বিষ বাতাস!

ধূমপান পরিস্থিতি -৬(শেষ পর্ব)

মোহাম্মদ ওমর ফারুক: বাংলাদেশের শিশুদের বিরাট অংশ ধূমপানের বিষক্রিয়ায় শিকার। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন ও আশপাশ এলাকার ৯৫ শতাংশ শিশুর শরীরে ক্ষতিকর নিকোটিন আছে। পরোক্ষ ধূমপান নিকোটিন উপস্থিতির কারণ।শুধু তাই প্রায় বিভিন্ন গবেষনায় বলছে পরোক্ষ ধূমপানে শিকার প্রায় কোটিখানেক নারী। প্রতিনিয়ত পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বছর ৫৮ শতাংশ পুরুষ ও ২৯ শতাংশ নারী ধোঁয়াযুক্ত এবং ২৮ শতাংশ নারী ও ২৬ শতাংশ পুরুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সের ৭ শতাংশ কিশোর-কিশোরী নতুন করে তামাকের প্রতি আসক্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও যথাযথ প্রয়োগের অভাবে প্রতিনিয়ত পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে।

ক্ষতির শিকার

বিষ বাতসের মতো কাজ করে,পরোক্ষ ধূমপান। ধূমপায়ী ধূমপান করে শ্বাস ছাড়ার সময় বেশ ধোঁয়া ছেড়ে দেন বাতাসে। সেই ধোঁয়ার সঙ্গে যোগ হয় সিগারেট জ্বলার সময় সিগারেট থেকে সরাসরি নির্গত ধোঁয়া। ধূমপায়ীদের আশপাশে থাকা অধূমপায়ী লোকের শরীরে এ ধোঁয়া ঢুকে যায় শ্বাসের মাধ্যমে। তাদের অনীহা সত্ত্ব্বেও। এটাই পরোক্ষ ধূমপান। পরোক্ষ ধূমপান হতে পারে বাসবাড়িতে। বাবা ধূমপান করছেন। পাশে সন্তানরা হতে পারে অফিসে বা কর্মস্থলে। কেউ হয়তো অফিসে ধূমপান করছে না। কিন্তু পাশের সহকর্মী করছেন হতে পারে রেস্টুরেন্ট, যানবাহনে, বাজারে এবং জনসমাগম হয় এরূপ অন্যান্য স্থানে। ধূমপায়ীর ছেড়ে দেয়া ধোঁয়া এবং জ্বলন্ত সিগারেট থেকে সরাসরি ধোঁয়া এ দুই ধোঁয়ার মাধ্যমে তামাকে থাকা সব বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থই বাতাসে ছড়িয়ে যায়। শ্বাসের মাধ্যমে ধূমপায়ীর আশপাশে থাকা অধূমপায়ীর শরীরে এসব রাসায়নিক পদার্থ প্রবেশ করে। কারণ হয়ে দাঁড়ায় অধূমপায়ীর শরীরে সমূহ ক্ষতির।পরোক্ষ ধূমপান প্রত্যক্ষ ধূমপানের মতোই ক্ষতিকর।

পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সঙ্গে সঙ্গেই কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। যাদের অ্যালার্জি বেশি, তাদের অ্যালার্জির লক্ষণ বেড়ে যেতে পারে। যেমন হাঁচি আসা, কাসি হওয়া, চোখ জ্বলা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, নাক ঝরা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। যাদের হাঁপানি আছে তাদের হাঁপানি অ্যাটাক হতে পারে, শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে। পরোক্ষ ধূমপানের জন্য দীর্ঘদিন পরও শরীরে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটা অবশ্য নির্ভর করবে একজন কী হারে এবং কতদিন পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে তার ওপর। দীর্ঘদিন পরোক্ষ ধূমপান করলে কী কী স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে? হতে পারে ফুসফুসের ক্যান্সার। হৃদরোগ, উচ্চ রক্ষচাপ, ব্রঙ্কাইটিস শ্বাসকষ্ট, শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশন, গর্ভপাত, বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি ইত্যাদি।

দেখা গেছে, বাসাবাড়িতে ধূমপান করলে বাড়ির অধূমপায়ী সদস্যদের পরোক্ষ ধূমপানের কারণে ফুসফুসের ক্যান্সারের সম্ভাবনা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপায়ীদের এ সম্ভাবনাও পায় ২০ শতাংশ। বাসাবাড়িতে পরোক্ষ ধূমপায়ী শিশুদের হাঁপানি ব্রঙ্কাইটিস ও ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি অন্যান্য অ্যালার্জি হওয়ার আশঙ্কাও যথেষ্ট। দুই বছরের কমবয়সী শিশুদের শ্বাসনালির বা ফুসফুসের ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। সুতরাং পরোক্ষ ধূমপানের প্রশ্নে শিশু ও মহিলাদের কথা একটু বেশিই মনে রাখতে হবে। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে আমেরিকায় প্রতিবছর প্রায় তিন হাজার অধূমপায়ী ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যায় এবং প্রায় ৩ লাখ শিশু শ্বাসনালি বা ফুসফুসের রোগে ভোগে। শিশু হাসপাতলের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আবু তৈয়ব জানান,ধূমপান করে না,এমন একজন মানুষ বুঝতেই পারে না,পরোক্ষ ধূমপানে তাদের কতটা ক্ষতির সম্মুখিন হতে হচ্ছে।

একটি নতুন গবেষণায় জানানো হয়েছে, শৈশবের পরোক্ষ ধূমপানের কারণে পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় আরথ্রাইটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি হয়। রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস হচ্ছে ক্রনিক ইনফ্লামেটরি ডিজঅর্ডার যা হাত এবং পায়ের জয়েন্টের উপর প্রভাব ফেলে। এতে জয়েন্টে ক্ষয় ও অক্ষমতা দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, শৈশবে যারা নিষ্ক্রিয় ধূমপান করে থাকে তাদের বিপত্তির অনুপাত হয়ে থাকে ১.৭৩ যারা ধূমপান করেনা তাদের তুলনায়। ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি হসপিটালস অফ সাউথ প্যারিস এর অধ্যাপক রেফায়েল সেরর বলেন, তামাকের পরিবেশ থেকে শিশুকে দূরে রাখা উচিৎ এই বিষয়টির উপরই আলোকপাত করা হয় আমাদের গবেষণায়, বিশেষ করে যাদের পারিবারিক ইতিহাস আছে রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস এর। এই গবেষণার ফলাফলটি প্রকাশ করা হয় অ্যানুয়াল ইউরোপিয়ান কংগ্রেস অফ রিউমাটোলজিতে ২০১৭ এ।

এছাড়াও অন্য একটি পর্যালোচনায় ও দেখা যায় যে, এনকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস (এএস) নামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের মেরুদন্ডের গঠনগত ক্ষতি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে ধূমপান সম্পর্কিত। এটি বেদনাদায়ক আরথ্রাইটিসের একটি গঠন যা হয়ে থাকে মেরুদন্ড ও বড় জয়েন্টে দীর্ঘমেয়াদী ইনফ্লামেশনের ফলে। গবেষকেরা বলেন, ধূমপানের ফলে নতুন হাড়ের মত গঠন দেখা যায় যাকে সিনডেস্মোফাইট বলে। তুরস্কের ইজমির কাটিপ সেলেবি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সারভেট আকর বলেন, ধূমপান শুধু রোগের সংবেদনশীলতার বড় রিস্ক ফ্যাক্টর নয় বরং এএস রোগীদের রোগের তীব্রতাও বৃদ্ধি করে থাকে।

পাবলিক প্লেসে ধূমপান

গণপরিবহন, পার্ক, সরকারি-বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, রেস্তোরাঁ, শপিং মল, পাবলিক টয়লেটসহ বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে ধূমপান বন্ধে ২০০৫ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল একটি আইন। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার রোধে করা সেই আইনে প্রকাশ্যে ধূমপানের জরিমানা ধরা হয়েছিল ৫০ টাকা। শুরুর দিকে সেই অর্থ জরিমানা করতে পুলিশ কিছু অভিযানও চালিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর আইন অমান্য করে খোদ পুলিশের বহু সদস্যই প্রকাশ্যে ধূমপান করেন। এর সুযোগ নেয় জনগণও। এভাবে পুলিশ-জনতার দায়িত্বহীনতায় কেতাবি বিষয়ে পরিণত হয় ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন।

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের সংশোধনী আনা হয়েছিল ২০১৩-তে। সেই সংশোধনীতে জনসমাগমস্থলে ধূমপানের সাজার অর্থ ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়। কিন্তু আইন না জানা ও ভাঙায় অভ্যস্ত লোকজনের অবস্থা তাতে বদলায়নি এতটুকু।

সরেজমিন দেখা গেছে, রাস্তার পাশে টং দোকান, চায়ের কাপ আর দোকানে ক্রেতাদের বসার জায়গাটিও সিগারেট কোম্পানির প্রচারণার দখলে। প্রকাশ্যে টিভি ও গণমাধ্যমে সিগারেট কোম্পানির প্রচারণা না থাকলেও পথে প্রান্তে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সিগারেটের প্রচারণা এখন হরহামেশাই হচ্ছে। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (জিএটিএস) ২০০৯ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৪ কোটি ১৩ লাখ (৪৩ শতাংশ) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক সেবন করে। আর পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয় প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। ধূমপানবিরোধী বেসরকারি সংগঠন প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) জানিয়েছে, পাবলিক প্লেসে ধূমপান বন্ধ করতে হলে সবার আগে জনগণের সচেতনতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাসে, ট্রেনে ধূমপান শূন্যের কোঠায়। যদি কেউ ভুল করেও বাসে সিগারেট জ্বালায় যাত্রীরা এর প্রতিবাদ করেন। কিন্তু পাবলিক প্লেসগুলোতে এখনও সেভাবে কেউ প্রতিবাদ করে না। মূলত যারা ধূমপান করে তাদের কাছে সিগারেট সহজলভ্য হওয়ায় এটি বন্ধ হচ্ছে না। পাবলিক প্লেসগুলোতে যদি সিগারেট বিক্রি বন্ধ করা যায় তাহলে হয়তো এ আইনের অনেকটাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো।

এছাড়া অনেক ধূমপায়ী জানেন-ই না পাবলিক প্লেস বলতে কোন কোন স্থানগুলোকে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব স্থানগুলোতে ধূমপানমুক্ত এলাকা কিংবা পাবলিক প্লেস, ধূমপান নিষিদ্ধ সাইনবোর্ড স্থাপন করে আইনের অনেকটাই সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তামাক কোম্পানিগুলো যেসব প্রচারণা চালায় তা প্রকাশ্যে। আইন অনুযায়ী সিগারেটের বিজ্ঞাপন প্রচার নিষিদ্ধ।

এই বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মচারী ধূমপান এবং তামাক সেবন করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। শুধু তাই নয় পাবলিকে প্লেসে ধূমপান করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে নিজেরা যদি সচেতন না হই ,এমনটা থেকে বের হওয়া খুব কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ সময়ঃ ১৩১০ ঘণ্টা, ১৫ এপ্রিল, ২০১৮