দুই বান্ধবীর উদ্দেশে নুসরাতের আবেগঘন চিঠি

গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টার শিকার নুসরাত জাহান রাফির লেখা একটি চিঠি জব্দ করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার তার পড়ার টেবিল থেকে আবগঘন ওই চিঠিটি জব্দ করা হয়। পুলিশ বলছে, এটি তারা আলামত হিসাবে সংগ্রহে রেখেছেন। চিঠিতে দিন তারিখ উল্লেখ না থাকলেও নিজ মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার কাছে যৌন হয়রানীর শিকার হওয়ার পর যে তিনি চিঠিটি লিখেছেন সে বিষয়টি স্পষ্ট। এমনকি অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই শিক্ষক গ্রেপ্তার হলে তার পক্ষে সহপাঠিদের কর্মসূচি পালন তাকে মর্মাহত করেছে। চিঠিতে সেই বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেছেন।

এই চিঠি থেকে জানা গেছে, এই ঘটনার কারণে তিনি একবার আত্মহত্যাও করতে গিয়েছিলেন।  তামান্না ও সাথী নামে দু’জন সহপাঠিকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠিতে তিনি তাদের বোন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আবেগঘন ওই চিঠিতে তিনি নিপীড়নকারী শিক্ষকের শাস্তি দিতে প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন।

চিঠিটি নিচে দেওয়া হলো-

‘তামান্না, সাথী। তোরা আমার বোনের মতো এবং বোনই। ওই দিন তামান্না আমায় বলেছিল, আমি নাকি নাটক করতেছি। তোর সামনেই বলল। আরো কি কি বলল, আর তুই নাকি নিশাতকে বলেছিস আমরা খারাপ মেয়ে। বোন প্রেম করলে কি সে খারাপ? তোরা সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে সব জানার পরও কিভাবে তার মুক্তি চাইতেছিস। তোরা জানিস না, ওই দিন রুমে কি হইছে? উনি আমার কোন জায়গায়…. এবং আরও কোন জায়গায়… চেষ্টা করেছে, উনি আমায় বলতেছে- নুসরাত ডং করিস না। তুই প্রেম করিস না। ছেলেদের সঙ্গে প্রেম করতে ভালো লাগে। ওরা তোরে কি দিতে পারবে? আমি তোকে পরীক্ষার সময় প্রশ্ন দেবো। আমি শুধু আমার শরীর দিতাম ওরে। বোন এই জবাবে উত্তর দিলাম। আমি একটা ছেলে না হাজারটা ছেলে…। আমি লড়ব শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে। সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করব না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরব না, আমি বাঁচব। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নেবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো। ইনশা আল্লাহ।’

প্রসঙ্গত, গত শনিবার (৬ এপ্রিল) সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে সকাল ৯টার দিকে ওই ছাত্রী যায়, আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে। পরে তাকে কৌশলে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ৪ থেকে ৫ জন বোরকা পরিহিত ব্যক্তি ওই ছাত্রীর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে তার স্বজনরা প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখান থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দগ্ধ শিক্ষার্থীকে সিঙ্গাপুর নেয়ার কথা থাকলেও, এখনই তা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।

ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের পরামর্শে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় ওই ছাত্রীর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে।