Home জাতীয় ভয়াবহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের জীবন

ভয়াবহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের জীবন

- Advertisement -

মোহাম্মদ ওমর ফারুক

দেশে চার থেকে দশ বছর বয়সের উপজাতি শিশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। এদের মধ্যে বড় একটি অংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে না বা ভর্তি হলেও ঝরে পড়ছে। এর একটি অন্যতম কারণ হলো তাদের নিজস্ব ভাষায় পড়ালেখা করার সুযোগ না থাকা। শুধু তাই নয় এসব শিশুরা অহরহর হচ্ছে পাচার,হচ্ছে নির্যাতন এবং ধর্ষনের মতো ঘটনা। কিন্তু এসব দেখেও যেন দেখার কেউ নেই। এমন একটি গোষ্ঠীর শিশুর জীবন প্রায় বিপন্ন কেউ নেয় না কোনো খোজ।

- Advertisement -

পাচার হচ্ছে শিশু:

উন্নত জীবন ও আধুনিক শিক্ষার ব্যাপারে তাদের প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব শিশুকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমনকি শিশুদের ধর্মান্তরিত করার অভিযোগও করেছেন কোনও কোনও অভিভাবক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু বান্দরবান থেকে গত সাত বছরে এমন প্রলোভনের শিকার হওয়া অন্তত্য ৭২টি শিশুকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ২০১০ সালের ১৩ জানুয়ারি জেলা শহরের অতিথি বোর্ডিং থেকে বৌদ্ধ অনুসারী ৩৩ আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। এসময় বান্দরবানের গর্ডেন ত্রিপুরা ওরফে রুবেল, ঢাকার দারুল এহসান মাদ্রাসার ছাত্র আবু হোরাইয়া এবং শ্যামলী এলাকার আবদুল গণিকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা শিশুদের বাড়ি জেলার থানচি উপজেলার বলিপাড়া এলাকায়। তাদের ঢাকার ধানমন্ডি আদর্শ মদিনা স্কুলে ভর্র্তির কথা বলে নিয়ে আসা হচ্ছিল।

যদিও এই নামে কোনও স্কুলের অস্তিত্ব নেই বলেই জানা গেছে। ওই বছরেরই ১ ফেব্রুয়ারি শহরের হাবিব আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে আরও ১৬ শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় পাচার কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে মোহন ত্রিপুরা নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। এসব শিশুকে শহরের হাফেজঘোনার বাংলাদেশ ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাপ্টিস্ট চার্চে ভর্তি করার কথা বলে নিয়ে আসা হচ্ছিল যদিও ওই নামে ওই এলাকায় কোনও প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই ছিল না। এর পর ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি পুলিশ ও র্যালব বৌদ্ধ ধর্মানুসারী ২১ নৃগোষ্ঠী শিশুকে ঢাকার সবুজবাগের আবুজর গিফারি মাদ্রাসা ও মসজিদ কমপ্লেক্স এবং দাওয়া বাংলাদেশ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ধার করে। পরে তাদের অভিভাবকের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।

২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ছয় ত্রিপুরা শিশুকে উদ্ধার করে। এসব শিশু জানায়, তাদের সঙ্গে আরও ১৩টি শিশুকে পাচারকারীরা নিয়ে এসেছিল। তবে ওরা কৌশলে চট্টগ্রামেই বাস থেকে নেমে পালিয়ে গেছে। এসময় বিনয় ত্রিপুরা নামে এক পাচারকারীকে আটক করে পুলিশ। ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে বান্দরবন জেলাশহর থেকে চারটি শিশু উদ্ধার কওে পুলিশ। যদিও পাচারকারীকে ধরতে পারেনি পুলিশ।এমনটা ধারাবাহিকভাবে চলছেই।

মানবাধিকার কমিশন বান্দরবান সদর উপজেলা শাখার সভাপতি অং চ মং বলেন, হেডম্যান কারবারিদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচার চালাতে হবে, অভিবাবকরা সচেতন হলে আদিবাসী শিশু পাচার ও ধর্মান্তকরণ কমে আসবে।

শিক্ষা পায় না তারা:

প্রায় সব নৃ-গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা। কারো নিজস্ব বর্ণমালা আছে। অনেকের নিজস্ব বর্ণমালা হারিয়ে গেছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সকল ভাষায় লিপি নেই, সাহিত্য নেই, লেখা নেই। তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো সুযোগও ছিল না। ফলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা বাংলাভাষায় শিক্ষা নিতে বাধ্য হতো। কিন্তু স্কুলে আসার পর প্রথমে তারা বাংলাভাষা বুঝতে পারে না। পরিবারের সদস্যদের কাছে মাতৃভাষায় কথা শেখে শিশুরা। তাদের জন্য স্কুলে গিয়ে বাংলা বর্ণমালায় পাঠ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার উচ্চারণও বিকৃতি হয়ে যায়। তাই সরকার পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের সিদ্ধান্ত নেয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ওঁরাও, গারো জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য তাদের মাতৃভাষায় প্রস্তুত করা হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই ও শিক্ষা-উপকরণ (ফ্লিপ-চার্ট, ফ্লাশ-কার্ড, স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের চার্ট ইত্যাদি)।

শিক্ষকদের জন্য পাঠদান নির্দেশিকাও তৈরি করা হচ্ছে। চাকমা ও মারমা ভাষার বইগুলো তাদের নিজস্ব লিপিতে লেখা। বাকি তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বইয়ের কোনোটি বাংলা লিপিতে কোনোটি রোমান হরফে। চাকমা ভাষা ও বর্ণমালা আছে। কিন্তু এই বর্ণমালা দিয়ে চাকমা ভাষা লেখা হয় না। চাকমা ভাষা বিষয়ে প্রাতষ্ঠানিক শিক্ষারও সুযোগ নেই। যে কারণে চাকমা ভাষা সম্পর্কে অনেক চাকমারই যথাযথ ধারণা নেই। কাজেই চাকমা ভাষা বাংলায় লিখতে গিয়ে অনেক ভুল হয় এবং অনেক শব্দ বিকৃতভাবে প্রকাশ পায়।

সরকারি উদ্যোগের কারণে চাকমারা মাতৃভাষায় লেখাপড়ার মাধ্যমে নিজেদের ভাষা শিখবে। উপজাতিদের মধ্যে ত্রিপুরার সংখ্যা অনেক কম। প্রায় ২ লাখ ত্রিপুরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ফলে ত্রিপুরারা মাতৃভাষায় শেখার সুযোগ পায় না। যতটুকু সুযোগ আছে তা ব্যক্তি উদ্যোগে। ত্রিপুরা ভাষা রক্ষার জন্য ত্রিপুরাদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান বহুদিনের দাবি। শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষা সঠিক উচ্চারণের মাধ্যমে শিক্ষা না দিলে আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ঠিকভাবে পাঠদান করা হচ্ছে কি না এজন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা উচিত। এ ছাড়া সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য উপযোগিতা যাচাই করে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা তৈরিরও পরামর্শ আছে তাদের। ২০১৭ শুধু প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় বই দেওয়া হয়েছে। এবছর প্রথম শ্রেণি ও এর পরের বছর দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বইও মাতৃভাষায় ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে এইসব ভাষায় পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষকও নেই।

নির্যাতনে শিকার:

২০১৫ সালে এক গবেষনায় দেখা গেছে সেই বছর সারাদেশে ৮৫ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী ও কন্যাশিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৪ জন পার্বত্য চট্টগ্রামের এবং ৪১ জন সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী ও শিশু। ২০০৭ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মোট ৪৩৪ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী ও কন্যাশিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে ২৬ টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণ, ৩ টি হত্যা, ১১ টি শারীরিক লাঞ্ছনা, ১৬ টি ধর্ষণের চেষ্টা, ৫টি অপহরণ, ৬ টি শারীরিক ও যৌন হয়রানি এবং ২টি পাচারের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালে সংঘটিত মোট ৬৯টি ঘটনার মধ্যে ৩৮টি পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং বাকিগুলো সমতলে সংগঠিত হয়েছে। এবং এমন ঘটনা গুলো সবচেয়ে বেশী ঘটছে নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের সাথে।

স্বাস্থ্য সেবা অবহেলিত:

তারা নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন নৃ-গোষ্ঠী পরিবার। এখানে নারী ও শিশু শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে। তারা নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এলাকায় সরকারের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও গণসচেতনতা কার্যক্রম নেই বললেই চলে। পরিবার ও সমাজে স্বাস্থ্য সচেতনতা না থাকায় বয়ঃসন্ধিকালে কিশোরী, বাল্যবধূ, নববিবাহিতা, গর্ভবতী, দুধপ্রদানকারী মায়েরা রক্তস্বল্পতাসহ নানান জটিল ও কঠিন মেয়েলি রোগে ভোগেন। এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা নিয়মিত ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, যক্ষ্মা, ক্যান্সার, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, রক্তশূন্যতা, মাতৃত্বকালীন জটিলতা, প্রসবকালীন সমস্যা, নবজাতকের মৃত্যু, কৃমিরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারীরা সন্তান জন্ম দেয়া, লালন-পালন করা ও ঘর-গৃহস্থালির যাবতীয় কাজ এক হাতেই সামলাতে হয় তাকে। অথচ সে নিজেই বেশীর ভাগ সময় থাকে কিশোরী।তাদের নেই প্রজনন ও মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা। এটি নারী জীবনের খুবই স্পর্শকাতর সময়। নৃ-গোষ্ঠী নারীর অবস্থান এখানে প্রান্তিক। আর তাই তার অবস্থান বড় বেশি নাজুক। স্বাস্থ্য অধিকার থেকে বঞ্চনার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে নৃ-গোষ্ঠী নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার ব্যাপকতা, প্রজনন সমস্যা, শিশু মৃত্যুর হার রীতিমতো অস্বাভাবিক। উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকির পাশাপাশি রোগ-বালাই, অসুখ-বিসুখ বৃদ্ধির প্রবণতা কিন্ত অনেক বেশি দৃশ্যমান। পরিবারে ও সমাজে উপেক্ষিত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এ নারী বিভিন্ন রোগ-ব্যাধির সহজ শিকার। আর তাছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাতের নাগালে চিকিৎসা সেবা নেই। তাই রোগ শোক নিয়েই এ জনপদের মানুষের জীবন কাটাতে হয়। বড় ধরনের কোন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে যেতে হয়।

এই বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রান্তিকতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আজ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সার্বিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে যে কথাগুলো বলা হয়েছে, সেগুলো অবশ্যই রাষ্ট্রকে ইতিবাচকভাবে শুনতে হবে এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ দেশের আপামর জনসাধারণের মানবাধিকার রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা নারী পুরুষ যে কেউ যেখানেই থাকি, যেভাবেই থাকি যে মতের থাকি, যে দলেরই থাকি, আমরা যদি নিরাপদ থাকি তাহলে বুঝব, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে না হলে নয়। বিশেষ নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদেও খুবই বাজে অবস্থা।ওই দিকে সরকারের নজর দেয়া উচিৎ। দেশের অন্যান্য শিশুদেও মতো রাষ্টের সকল সুবিধা ভোগ করার পূর্ন অধিকার তাদের আছে।

নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব বলেন,আমরা নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিয়ে অনেক কাজ করে যাচ্ছি। গত বছর উপযোগী বই তাদের হাতে তুলে দিয়েছি। তাছাড়া তাদের সার্বিক উন্নয়নে আমাদের মন্ত্রনালয় কাজ করে যাচ্ছে।

- Advertisement -