শুভ জন্মদিন ‘দ্য পোয়েট অব ইনডিপেনডেন্ট’

আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ৯০তম জন্মদিন আজ। ১৯২৯ সালের ২৩শে অক্টোবর পুরানো ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন বাংলা কবিতার এ প্রাণপুরুষ।

শামসুর রাহমান একাধারে আধুনিক ও রোমান্টিক কবি। এর বাইরে তিনি স্বদেশের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ সত্তা। মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িকতা তাঁর কবিতায় পেয়েছে নতুন ভাষা। কবিতায় মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, প্রেম, দ্রোহ, বিশ্বজনীনতার কথা বলে গেছেন তিনি। পঞ্চাশ দশক থেকে বাঙালি জাতির নানা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক জীবনের অসঙ্গতি, ব্রিটিশ ও পশ্চিমাদের শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। এজন্য তাঁকে স্বাধীনতার কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

স্বদেশ, নগর আর মানুষের সঙ্গে গভীর প্রেম ও আত্মিকতায় বাঁধা এ কবির কবিতায় হাতেখড়ি হয় শৈশবেই। তাঁর কবিতা ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক একই সঙ্গে গীতিময় ও মহাকাব্যিক। বাংলা কবিতায় আধুনিকতা, ব্যক্তির নি:সঙ্গতা, বিবমিশা ও আনন্দলহরীর অনিন্দ্য এক রূপকার কবি শামসুর রাহমান।

কবিদের মধ্যে কোন তারতম্য বা ভেদ করতেন না শামসুর রাহমান। তাকে নিয়ে ভক্তদের অতিরিক্ত ভাব বন্দনাকে তিনি পরিস্থিতির নিরিখে দেখতে চাইতেন। একবার তাকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি বলা হলে, তিনি বলেছিলেন- ‘এগুলো বোগাস জিনিস। যে শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ সুন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন, সেই শতাব্দীতে আমি কী করে বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ গুরুত্ব পাই?’

নিরহংকারী এই কবি সবার কবিতা পড়তেই পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশের কবিদের একটি সমস্যা হলো তারা ঘরে থাকতে চাইলেও, ঘরে থাকতে পারেন না। চারপাশের ডাকে তাদের সাড়া দিতে হয়। আর বাইরে গেলে লোকে তাকে বাইরের কবি হিসেবেই ধরে নেয়।‘

দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় ১৯৯৬ সালে তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়।

১৯৫৭ সালে ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজের সহসম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে পুরো এক দশক তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

শামসুর রাহমান বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে নানা ছন্দনাম নিয়েছেন তিনি। যেমন-সিন্দাবাদ, চক্ষুস্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে, মৈনাক।

কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান ‘দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। ৬০টির বেশি কাব্যগ্রন্থ ও শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা শামসুর রাহমান কবিতার পাশাপাশি বেশকিছু অনুবাদের কাজও করেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ নানা সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন তিনি। এছাড়া সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য পেয়েছেন জাপানের মিৎসুবিশি পুরস্কার।

দেশের বাইরে ১৯৯৪ সালে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা তাকে আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত করে। ওই বছর তাঁকে সাম্মানিক ডি লিট উপাধিতে ভুষিত করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯৬ সালে সাম্মানিক ডি লিট উপাধি দেয় কলকাতার রবীন্দ্রভারতী।

মৃত্যু সম্পর্কে নিজের ভাবনা বলতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ‘মৃত্যুর যে চিন্তাটা, মৃত্যুর যে ভাবনাটা-‘আমি থাকবোনা’ এই বিষয়টি তো আছেই, আমি যাদের ভালোবাসছি তাদের সঙ্গে আমার আর কোনদিন দেখা হবে না। এটি আমাকে খুব ব্যকুল করে তোলে।‘

তিনি বলেছিলেন, অ্যারিস্টটলের মতো, প্লেটোর মতো, শেক্সপীয়রের মতো, দান্তের মতো, সফোক্লিসের মতো, টলষ্টয়ের মতো, দস্তভস্কির মতো, বোদলেয়ারের মতো-এইসব লোক মরে গেলো। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। কলোশিয়াল ওয়েষ্টেজ মনে হয় না? কোটি কোটি কোটি কোটি লোক! আমার জন্মের আগে হাজার হাজার বছর চলে গেছে, আমার মৃত্যুর পরেও হয়তো হাজার হাজার বছর যাবে এটা ভাবলেই..আর একদিন হিমালয় গুড়িয়ে যাবে, একদিন পৃথিবীর কিছুই থাকবে না। গ্যালাক্সি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। আমরা তো কেউ থাকছি না, আমরা কেউ থাকছি না। যতক্ষণ জীবিত আছি ততক্ষণ হরিবল থট।

২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট মারা যান স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান। শুভ জন্মদিন ‘দ্য পোয়েট অব ইনডিপেনডেন্ট।‘

লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/কেএস