১ বলে ২ রান, সালমা-জাহানারা দুজন দুজনকে যা বলেছিলেন

ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের মেয়েরা। নামের পাশে তখন পর্যন্ত ছিল না বড় কোনো অর্জন। লক্ষ্য ১ বলে ২ রান। এ লক্ষ্য ছুঁলেই অমরত্বের কীর্তি গড়বেন জাহানারা আলম ও সালমা খাতুন।

মালয়েশিয়ায় মুহূর্তেই ইতিহাসের পাতায় আটকে গেলেন এই দুই টাইগ্রেস। ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে এশিয়ার সেরা বাংলাদেশের মেয়েরা। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মাত্র ৬৩ রানে অল আউট হওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল যাঁদের এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি অভিযান,তারাই শেষ পর্যন্ত জিতেছে শিরোপা। টানা পাঁচ জয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সালমারা যেন ছাড়িয়ে গেছেন কল্পনার সব সীমানাই। প্রচণ্ড স্নায়ুচাপ সামলে ফাইনালে ভারতকে হারানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে মনোবল। কোথায় পেলেন সেই মনোবল এবং শেষ বলের আগে কি কথা হয়েছিল জাহানারা-সালমার? উত্তর দিয়েছেন দুই টাইগ্রেস।

শুরুতেই জাহানারা আলম,‘আপানারা জানেন, ২০১৪ সালের ইনচন এশিয়ান গেমসে ৪২ বলে ৪৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে শেষ ওভারে উইকেটের পর উইকেট পড়ে যাচ্ছিল। আমাদের সেদিনের কথা হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল। তখন ভাবলাম, এই বলেই (শেষ বলে) আমাকে কিছু করতে হবে। আমাকে আজকে ফিনিশ করতেই হবে, তা যেভাবেই হোক। কারণ, এরচেয়ে বড় সুযোগ আমি আর পাব না।’

‘রুমানা আউট হয়ে যাওয়ার পর নবম ব্যক্তি এলো। ও আমাকে জানাতে এসেছিল যে, বলটা ব্যাটে লাগাতে হবে। আমি ওকে এক রকম জোর করে পাঠিয়ে দিলাম যে, আমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি জানি কি করতে হবে। আমাকে এই সময়ে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।’

‘এরপর আমি যেটা করি, হারমানপ্রিতের বোলিং পরিকল্পনাটা নষ্ট করে দেই। ও একটা পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল, আমাকে কি করে বিট করবে। ওর পরিকল্পনা নষ্ট করে আমি আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছি। আমার লক্ষ্য ছিল, যদি বল একটু ঝুলিয়ে দেয় আমি স্ট্রেইটে খেলব, তাতে দুই বা বাউন্ডারি, ওভার বাউন্ডারি যাই আসে, আসবে। আরেকটা পরিকল্পনা ছিল, বল অনুযায়ী খেলে দৌড়ে দুই রান নেওয়ার চেষ্টা করব।’

‘সালমা আপুকে আমি সেভাবেই বললাম, ‘সালমা আপু আপনি শুধু দৌড়াবেন’। উনি আমাকে একই কথা বললেন, ‘আগে ব্যাটে বলটা লাগা’। আমি উনাকে বললাম, ‘আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু দৌড়াবেন’। পরে যা হল তা তো আপনারা সবাই দেখেছেন।’

‘আমরা প্রথম যখন ভারতকে হারাই সেটা ছিল আমাদের মেয়েদের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জন। ১৪১ রান তাড়া করে আমরা ওদের হারাই। আমরা যখন ফাইনালে ওদের বিপক্ষে খেলি আমাদের একটা আত্মবিশ্বাস ছিল। আরেকটা ব্যাপার ছিল, ওদের বিপক্ষে আমাদের হারানোর কিছু ছিল না। সম্পূর্ণটাই আমাদের জন্য বোনাস। ওরা ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন, ওদের হারানোর অনেক কিছু ছিল। ওদের মতো দলকে হারিয়ে আমরা বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, এর মধ্য দিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে আমরা নিজেদের চিনিয়েছি। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এটা বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য অনেক বড় অর্জন।’

পাশে থাকা অধিনায়ক সালমা খাতুন যোগ দেন একটু পরই। খুলে দেন কথার ঝাঁপি,
‘প্রথম ম্যাচটায় আমরা শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যাই। টুর্নামেন্টের বেশি দিন আগে আমরা সেখানে যাইনি, কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু সময় লেগেছে। সেই ম্যাচ হারলেও আমরা আত্মবিশ্বাস হারাইনি। আমি আমাদের সব খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলেছি যে, কোনোভাবেই আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না। এখনও অনেক ম্যাচ আছে, আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারি। আমরা কিন্তু তা প্রমাণ করেও দেখিয়েছি। আমরা যে কিছু করতে পারব, এই আত্মবিশ্বাস আমাদের সবার মাঝেই ছিল।’

‘পাকিস্তানের বিপক্ষের ম্যাচটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেটা যদি হেরে যেতাম আমাদের সব আশাই শেষ হয়ে যেত। সেই ম্যাচের আগে আমাদের সবার মধ্যে কিছু করে দেখানোর আত্মবিশ্বাস ছিল।’

‘ওর (জাহানারা) সঙ্গে কথা হয়েছিল, ব্যাটে-বলে হলেই যেভাবেই হোক আমরা দুই রান নিব। আউট হই আর যাই হোক। সবচেয়ে বড় কথা বলে-ব্যাটে করতে হবে। তা হলেই দুই রান নিব, আর আমরা তা নিতে পেরেছি।’

‘জেতার পর ড্রেসিং রুমে সবাই অনেক মজা করেছি। নেচে-গেয়ে জয় উদযাপন করেছি। সবাই অনেক উল্লাস করেছি। সেই সময়টা এখন বলে বোঝানো যাবে না।’

‘তামিম ভাইদের ভিডিওটা আমাদের সবার খুব ভালো লেগেছে। এক বলে ২ রান দরকার উনারা সবাই খুব উৎকণ্ঠায় ছিলেন। তারা দুই রান, দুই রান করে চিৎকার করছিলেন, সেটাই হল। আফসোস হল এটা আমরা দেখার আগেই পুরো বিশ্ব দেখে ফেলেছে। আমরা পরে দেখে অনেক মজা পেয়েছি। আমাদের জয়ে ভাইয়েরা কতটা রোমাঞ্চিত ছিল। আমরা যে তাদের এই রোমাঞ্চটা দিতে পেরেছি এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।’

বাংলাদেশ সময়: ১৪৫০ ঘণ্টা, ১২ জুন, ২০১৮
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/কেএনবি