Home ফ্রম এডিটর্স গণমাধ্যমে শিশুদের যাচ্ছেতাই ব্যবহার!

গণমাধ্যমে শিশুদের যাচ্ছেতাই ব্যবহার!

- Advertisement -

মোহাম্মদ ওমর ফারুক:

শাওন(১৪) ও সাগর (১৫) (ছদ্ধনাম)। গতকয়েকদিন আগে জেএসসি পরিক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী সন্দেহে তাদের আটক করেন পুলিশ। পরে মূর্হুতের মধ্যে এ সংবাদ লুফে নেন গণমাধ্যমকর্মীরা। কিশোর দুইজনের ছবি নাম,ঠিকানা প্রকাশ হয় গণমাধ্যমে। সাথে তো সামাজিক মাধ্যম আছেই। সামাজিকভাবে শাওন ও সাগরের পরিবার পড়েন ব্রিবতকর পরিস্থিতিতে। মাসেকখানেক পর যখন তারা ছাড়া পায় তাদেন সহপাঠি,শিক্ষক ও আশেপাশের মানুষজনের বাকা চাহনিতে অন্ধকার হয়ে পড়ে তাদের পথচলা। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরে এ দু’জন। বন্ধ হয়ে যায় স্কুলে যাওয়া। দুইজনের একা একা দিন কাটে বদ্ধ ঘরে। আগের মতো চাঞ্চলতা নেই কারোর মধ্যে। তাদের কাছে যেন সব কিছু অচেনা। মাসছয়েক পার হয়ে গেলেও এখন আর স্কুল যাওয়া হয় না তাদের।

- Advertisement -

অন্যদিকে বছরখানেক আগে ঢাকার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের এক কিশোর অপর এক স্কুল কিশোরকে ‘গুটিবাজ’ আখ্যা দিয়ে রাজধানীর ধানমন্ডির লেকের পাড়ে বেধড়ক মারধর করে। অভিযোগ- কিশোরটি মারধরকারীর এক বান্ধবীর সাথে প্রতারনা করেছে। এই খবরটি বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি মূলধারার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার ও প্রকাশ করেছে। সেইসাথে ওই ঘটনার সাথে জড়িত একাধিক কিশোরের নামধামসহ ঘটনাটির ভিডিও ইউটিউিবে রয়েছে বলেও তখন জানিয়ে দেয় গণমাধ্যমে । ফলাফল হিসেবে দেখা যায় ওই ভিডিওটিকে কেন্দ্র করে (প্যারোডি করে) আরও অসংখ্য ভিডিও তৈরি করে পরবর্তিতে আপলোড দেওয়া হয় ইউটিউবে। আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে- এইসব ভিডিও নির্মাতাদের বেশিরভাগই কিশোর। এতে করে ভোক্তভোগী কিশোরদেও সামাজিকভাবে অপদস্ত হতে হয়েছে। জানা ওই ঘটনার দুই ভোক্তভোগী কয়েবার আত্বহত্যার চেষ্ঠাও করেছে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যম দায়সারা ভূমিকা রেখেছে। শুধু এই ঘটনাটি নয়, এমন অহরহ ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে। দেশের গণমাধ্যম গুলো সংবাদ বাছাইয়ে অপরাধ বিষয়ক সংবাদপ্রীতির আধিক্য অর্থাৎ অপরাধবিষয়ক লাগাতার প্রধান সংবাদ খোঁজার প্রবণতা শিশুর মানবিক বোধকে ভোঁতা করে দিচ্ছে । এমন বিষয় শিশুদের গোপনীয়তার ওপর গুরত্ব দিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট গণমাধ্যমকে সর্তক করেছেন। হাইকোর্ট বলেছেন, কোনো মামলায় শিশুর নামপরিচয় যাতে প্রকাশ না পায়, এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে সর্তক হতে হবে। আদালত বলেছেন শিশুর ছবি, নাম, পরিচয়, প্রকাশ পায় বা শিশুকে চিহ্নিত করা যায়, এ ধরনের প্রতিবেদন যাতে ভবিষ্যতে আর ছাপা না হয়। এ বিষয়টি তদারকি করতে আইনসচিব ও তথ্য সচিবসহ বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, শিশু আইনের মূল উদ্দেশ্য কোনো মামলায় বিচারের ক্ষেত্রে তাদের গোপনীয়তা রক্ষা করা, যা বিচারপূর্ব, বিচার চলা ও বিচার পরবর্তী পর্যন্ত বোঝায়। এ ক্ষেত্রে তাদের মর্যাদা বজায় রাখা, যাতে তারা সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ পায়। এ রায়ের পরেও তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি গণমাধ্যমগুলোতে।

অন্যদিকে, শিশু অধিকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে প্রায় সব মাধ্যমেই। তার পরও নির্দ্বিধায় বলা যায়, অনেক সময় এই প্রধান দুটি বিষয়সহ শিশু অধিকারের অন্য সব বিষয়ে মিডিয়ার তৎপরতা কেবল দিবসভিত্তিক। জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত কোনো দিবসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় শিশুদের জন্য সংবাদ। অন্য সময় অপহরণ, খুন, ধর্ষণের মতো কিছু স্পর্শকাতর বিষয় অথবা সড়ক দুর্ঘটনা বা পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু খবর ছাড়া পত্রিকার পাতায় ও বেতার-টেলিভিশনের সংবাদেও শিশুদের বিষয় তেমন একটা স্থান পায় না।

ইউনিসেফ পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন তথ্য অনুসারে, গণমাধ্যমে শিশুদের অংশগ্রহণ মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। টেলিভিশনগুলোতে বিনোদন ও শিক্ষামূলক কিছু অনুষ্ঠানে শিশুদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে শিশুরা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদের মতামত তুলে ধরার সুযোগ প্রায় কখনোই পায় না। গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ও টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদে শিশুদের উপস্থিতি ৩ শতাংশ বা তার চেয়েও কম। বিভিন্ন দেশে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ইয়ুথ অ্যান্ড এডুকেশনাল টেলিভিশন পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, পেশাদার গণমাধ্যকর্মীদের পরিকল্পনায় অথবা বড়দের ইচ্ছামতো বিষয় নির্বাচন ও পরিবেশনার চেয়ে শিশুদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ দর্শকের সামনে খুলে দিতে পারে শিশু অধিকারের যেকোনো বিষয় সম্পর্কে নতুন ভাবনার দিগন্ত। ছোটদের মনোজগতে ক্রিয়াশীল যেকোনো তথ্য, সংবাদ, কাহিনী ও বিনোদন শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ গঠনে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তারা মনে করেন, একটি শক্তিশালী শিশুবান্ধব গণমাধ্যমের নিয়মিত পরিবেশনার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে শিশুদের ধারণা, মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি। কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা সম্পর্কে শিশুদের সংবাদ, সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্তসহ সংবাদ বিশ্লেষণ ও শিশুদের মতামত পাল্টে দিতে পারে সহপাঠি সম্পর্কে একজন কিশোরের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবে মেয়েশিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী-নির্বিশেষে সব শিশুর প্রতি সহমর্মিতার ক্ষেত্র সৃষ্টিতে অবদান রাখতে পারে শিশুদের নিজস্ব চিন্তাচেতনাসমৃদ্ধ সংবাদ। বর্তমানে প্রায় চল্লিশটি টেলিভিশন ,কোনোটিই শিশুদেও নিয়ে আশার খবর দিতে পারছে না।

বিজ্ঞাপনে শিশুদের ব্যবহার

বাড়ছে বিজ্ঞাপনে শিশুদের আধিপত্য। যেকোনো চ্যানেলে ১০টি বিজ্ঞাপনের কমপক্ষে সাতটিতেই তারা হাজির। তারা গাড়ি-বাড়ি, টিভি-ফ্রিজ, পানীয়, সাবান, হরলিকস , বালতি বা ঢেউটিনের গুণগান করে। এতে করে অভিভাবকেরা অর্থ পাচ্ছেন, শিশুটিও তারকা হচ্ছে। আর ঘরের শিশুরা ভাবছে, ওই শিশুটির মতো আমারও খ্যাতি দরকার, টাকা দরকার। আর দরকার ওই সব বিজ্ঞাপিত পণ্য। মা-বাবারা তাদের আবদারে হার মানেন। শিশুরাও হয়ে যায় ওই সব পণ্যের স্থায়ী ক্রেতা। গণমাধ্যমের অভাবনীয় প্রসারে শুধু পাশ্চাত্য নয়,দেশের গণমাধ্যমও এখন আর পিছিয়ে নেই। মুঠোফোন থেকে শুরু করে মরিচের গুড়া পর্যন্ত সব বিজ্ঞাপনে শিশুদের উপস্থিতি অহরহ। আর শিশুরা এসব বিজ্ঞাপনের ভাল দর্শকও। যখন শিশুর মাধ্যমে কোনো বাণিজ্যিক বার্তা দেওয়া হয় তা দর্শকদের বিশেষ মনোযোগ কাড়ে এবং শিশুদের ওপর বড়দের মানবিক আবেদন থাকায় ওই সব পণ্য ক্রয়ে তাদের আগ্রহী হতেও দেখা যায়। এখানে শিশুদের পণ্যেও মতো ব্যবহার করছে। অন্যদিকে শিশুরা যখন বিজ্ঞাপনে তাদের সমবয়সী কাউকে কোনো পণ্য কিনতে বা ব্যবহার করতে দেখে, তখন সেই পণ্যের ব্যাপারে তাদের আগ্রহও প্রবল হয়। পাশাপাশি শিশুরা অনুকরণপ্রিয় হওয়ায় তাদের পছন্দ-অপছন্দ, আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, রুচিবোধ বাজারি স্বার্থের আদলে গড়ে উঠতে থাকে। বিজ্ঞাপনে এই বৈষম্যমূলক উপস্থাপন, যাদের নিজেদের বাড়ি, গাড়ি কিংবা টিভি নেই তাদের মধ্যে একধরনের হীনমন্যতা ও বিচ্ছিনতাবোধ জন্মায়। এই হীনমন্যতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ একদিকে মা-বাবাকে চাপ দেয় ওইসব পণ্য ক্রয়েরর জন্য। অন্যদিকে অন্যান্য শিশুদের সাথে তাদের স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়ায় বাধা দেয়। শিশুদের নিয়ে বিজ্ঞাপনের প্রভাব সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায়ও এ ধরণের ফলাফল উঠে এসেছে। এসব ফলাফলে শিশুদের মানসিক বিকাশকে প্রতিবন্ধকতার দিকে ঠেলে দেয়ার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়।

বছর কয়েক আগে আর জি সার্চ ইন্ডিয়া নামে একটি সংস্থা ভারতের বড় ৯টি শহরে একটি সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি কেনাকাটার সিদ্ধান্তে শিশুদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা। মোট ৪,৭২৫টি শিশু ও তাদের অভিভাবকদের মতামত যাচাই করে যে ফলাফল পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, প্রায় ৩৪ শতাংশ বাড়িতে ওই সব পণ্য কেনার কথা প্রথম তুলেছে শিশুরা। তার মধ্যে ৫৪ শতাংশ শিশুদের মতামত অনুসারে ওই পণ্যগুলো কেনা হয়েছে। জর্জ কামস্টক এর গবেষণাতেও শিশুদের বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞাপিত পণ্য পাওয়ার জন্য মা-বাবাকে চাপ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এই চাপের কারণেই বাড়ি-গাড়ি কেনার মাধ্যমে নিজেদের উচ্চবিত্ত করে তোলার জন্য মা-বাবা ব্যাংক ঋণ নিতে বাধ্য হয়। আর তাছাড়া প্রতিটি শিশুকে বিজ্ঞাপনে ¯্রফে পন্য হিসেবে দেখা হয়।

রিয়েলেটি শো এ শিশুদের ব্যবহার:

হিন্দি সিরিয়ালের পাশাপাশি শিশুদের নাচ-গানের প্রতিযোগিতা রিয়েলিটি শো এখন বাংলাদেশে দারুনণ জনপ্রিয়। উন্নত প্রযুক্তি আর পুঁজির জোরে এসব চ্যানেলই এখন উপমহাদেশের জনসংস্কৃতিকে প্রভাবিত করছে। অন্যরা বাধ্য হচ্ছে তাদের অনুকরণ করতে। দৃশ্য বা ইমেজের ক্ষমতা এতই সর্বজনীন যে, ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির ঘের তা অনায়াসেই ভেঙে ফেলছে।

ওই সব অনুষ্ঠানে নতুন কুঁড়ির নাচ-গান নয়। ধুমধাড়াক্কা হিন্দি ছবির চটুল গানের সঙ্গে ততোধিক প্রাপ্তবয়স্ক নাচ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে , বলিউডি তারকারাই মঞ্চ কাঁপাচ্ছে, দর্শকের মনে ঢেউ তুলছে। সেই পোশাক, সেই বিশেষ ভঙ্গি, সে রকম শরীর চঞ্চল করা কথা ও সুর। একটি তিন-চার বছর বয়সী বালিকা অসম্ভব কসরত করে যে নাচটি করে, ফিল্মের দৃশ্যে তা করেছিল স্বল্পবসনা কোনো হার্ট থ্রব নায়িকা। ভারতের প্রায় প্রতিটি হিন্দি-বাংলা চ্যানেলে এ রকম একটি অনুষ্ঠান সারা বছর চলে। ইদানীং দেশি চ্যানেলগুলোও সেই ধারায় চলা শুরু করেছে। একটি চ্যানেল বছরখানেক আগে এ রকম একটি নাচের প্রতিযোগিতা চালায় এবং সম্প্রচারও করে। স্কুলভিত্তিক প্রতিযোগিতাও হয়। শিক্ষকেরা মেনে নেন, অভিভাবকেরা খুশি হন। কিন্তু তাদের নাচগুলো শিশুসুলভ ছিল না। এ উৎপাত প্রথম দেখা যায় মার্কিন মুলুকে। সেখান থেকে আসে ভারতে, এখন বাংলাদেশেও তা রমরমা। এভাবে শিশুদের একাধারে ‘খুদে প্রাপ্তবয়স্ক’ বানানো হয়, অন্যদিকে তারা হয় বড়দের ‘আনন্দের পুতুল’। অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব অনুষ্ঠান দেখার প্রভাবে অনেক শিশুর মধ্যে অল্প বয়সে যৌনতার বোধ জন্ম নেয়। এসব শিশু সহজেই বিচ্যুত হয়, তাদের জীবন আর সহজ থাকে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মা-বাবাদের এসব ভাবা উচিত। অর্থ, খ্যাতি, সম্মান শিশুর প্রয়োজন নয়, তা বড়দের প্রয়োজন। শিশুদের দরকার নির্মল আনন্দ, খেলাপ্রিয়তা ও জানার-মেশার উচ্ছ্বাস।

গণমাধ্যম যেমন প্রভাব ফেলে শিশুদের উপর:

প্রায় দুই বছর আগে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে চট্টগ্রামে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরী গলা টিপে তার তিন বছর বয়সী মামাতো বোনকে হত্যা করে। মামি তাকে একবার চুরির অপবাদ দিয়েছিলেন। সেই রাগে সে মামাতো বোনকে খুন করে। ওই কিশোরী ধরার পড়ার পর পুলিশের কাছে স্বীকার করে ক্রাইম পেট্রোল দেখে সে এভাবে খুনের ধারণা পায়। টিভিতে দেখানো রেসলিং দেখে অনেক শিশুকে মারামারিতে লিপ্ত হতে দেখা গেছে। সিনেমার ধর্ষণদৃশ্য দেখে বহু বছর আগে চাঁদপুরের এক কিশোর তার চাচাতো বোনকে ধর্ষণ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই সিনেমা ও নাটকের তারকাদের জীবনযাত্রার প্রতি সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ থাকে। কিশোর-কিশোরীদের আগ্রহ একটু বেশি থাকে। তাদের অনেকে তারকাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তারা সিনেমা, নাটকের তারকাদের মতো হতে চায়। অনেকে তাদের মতো পোশাক পরতে চায়, যা কিনা অনেক সময় পারিবারিক বা সামাজিক বাধার সম্মুখীন হয়। তখনই বাধে বিপত্তি। এই তো বছর চারেক আগের ঘটনা। ভারতীয় স্টার জলসা চ্যানেলে প্রচারিত টিভি সিরিয়াল বোঝে না সে বোঝে না খ্যাত জনপ্রিয় পোশাক পাখি না পেয়ে গাইবান্ধা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নবাবগঞ্জে তিন কিশোরী আত্মহত্যা করেন। এর পরের বছর জনপ্রিয় ভারতীয় সিরিয়াল কিরণমালার নায়িকার পোশাকের মতো পোশাক কিনে না দেওয়ায় বগুড়া, চুয়াডাঙ্গা, মাদারীপুর ও লক্ষ্মীপুরে চার কিশোরী আত্মহত্যা করে। এসব ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশে স্টার জলসা, জি-বাংলাসহ ভারতীয় চ্যানেলগুলো সম্প্রচার বন্ধের দাবি ওঠে। যদিও চ্যানেলগুলো এখনো বন্ধ হয়নি। এসব চ্যানেলে বড় বড় তারকাদেও পাশাপাশি শিশুদেরও যেভাবে ব্যবহার করেছে অন্য শিশুরা দারুন প্রভাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে এসব সাংস্কৃতির প্রভাব পড়ছে জোরেশুরে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম বলেন, গণমাধ্যমে শিশুদের মানসিক বিকাশে দারুন ভূমিকা রাখেন। তাই গণমাধ্যমেরও উচিৎ শিশুদেও বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করা। তাছাড়া আজকাল দেখা যায়,শিশুদের ভয়ংকর অপরাধী বানিয়ে তাদেও নাম ঠিকানা ছবি ব্যবহার করে গণমাধ্যম রিপোর্ট প্রকাশ করে। গণমাধ্যমগুলো কি একবারো অনুধাবন করতে পেরেছে,সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পরে শিশুটির বেড়ে উঠতে কত ধরনের বাধা তৈরী হতে পরে। এসব বিষয়গুলোর দিকেও সবার নজর দেয়া উচিৎ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন,গণ্যমাধ্যমের এই ভুল গুলোর মাশুল দিতে হবে আগামী প্রজন্মের। সেই জায়গা থেকে প্রতিটা গণমাধ্যমকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। যাতে করে একটি শিশুরা তাদের বলির শিকার না হয়। শিশুরা খুবই স্পর্শকাতর একটি ইস্যু। তারা আজ যা দেখবে,আগামী সেটাই করবে,অনুকরন করবে।

সময়টিভির বার্তাপ্রধান তুষার আবদুল্লাহ বলেন,বোকাবাক্সে শিশুদের নিয়ে তেমন কোন আয়োজন হয় না। সবসময়ই তারা থাকে উপেক্ষিত । আর যতটুকু তাদের দেখানো হয় ততটুকুই নেতিবাচক সংবাদ। শিশুদেও নিয়ে ইতবাচক সংবাদ প্রচার করা উচিৎ। বিজ্ঞাপনের ব্যাপারটি আসলেই তাদেও পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। বিজ্ঞাপন অনেক বড় একটি মাধ্যম । সেটাকে বার বার দেখানো হয়। বিজ্ঞাপনে শিশুদেও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সবায়কে সচেতন হতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাংবাদিকতার শিক্ষক আ.আ.ম.স. আরেফিন সিদ্দিকী বলেন,গণমাধ্যম হচ্ছে সমাজের আয়না,আর সেই আয়নার ভুল কিছু দেখা গেলে সমাজও ভুল পথে যাবে । গণমাধ্যমে শিশুদের সংবাদ বা টিভি নাটক,সিনেমায় শিশুদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে গণমাধ্যম কর্মীদেও আরো সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে যারা গেইটকিপারের দায়িত্ব পালন করে তাদের সচেতনতা বেশী জরুরী।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আজকের শিশু মানে আগামীর প্রজন্ম। তাদের দায়িত্ব আমাদের সবার। শিশুদেও নিয়ে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে সবাইকে আরো সচেতন হতে হবে। আর তাছাড়া গত কয়েকদিন আগে উচ্চ আদালতও বিষয়টি নিয়ে সবাইকে সর্তক করে দিয়েছে। সেটির বাস্তবায়ন হলেই হবে। তবে সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি অনুষ্ঠান তৈরীর সময়ও শিশুদেও বিষয়টি মাথায় রেখে সবাইকে কাজ করতে হবে।

- Advertisement -