বিশুদ্ধ খাদ্যই এখন সবচেয়ে বড় মৌলিক চাহিদা

দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম রিটেইল চেইন হিসেবে সম্প্রতি গ্লোবাল গ্যাপের সদস্যপদ লাভ করেছে ‘স্বপ্ন’। স্টোরে বিক্রি হওয়া মাছ-মাংসের নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করায় এর আগে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সার্টিফিকেশন সংস্থা আলকিউমাসের কাছ থেকেও এইচএসিসিপি সনদ পায় দেশের সবচেয়ে বড় রিটেইল চেইনটি। সম্প্রতি এসব নিয়ে কথা বলেছেন এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেড তথা স্বপ্নর নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির। বুয়েটে প্রকৌশল বিদ্যা পড়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে রিটেইলিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে পোস্টগ্র্যাজুয়েট সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন তিনি। সম্প্রতি এমআইটি থেকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ওপর পেয়েছেন আরেকটি সনদ। দেশে কাজ করেছেন বাটা সু, টেট্রাপ্যাক, অটবির মতো প্রতিষ্ঠানে। ২০১২ সালে স্বপ্নর দায়িত্ব নেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহফুজ উল্লাহ বাবু

সম্প্রতি আপনারা গ্লোবাল গ্যাপের সদস্যপদ পেয়েছেন। বিস্তারিত জানাবেন?

গ্লোবাল গ্যাপ একটি আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন সংস্থা। তারা বিশ্বজুড়ে নিরাপদ কৃষিপণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণনে উৎসাহিত করে। ওয়ালমার্ট, হোলফুড, টেসকো, আলডির মতো রিটেইল চেইনগুলো তাদের সদস্য। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম রিটেইল চেইন হিসেবে ‘স্বপ্ন’ তাদের নির্দেশিত মানদণ্ড অনুসরণ শুরু করে। এক মাস আগে গ্লোবাল গ্যাপের সিইওর কাছ থেকে আমরা সনদটি গ্রহণ করি।

গ্লোবাল গ্যাপ কৃষি উৎপাদনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নিশ্চয়তা চায়। প্রথমত. চাষাবাদে মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে না, দ্বিতীয়ত. কীটনাশকের ব্যবহার মাত্রা ছাড়াচ্ছে না। তৃতীয়ত. নির্দিষ্ট পিএইচআই (প্রি হারভেস্টিং ইন্টারভেল) মানা হচ্ছে। পিএইচআইয়ের বিষয়টি অনেকটা এ রকম— ধরুন, একটি বাগানে বা ক্ষেতে সর্বশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হলো ১০ তারিখে। বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলেন, ৭-১০ দিন অপেক্ষা করলে সে শাকসবজি বা ফলে রাসায়নিকের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসে। অর্থাৎ ২০ তারিখের আগে সেখান থেকে হারভেস্ট করা যাবে না। গ্লোবাল গ্যাপ তার অনুসারীদের এমন খুঁটিনাটি সব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয় এবং তা মানা হচ্ছে কিনা সেগুলো পর্যালোচনা করে।

স্বপ্ন গ্লোবাল গ্যাপের সঙ্গে যৌথ কর্মসূচির আওতায় দেশে এখন পর্যন্ত ৭৮ জন চাষীকে এ পদ্ধতির নিরাপদ চাষাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। এর মধ্যে ২৫ জন কৃষক এরই মধ্যে স্বপ্নর আউটলেটগুলোয় তাদের কৃষিপণ্য সরবরাহ শুরু করেছেন। নিরাপদ এ কৃষিপণ্যগুলোর জন্য আমরা নতুন ব্র্যান্ড ‘শুদ্ধ’ চালু করেছি। সব কমপ্লায়েন্স মেনে উৎপাদন করতে গ্লোবাল গ্যাপ সার্টিফায়েড কৃষকদের খরচ অন্যদের চেয়ে কিছুটা বেশি হয়। আমাদের সচেতন ক্রেতারা সানন্দে সেটি পরিশোধ করছেন।

এইচএসিসিপি সার্টিফিকেশন সম্পর্কে জানাবেন?

নিশ্চয়ই। এ বিষয়গুলোয় জনসচেতনতা বাড়ানো খুবই দরকার। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আরেকটি আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন সংস্থা আলকিউমাস। তারা খাদ্যপণ্যের বাইরেও অনেক কিছুর নিরাপত্তা মানদণ্ড নিয়ে কাজ করে। আমাদের বিভিন্ন স্টোরে বিক্রি হওয়া তাজা খাদ্যপণ্যের উৎস, সরবরাহ ব্যবস্থা, কোটা-বাছা, সংরক্ষণ ইত্যাদি প্রতিটি স্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা একটি স্বীকৃতি দিয়েছে, যার অর্থ আমাদের মাছ-মাংস এইচএসিসিপি মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের কাছ থেকে শিখে আমাদের নির্দিষ্ট টিম প্রতিদিন সব স্টোরে সংশ্লিষ্ট সব কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে।

এত বড় দেশে, এত বড় বাজারে মাত্র ২৫ জন কৃষকের সম্পৃক্ততা?

ঠিকই বলেছেন, ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে হাতেগোনা কিছু মানুষ হয়তো নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যপণ্য ভোগের সুযোগ পাচ্ছে। বাকিরা, আমরা প্রায় সবাই প্রতিদিন অনেক অনিরাপদ খাবারের সঙ্গে একটু একটু করে বিষ গ্রহণ করছি। ক্যান্সারের মতো বিভিন্ন মরণব্যাধির বিস্তার বাড়ছে।

এ থেকে বাঁচার দুটি উপায় রয়েছে— প্রথমত. সনাতন পদ্ধতির অর্গানিক ফার্মিং, যেটি আবার সবার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যোৎপাদনে সক্ষম নয়। দ্বিতীয়টি হলো আধুনিক কৃষি। তবে স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার শর্তগুলো পরিপালন করে। একটি ব্যাপক জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের রিটেইল চেইন হিসেবে আমরা দ্বিতীয়টিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের স্টোরগুলো থেকে প্রতিদিন অন্তত ৩৫ হাজার পরিবারের নিত্য কেনাকাটা হয়।

আমরা জানি, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। এখন অবস্থা এমন হয়ে গেছে, আমাদের শুধু ‘খাদ্য’ বললে চলছে না। খাদ্য গ্রহণ অনেক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখন আমাদের বলা উচিত, বিশুদ্ধ খাদ্যই মানুষের সবচেয়ে বড় মৌলিক চাহিদা। ন্যায্যমূল্যে দেশের সব মানুষের মুখে বিশুদ্ধ খাবার তুলে দিতে হবে। দেখুন, আমাদের পরিবারের শিশুরা আজ যা খাচ্ছে, সেটিই তার আগামীর হেলথ প্রোফাইল গড়ে দিচ্ছে।

এটা ঠিক যে, এত মানুষের দেশে গ্লোবাল গ্যাপ প্রকল্পে মাত্র ২৫ জন কমপ্লায়েন্ট কৃষক কোনো সংখ্যাই নয়। তবে আশার কথা হচ্ছে, এটি একটি শুভ সূচনা। ‘শুদ্ধ’ ব্র্যান্ডের জন্য আমরা দেশজুড়ে অন্তত এক হাজার গ্লোবাল গ্যাপ কমপ্লায়েন্ট কৃষকের সঙ্গে অংশীদারিত্বে যাচ্ছি। তাহলে অন্তত আমাদের সব স্টোরে নিরাপদ কৃষিপণ্যগুলো পাঠানো যাবে। আশা করতেই পারি, এরপর একসময় হাজার থেকে লাখ হবে, লাখ থেকে মিলিয়ন হবে। দেশের অন্য বিপণনকারীরাও কমপ্লায়েন্ট কৃষি আর কৃষকদের খোঁজ করবেন।

গ্লোবাল গ্যাপের সিইওর সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাতে আমরা তাকে একটি প্রস্তাব দিয়েছি, যাতে তারা আমাদের দেশে কয়েকশ গ্লোবাল গ্যাপ সার্টিফায়েড ট্রেইনার তৈরি করে দেয়। আমাদের পাইলট প্রকল্পের কৃষকদের প্রশিক্ষণে বিদেশী ট্রেইনার আনতে হয়েছিল। স্থানীয় প্রশিক্ষকরা সারা দেশের আনাচে-কানাচে কৃষকদের মধ্যে কাজ করলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাবে। উদ্যোগটি স্বপ্নর নেয়া হলেও এর সুফল প্রত্যেকেই পাবে। যে কৃষকরা গ্লোবাল গ্যাপ সার্টিফায়েড ফার্মিং করবেন, তারা বিশ্বের যেকোনো গ্লোবাল গ্যাপ মেম্বার রিটেইল স্টোরে সরাসরি রফতানি করার যোগ্য বিবেচিত হবেন।

সাধারণ কৃষিপণ্য আর শুদ্ধ ব্র্যান্ডের পণ্যের দামের তফাত কেমন?

দামের কিছুটা পার্থক্য থাকবেই। নন কমপ্লায়েন্ট কৃষকের কাছ থেকে আসা সাধারণ যে পটোলগুলোর জন্য আপনি ৪০ টাকা দাম দিচ্ছেন, সেটি ‘শুদ্ধ’ হলে তার জন্য আর ১০ টাকা বেশি দেবেন না?

এটুকু বলতে পারি, স্টোরে আমরা শুদ্ধ কৃষিপণ্যের জন্য যে দামটুকু বেশি রাখছি, সেটি নেহাতই খরচের পার্থক্য। নিছক ব্র্যান্ডিং করে এখান থেকে অস্বাভাবিক মুনাফার কোনো পরিকল্পনা আমরা করিনি। আমাদের যে ক্রেতারা স্বপ্নর আউটলেটগুলোয় শুদ্ধ ব্র্যান্ডের পণ্য খোঁজেন, তারাও এমনটি বিশ্বাস করছেন বলেই আমার ধারণা।

আপনাদের স্টোরে ‘স্বপ্ন’ ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পণ্য দেখছি আমরা। এগুলো সম্পর্কে জানাবেন?

প্রাইভেট লেভেল ব্র্যান্ডিং নামে আমাদের একটি বিভাগ নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্যগুলো ডেভেলপ করছে। মানই তাদের মূল এজেন্ডা। পাশাপাশি দামটা সবার নাগালে রাখারও একটি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে তারা। তাদের সাপোর্ট দেয়ার জন্য আমরা টিমে বিশেষজ্ঞ পুষ্টিবিদ, রসায়নবিদদের নিয়োগ দিচ্ছি।

‘স্বপ্ন’ ব্র্যান্ডের আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত পণ্য চালু হয়েছে। এর মধ্যে বেকারি ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, মসলাদি, কিচেন কেয়ার ও বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য অন্যতম। এক-দেড় বছরের মধ্যে আশা করছি স্বপ্ন ব্র্যান্ডের দুই শতাধিক পণ্য স্টোরগুলোয় পাওয়া যাবে।

বেকারি পণ্যগুলো পরখ করলেই আপনারা মানের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ পাবেন। পাউরুটি বা বিস্কুটগুলো খালি পেটে খেলেও কোনো অস্বস্তিকর ঢেকুর আসবে না, পেটে গ্যাস হবে না। কারণ এগুলোয় সেরা মানের উপাদান ব্যবহার করা হয়। বিস্কুটে আমরা ভেজিটেবল অয়েল না দিয়ে মাখন ব্যবহার করি। এ কারণে দামটা একটু বেশি পড়ছে। তবে বাড়িতে আমাদের শিশুরাও নিরাপদে এগুলো খাচ্ছে।

আপনারা কি নিজেরা পণ্যগুলো উৎপাদন করছেন? না অন্যদের কাছ থেকে কিনছেন?

আমরা পরীক্ষিত থার্ড পার্টি দিয়ে কন্ট্রাক্ট প্রডাকশন করছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কঠোর স্পেসিফিকেশন, স্ট্যান্ডার্ড ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল নিশ্চিত করা হচ্ছে।

আমাদের কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে এরই মধ্যে একাধিক কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। আমাদের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী তারা বিশ্বমানের কারখানা করেছেন। মনিটরিংয়ের জন্য আমাদের টিম মেম্বারদের কাউকে না কাউকে আপনি সবসময়ই সেখানে পাবেন।

এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের ফিন্যান্সিয়াল আপডেট কী?

৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৮ হিসাব বছরে স্বপ্নর বিক্রি ৩ শতাংশ বেড়ে ৯১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে কস্ট অব গুডস সোল্ড ২ শতাংশ কমে বিক্রির ৭৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে মোট মুনাফা (গ্রস প্রফিট+অন্যান্য আয়) ২৪ শতাংশ বেড়ে ২০৪ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গ্রস প্রফিট মার্জিন এখন ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। পরিচালন মুনাফা করা সম্ভব হয়নি। তবে পরিচালন ব্যয় বিক্রির ২৬ দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছি আমরা। সব মিলিয়ে পরিচালন লোকসান আগের বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কমে ৩৭ কোটির ঘরে নেমে এসেছে, যা বিক্রির ৪ দশমিক ১ শতাংশ মাত্র। গেল হিসাব বছরে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ফিন্যান্সিয়াল কস্ট; এক বছরের ব্যবধানে যেটি ২৮ শতাংশ বেড়ে ৯২ কোটি টাকায় উঠে গেছে।

আমি আত্মবিশ্বাসী, খরচ নিয়ন্ত্রণ আর গ্রস মার্জিন বাড়িয়ে স্বপ্ন পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে দ্রুতই পরিচালন মুনাফার স্থায়ী ধারায় চলে আসবে। এরপর শুধু ফিন্যান্সিয়াল কস্টটুকু অ্যাড্রেস করলেই চলবে। আমি মনে করি, ফিন্যান্সিয়াল রিস্ট্রাকচারিংই এর সবচেয়ে ভালো উপায়।

ফিন্যান্সিয়াল রিস্ট্রাকচারিং নিয়ে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা হয়েছে কি? হলে সেটি শেয়ার করবেন?

সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে মূল কোম্পানির পর্ষদ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছে। বিভিন্ন বিদেশী গ্রুপ স্বপ্নর অংশীদার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় একটি রিটেইল জায়ান্টের সঙ্গে যোগযোগ তাত্পর্যপূর্ণ। আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করার মতো কোনো কংক্রিট আপডেট এখনো আমার হাতে আসেনি। সূত্র-বণিক বার্তা।

বাংলাদেশ সময়ঃ ১৬৫০ ঘণ্টা, ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/পিএস