্ষীদের আদালতে এনে সাক্ষ্য প্রদান করতে নিজে পিপি অফিসের মাধ্যমে ওই সংশ্লিষ্ট মামলার সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযাগ করে সাক্ষী আনার ব্যবস্থা করেন তিনি।

দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এই বিচারক বলেন, ‘প্রত্যেক মামলার ধার্য তারিখ ওপেন এজলাসে ঘোষণা করি। রায় লেখাসহ প্রত্যেক দিনের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করার চেষ্টা করি।’

‘প্রত্যেকটি মামলার নথি পুঙ্খনাপুঙ্খভাবে দেখে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করি। এরপর এডিআর বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করি। নতুন মামলা দায়ের হওয়ার পর পক্ষগণের ‍ওপর নোটিশ জারি হওয়ার জন্য জোর তাগিদ দিই।’

এছাড়া ফৌজদারি মামলার সাক্ষী হাজির করানোর জন্য সমন যথাযথ স্থানে পৌঁছেছে কি না তা প্রতিনিয়ত তদারকি করেন এই বিচারক। তিনি বলেন, ‘আমি রাত নয়টা পর্যন্ত অফিস করি। অনেক সময়ই বাসায় বসেও আদালতের কাজ করি। এ কারণে বেশি মামলার রায় দেয়া সম্ভব হচ্ছে।’

বিচারক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমেই অনেক মামলা নিষ্পত্তি করা যায়। সেটির ওপরই আমি বেশি জোর দিচ্ছি।’

সাবেক আইনমন্ত্রীর প্রশংসা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘আমি আইনমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তির জন্য এডিআর বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বিধান চালু করে দিয়েছি। সেটি হতে পারে দেশের মামলা জট নিরসনের সবচেয়ে প্রকৃষ্ট দিক। এটি ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রেও সম্ভব। আমি দেখেছি কানাডা ৯৫ শতাংশ মামলা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। মেহেরপুরের ‍যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ যেটা করে সফলতা দেখিয়েছেন। আমি এটি দেশের সব নিম্ন আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করছি। আমি মনে করি এটা অপশনাল না থেকে বাধ্যতামূলক করা উচিত।’

আদালতের বিভিন্ন ভোগান্তির দিক তুলে ধরে শফিক আহমেদ বলেন, ‘অনেক বিচারক আছেন, বৃহস্পতিবার আধাবেলা অফিস করে ঢাকায় আসেন। আবার রবিবার যেতে যেতে অর্ধেক সময় চলে যায়। একারণে এখন ৩০ লাখেরও বেশি মামলার জট তৈরি হয়েছে। তবে মেহেরপুরের যুগ্ম জেলা জজ মামলা নিষ্পত্তির যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সেটি আমাদের বিচারকেরদের অনুরসণ করা উচিত। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী স ম রেজাউল করিম বলেন, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সময়ের দাবি। সারা দেশের বিচারকরা যদি সচেষ্ট হন তাহলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব, যেটা মেহেরপুরের যুগ্ম জেলা জজ করে দেখাচ্ছেন। এটি অবশ্যই বিচার বিভাগের জন্য ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’সূত্র- ঢাকাটাইমস।

বাংলাদেশ সময়: ১২৫৫ ঘণ্টা, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৭

SHARE