Home অপরাধ যেভাবে যৌনপেশায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী

যেভাবে যৌনপেশায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী

- Advertisement -

মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে সুমি। রাজধানীর মিরপুরে তার বেড়ে ওঠা। পড়ছেন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। এরই মধ্যে তিনি জড়িয়েছেন যৌনপেশায় বা কলগার্ল সার্ভিসে।

সময় টিভির একটি অনুষ্ঠান ‘সময়ের অসঙ্গতি’তে খোলামেলা কথা বলেছেন সুমি। জানিয়েছেন কীভাবে তিনি এই পেশায় এসেছেন।

- Advertisement -

সুমি জানান, এইসএসসি পাশের পর যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই তারা বাবার ছোট ব্যবসা চরম লোকসানে পড়ে। সহযোগীর প্রতারণায় ২৫ লাখ টাকা পুঁজি হারান। সে সময় খারাপ সময় শুরু হয় পুরো পরিবারের। এরপর থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াতে সুমিকেই পুরো পরিবারের হাল ধরতে হয়। এরই একপর্যায়ে প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েন। এর পর শুরু হয় এক নতুন জীবন।

সুমি জানান, তার বাবার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তাদের খুব দুর্দশা শুরু হয়। ঋণ বাড়তে থাকে। অনেক দিন বাসায় খাবার থাকত না। শুরু সুমি টিউশনি করে চলার চেষ্টা করেন। এর পর তিনি বিডিজবসের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে চাকরির চেষ্টা চেষ্টা করেন। এর মধ্যে এক জায়গা থেকে তিনি ডাক পান। গুলশান ১ নম্বরে তাদের অফিসে যান সুমি। পরে তাকে ইন্টাভিউয়ের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় হোটেল রেডিসনে।

সুমি বলেন, ‘আমি প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না, এটা কি কোনো অফিস, নাকি… নরমালি সোফাটোফা ছিল…। তো আমি বসলাম। অনেক্ষণ পরে একটা লোক আসলো অফিসার টাইপের। আমি তখনো কিছু বুঝতে পারছিলাম না। কারণ তখনও আমার মাথায় ঘুরছিল, জবটা আমার দরকার। জবটা কনফার্ম করতে হবে। আমার জবটা পেতে হবে। আমার পেট চলবে হবে, পড়াশুনা করতে হবে।’

‘আমি ভাবছি যে ইন্টারভিউ হয়তো এভাবে নেয়, এটা ওদের সিস্টেম। আমি অতকিছু বুঝতে পারিনি। এর পর উনি আসল। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম, যে লোকটাকে অফিসার বলা হলো, ওইলোকটা আমাকে যে নিযে আসলে অফিসার লোকটাকে কিছু টাকা ধরায় দিচ্ছে। আমার তখন মনে একটু খটকা লাগলো। আমাকে কেন উনার টাকা ধরায় দিচ্ছে?’, বলেন সুমি।

ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘তিনি বললেন, যদি বেঁচে থাকতে চাও, তাহলে তোমার এই কাজটা করা দরকার। আমি একটু ভয়ও পেলাম, এরকম সিচুয়েশনে তো কখনো পড়ি নাই। আর আমি একা ছিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে কী হবে। তিনি আমার কাছে আসলেন, প্রথম যিনি আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন তিনি। আমি তার দিকে তাকায় ছিলাম। তাকে প্রশ্ন করলাম, আমার ইন্টারভিউ কি হবে? তখন উনার হাতের টাকা আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘‘বুঝতে পেরেছে তো তুমি?’’ আমি বললাম, আমি কী বুঝতে পারব? আপনি বলেছিলেন এখানে স্পা করানো হবে, মেয়েদের বা বিউটি পারলারে একটা কাজ দেওয়া হবে। কিন্তু এখন তো আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’

সুমি জানান সে সময় ওই লোক বললেন, ‘বাকিটা তোমার দায়িত্ব’’। আমি বললাম, বাকিটা আমার কাজ? আমি তো বুঝতে পারলাম না কিছু। তিনি বললেন যে, এখন আর কিছু বুঝতে হবে না, যা হবার তা হয়ে গেছে।’

সুমি বলেন, ‘আমি কী করব তখন? আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমি কি এখানে বসে থাকব, নাকি চলে যাব, নাকি চিৎকার করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এরপর তিনি বললেন যে, “কাজটা তোমাকে করতে হবে, ওনাকে সময় দিতে হবে।” এতটুকু বয়স আমার হয়েছে যে কাউকে সময় দেওয়ার মানে কী তা বোঝার। তখন আমি বললাম যে, আমার পক্ষে এটা কখনোই সম্ভব না। আমি এটা পারব না।’

সময়ের অসঙ্গতি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘তিনি বললেন, তুমি যদি জবটা করতে চাও, তোমার যদি টাকার দরকার হয়, যদি পেট চালাইতে চাও, যদি বেঁচে থাকতে চাও, তাহলে তোমার এই কাজটা করা দরকার। আর আমার সমস্যাটা ওনাকে বলেছিলাম ইন্টাভিউয়ের সময়। আমার পরিবারের কী অবস্থা, সেই সুযোগটাই উনি নিয়েছেন। আর ওরা আমাকে হুমকিও দিয়েছিল, আমি যদি এটা না করি তাহলে আমার কাগজপত্রও (ইন্টাভিউয়ের জন্য জমা নেওয়া সনদ) ফেরত পাব না। এটা বলে তিনি চলে গেলেন।’

সুমি বলেন, ‘তখন আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। চুপচাপ বসে ছিলাম অনেকক্ষণ। আমি ভাবলাম, আমার পড়াশুনা করা দরকার; আমি ভাবলাম যে আমার ছোট ভাই আছে, বোন আছে, আমার বাবা মা আছে, আমার তখন মনে হলো আমার পরিবারের গার্ডিয়ান আমি। আমি যদি ওদেরকে একটা হাত বাড়াই, আমি যদি ওদেরকে হেল্প করি, তাহলে মনে হয় ওরা ভালো থাকবে।’

‘এর পর ওইলোক আসলো। তিনি বললেন, “এখান থেকে বের হওয়া যাবে না।” আমি ওনাকে রিকোয়েস্ট করলাম, আমি ওনাকে বললাম, আমাকে প্লিজ যেতে দেন,’ বলতে বলতে চোখে পানি চলে আসে সুমির। বলেন, ‘উনি আমার কোনো কথা শোনেননি। তিনি আমাকে অনেক জোর করেছেন এবং তিনি…।’

এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে সুমি জানান, ওই কাজের জন্য ১০ হাজারের মতো টাকা পেয়েছিলেন। পরে তিনি বাসায় ফিরে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের সবার কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেন, থাকে বেঁচে থাকতে হবে।

সুমি বলেন, ‘পরে আমার মনে হতো লাগলো যা হবার তা তো হয়েই গেছে। আমি কেন মরে যাব? আমি পরিবারের জন্য বাঁচব। পড়াশুনা শেষ করব।’

এর পর সুমিকে জানানো হয় মাসে তাকে এরকম তিনটা ‘কাজ’ করতে হবে। এরপর সুমি ফেসবুকে কলগার্ল সার্ভিসের একটি গ্রুপেও যুক্ত হন। সেখানেও ‘কাজ’ পেতে থাকেন। গ্রাহকদের মধ্যে সরকারি চাকুরিজীবী, বেসরকারি চাকরিজীবীরাই বেশি। কিছু ছাত্রও আছে বলে তিনি জানান।

সুমি জানান, কিছু বাসা আছে, পরিবার নিয়ে থাকে এমন। সেখানে তিনি ও তার মতো অনেকে গ্রাহক নিয়ে যান। বিনিময়ে তাদের দু-তিন হাজার টাকা দেন।

সুমি তার জীবনের কাহিনী শেষ করেন কান্না আর আকুতি দিয়ে, ‘আমি এই জীবন থেকে বের হতে চাই। জানি না কবে পারব। আমি সুন্দর জীবন, সুন্দর সংসার চাই।’

- Advertisement -