যে পরাজয় গৌরবের

আবারও তীরে এসে তরী ডুবলো। আবারও স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নীল হলো বাংলাদেশ। সব হচ্ছে, শুধু শিরোপাটাই অধরা থেকে যাচ্ছে। এ নিয়ে ৬টি টুর্নামেন্টের ফাইনালে গিয়ে পুড়তে হলো স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়। তীরে এসে তরী ডোবাটা ঠিক আছে। কিন্তু এই টুর্নামেন্টের সঙ্গে স্বপ্নভঙ্গের বেদনার কথাটা ঠিক যায় না। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, এশিয়া কাপের শুরুতে কেউ কি স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলাদেশ ফাইনালে খেলবে? তাই বাংলাদেশের অর্জন অন্তত আমার স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। একটা সময় ছিল আমরা সম্মানজনক পরাজয়ের জন্য খেলতাম। সেদিন অনেক আগেই ইতিহাস হয়ে গেছে। প্রতিপক্ষ যেই হোক, এখন আমরা সব ম্যাচ জেতার জন্য খেলি। তবুও এশিয়া কাপের ফাইনালে আমাদের ছেলেরা যা করেছে, তা আমাদের গর্বিত করে। এমন পরাজয়ে যে কেউ গর্ব করবে। তীরে এসে তরী ডুবেছে। কিন্তু সে জন্য উজান ঢেলে তরীকে তীর পর্যন্ত আনতে তো হয়েছে।

উজান ঢেলে কেন? কারণ বাংলাদেশের ঘোষিত প্রতিপক্ষ ভারত হলেও আসলে বাংলাদেশকে লড়তে হয়েছে ইনজুরি, ফিটনেস, গরম, ভেন্যু, শ্রান্তি, আইসিসি, এসিসি, থার্ড আম্পায়ারের বিরুদ্ধেও।

আপনারা বলতে পারেন ভেন্যু, গরম, শ্রান্তি এগুলো তো অজুহাত; ভারতেরও নিশ্চয়ই এই সমস্যা হয়নি। না হয়নি, হলেও কম হয়েছে। টুর্নামেন্টের ফিকশ্চারটা একটু দেখে আসুন, তাহলেই বুঝবেন আমাদের আসল লড়াইটা কোথায়। গ্রুপ, সুপার ফোর ও ফাইনাল মিলে ভারত ৬টি ম্যাচ খেলেছে। ৬টিই দুবাইয়ে। ভাববেন না এটা কাকতালীয়। ভারতীয় দলের আবদারেই এটা করা হয়েছে।

গ্রুপের ম্যাচ দুটি দুবাইতেই হবে এটা ভারত নিশ্চিত করতে পেরেছিল আগেই। দুবাই পৌছে তারা জানিয়ে দিল, তারা দুবাইয়ের বাইরে যাবে না। তাদের আবদার মেটাতে গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ হওয়ার আগেই সুপার ফোরের ফিকশ্চার চূড়ান্ত হয়ে যায়। চূড়ান্ত মানে ভারতের ম্যাচগুলো সব দুবাইয়ে রেখে বাকি দলগুলোর নাম বসানো হয়েছে। আর ভারতের এই অন্যায় আবদার মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশকে ৩টি ম্যাচ খেলতে হয়েছে আবুধাবিতে। পার্থক্যটা ধরতে পারছেন? দুবাই আর আবুধাবীর দূরত্ব দেড় থেকে দুই ঘণ্টার ড্রাইভ। এই তীব্র গরমে খেলার দিন প্রায় চার ঘণ্টা রাস্তায় থাকলে যে কোনো মানুষের জীবনীশক্তি ফুরিয়ে যায়। বিশেষ করে প্রতিবার খেলা শেষে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে রুমে ফিরতে হয়েছে গভীর রাতে।

ফাইনালের আগে দুই দলের ম্যাচ দেখুন। ভারত ২৫ তারিখে আফগানিস্তানের বিপক্ষে অপ্রয়োজনীয় ম্যাচে টাই করে হাওয়া লাগিয়ে দুবাইয়ে ঘুরে বেরাচ্ছিল। আর বাংলাদেশকে ২৬ তারিখ আবুধাবিতে শক্তিশালী পাকিস্তানের বিপক্ষে অঘোষিত সেমিফাইনালে জীবন মরণ লড়াই করতে হয়েছে। সেখান থেকে দুবাইয়ের হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত চারটা। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একদিন পরেই ফাইনাল খেলতে নামতে হয়েছে ফুরফুরে, তরতাজা ভারতের বিপক্ষে। সবাই তো মানুষ, রোবট নয়। এটা কেমন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হলো?

বলছিলাম প্রতিপক্ষ আইসিসি, এসিসির কথা। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে হারাতে ভারতের অন্তত দুবার আম্পায়ারের সাহায্য লেগেছিল। ভারত বড় দেশ। ক্রিকেট বাণিজ্যের ঘরবসতি সেখানে, তাই নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতেই। ভারত যা বলে, যেভাবে বলে; তাই শুনতে হয় আয়োজকদের। আসলে এত নাটক না করে আইসিসি বা এসিসি ভারতকে আগাম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেই পারে।

এবারও ফাইনালে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি হলো। ওপেনার লিটন দাস দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করে বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছিলেন বড় সংগ্রহের দিকে। তাকে কোনোভাবে ঠেকাতে না পেরে থার্ড আম্পায়ার রড টাকারের কাছে হাত পাতলো ভারত। আর ভারত কিছু চাইলে না করার সাধ্য ক্রিকেট বিশ্বে কারো নেই। স্ট্যাম্পিংএর আবেদনটি অনেকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলেন, জুম করে দেখলেন থার্ড আম্পায়ার। তার মানে তার ডাউট ছিল। আর ডাউট থাকলে বেনিফিট ব্যাটসম্যান পাবে, এটা ক্রিকেটের আদি কথা। আমার ধারণা রড টাকার চক্ষুলজ্জার কারণে এতবার দেখেছেন। আউট দিতে হবে, এটা পূর্ব নির্ধারিত। লিটন দাসের আউটের পর ক্রিকেটে আর বেনিফিট অব ডাউট বলে কোনো টার্ম রাখা উচিত নয়। এখন থেকে বলতে হবে, কোনো ডাউট থাকলে বেনিফিট সবসময় ভারত পাবে।

যদিও ভারতের ব্যাটসম্যান সঞ্জয় মাঞ্জরেকারও মনে করেন এই বেনিফিটটা লিটনেরই পাওয়া উচিত ছিল। সেখানেই তো খেলা শেষ। লিটন থাকলে রান ২৬০/২৭০ হতে পারতো। তাহলে আর ভারত দৌড়ে পারতো না। অবশ্য লিটন আর মিরাজের প্রায় ৬ গড়ে ১২০ রানের ওপেনিং পার্টনারশিপ দেখে তো ৩০০ রানও অসম্ভব মনে হচ্ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ করতে পেরেছিল মাত্র ২২২। কিন্তু এই স্বল্প পুজি নিয়ে শেষ বল পর্যন্ত লড়তে পারে শুধু বীরেরাই। সেই বীর বাঙালির প্রতি নতমস্তক কুর্নিশ আর হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা।

অবশ্য এই ২২২এ আটকে যাওয়ার দায় পুরোটা রড টাকারের ওপর দিলে অন্যায় হবে। আমাদের ব্যাটসম্যানদেরও নিতে হবে। যেদিন আমাদের টপ অর্ডার কলাপ্স করে, সেদিন মিডল অর্ডার বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু ওপেনিং ভালো হলে মিডল অর্ডারকে ব্লু হোয়েল গেমসে মাততে হবে কেন? সন্দেহ নেই এবারের টুর্নামেন্টের বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিক। রিয়াদও সবসময় নির্ভরতার প্রতীক। মুশফিককে খেলার মাঝপথে নেমেই ছক্কা মারতে যেতে হবে। এটাকে আত্মহত্যা ছাড়া আর কী বলা যায়? আর রিয়াদ সবসময় ভায়রা ভাইকে অনুসরণ করেন। এই দুজনের ছক্কা মারার চেষ্টা আগেও আমাদের হতাশায় পুড়িয়েছে। এটা ঠিক দুজনের ছক্কা হলে বাংলাদেশ ঠিকই ৩০০এর বন্দরে নোঙ্গর করতো। তবে মুশফিক আউট হয়েছেন ২৭তম ওভারে, আর রিয়াদ ৩৩তম। ছক্কা মারার জন্য প্রচুর সময় ছিল হাতে। তবুও সব ম্যাচ তো আর মুশফিক-রিয়াদ জেতাবেন না।

২২২ ডিফেন্ড করার মত বোলিং শক্তি বাংলাদেশের ছিল না। তবুও যে শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করেছে, সেটা যে কাউকে গর্বিত করবে। এমন পরাজয়ে চোখে পানি আসে, কিন্তু মন খারাপ হয় না। মাশরাফি বলেছেন, তারা হৃদয় দিয়ে খেলেছেন। তাতেই এশিয়া কাপ জিততে পারেনি তো কী হয়েছে, মাশরাফিরা কোটি মানুষের হৃদয় জিতে নিয়েছে।

ফাইনালে পরাজয়কেও এত মহিমমান্বিত করছি কেউ কেউ অবাক হতে পারেন। তবে যারা শুরু থেকে এশিয়া কাপ ফলো করছেন, তারা আশা করি একটুও অবাক হবেন না। এবার বাংলাদেশ এশিয়া কাপে গিয়েছিল দুর্ভাগ্যকে সঙ্গী করে। আনফিট সাকিবকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেকটা জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আরব আমিরাতে। দেশের কথা ভেবে তিনি গিয়েছিলেনও। কিন্তু তার ফল ভালো হয়নি। বাংলাদেশ অধিনায়ক যখন পাকিস্তানের বিপক্ষে মহা গুরুত্বপূর্ণ অঘোষিত সেমিফাইনালে টস করতে নেমেছিলেন, সাকিব তখন দেশে ফেরার বিমান ধরতে ছুটছেন।

সাকিবের নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা ছিল আঙ্গুলের অপারেশনের জন্য। কিন্তু অবস্থা এতটাই থারাপ ছিল, তাকে ঢাকার অ্যাপোলোতেই ভর্তি হতে হয়। ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে যখন শুনি আরেকটু দেরি হলেই সাকিবের মহামূল্যবান হাতটাই ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারতো। সাকিব কিন্তু যেতে চাননি। অতীত আচরণের কারণে হয়তো সাকিবের কথা বোর্ড বিশ্বাস করেনি বা সাকিব অভিমান থেকে তাদের ভুল ভাঙ্গাতে চাননি।

এশিয়া কাপ অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ টুর্নামেন্ট। কিন্তু তারচেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সাকিবের সুস্থতা। ব্যথা নিয়ে খেলতে নামায় তার আঙ্গুলের বা হাতের বড় কোনো ক্ষতি হতে পারতো। সোনার ডিম পাড়া হাসটাকে যেন লোভে পড়ে জবাই করে না ফেলি। প্রথম ম্যাচের শুরুতেই আঙ্গুলে ব্যথা পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তামিমকে। শেষে নেমে এক হাতে এক বল ঠেকিয়ে ঢুকে গেছেন ক্রিকেট রূপকথায়।

তামিমের বীরত্বগাঁথাকে জয়ে পরিণত করেন মুশফিক। দলকে অপ্রতিরোধ্য মনোবল দিয়ে তামিমকেও ফিরে আসতে হয় দেশে। প্রথম ম্যাচের নায়ক মুশফিক খেলতে নেমেছিলেন পেইনকিলার খেয়ে। পাকিস্তানের বিপক্ষেও জয়ের নায়ক সেই মুশফিক। তবে সেদিনও তিনি পুরো ফিট ছিলেন না।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ফিল্ডিং করতে গিয়ে আঙ্গুলে ব্যথা পেয়েছেন সবার অনুপ্রেরণা মাশরাফি। আফগানিস্তানের বিপক্ষে শেষ ওভারের নায়ক মুস্তাফিজও পুরো ওভার বল করার মত ফিট ছিলেন না। এতগুলো প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেই বাংলাদেশকে ফাইনালে যেতে হয়েছে। ফাইনাল খেলতে হয়েছে তিনজন ম্যাচ উইনার ছাড়া। তামিম তো আছেনই, সাকিব মানেই তো সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা বোলার। আর এই তিনজনের অভাব আমরা ফিল করেছি হাড়ে হাড়ে।

সাকিব না থাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে হয়েছে ৪ জন বোলার নিয়ে। ফাইনালে নাটকীয় শেষ ওভার করতে হয়েছে পার্টটাইম বোলার রিয়াদকে।

আমার আফসোস আরো কম। কারণ প্রথম ম্যাচে তামিম যে বীরত্বগাঁথা রচনা করে গেছেন, তাতে তখনই বলেছিলাম, এই টুর্নামেন্ট থেকে আমার আর কিছু চাইবার নেই। আমি সেদিনই এশিয়া কাপ জয়ের আনন্দ পেয়েছি। তামিম যেন সুকান্তের কবিতা মাঠে অনুবাদ করেছেন- ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়।’।

ফাইনালের আগের দিন ঠিক এই কথাটাই বলেছেন মাশরাফি, ‘তামিম যখন ভাঙা আঙুল নিয়ে মাঠে নেমেছে, তখনই আমি এশিয়া কাপ জিতে গেছি।’ একদম একমত। এ কারণেই আমার দুঃখ নেই। এমন একটি ভাঙাচোরা দল নিয়ে মাশরাফি যে শেষ বল পর্যন্ত লড়েছেন, এটা কেবল মাশরাফি বলেই সম্ভব।

সাকিব-তামিম ছাড়াই ভারতের নাকের পানি, চোখের পানি এক করে ফেলতে পারা অবশ্যই গৌরবের। তার মানে আমাদের সামর্থ্যের সীমা আরো অনেকদূর। এশিয়া কাপ থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন প্রস্তুত হতে হবে বিশ্বকাপের জন্য। আরো বড় অর্জনের হাতছানি সামনে। সর্বকালের অন্যতম সেরা অধিনায়ক মাশরাফির হাতে একটা ট্রফি না থাকলে সেটা ক্রিকেটের প্রতিই অবিচার হবে।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।