‘মানুষের মান কীসের সমান’

হানিফ সংকেত

আমরা একটা কথা জানি এবং মানি ইংরেজি ‘মানি’ মানে টাকা, আর বাংলায় ‘মানী’ মানে সম্মানসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু আজকাল ওই ইংরেজি ‘মানি’ই হয়ে উঠেছে বাংলায় ‘মানী’ হয়ে ওঠার মূল। কিন্তু ‘মানি’ নয় ‘মানী’ হয়ে সমাজের যোগ্য অবস্থানে সবাই পৌঁছাক এটাই কিন্তু আমরা চাই। সে জন্যেই বলে, ‘ধনে নয়, মানে নয়, খ্যাতিতেও নয়, কর্মেই পাই মানুষের পরিচয়’। কারণ অর্থই হচ্ছে এক অর্থে অনর্থের মূল। কার চরিত্র কেমন, কার মেধা কতটুকু আর কার কত টাকা তা কিন্তু চেহারা দেখে বোঝা যায় না। আচার-আচরণই বলে দেয় কে কোন প্রকৃতির।

আকার-আকৃতির ওপরও কিন্তু এ প্রকৃতি নির্ভর করে না। আমরা অনেক সময়ই নির্বোধকে গরু-ছাগল-গাধা, চালাককে শিয়াল পণ্ডিত, অস্থিরতাকে বানরের সঙ্গে তুলনা করি। এভাবে মানুষের নানা ক্রিয়া-কর্মের সঙ্গে প্রাণীর তুলনা করলেও, জানি এরা উপকারী প্রাণী। এদের কারও কারও মধ্যে কিন্তু শিল্পবোধও আছে। দেশি-বিদেশি অনেক সাফারি পার্ক, ইকোপার্ক, সার্কাসে গেলে আমরা দেখতে পাই কী অসাধারণ ভঙ্গিতে এসব প্রাণী চমৎকার সব ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। হাতি, বাঘ, ভালুুক, ঘোড়া এসব প্রাণী তো সার্কাসের মূল আকর্ষণ। বলা যায় মহাতারকা। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে এসব প্রদর্শনী উপভোগ করেন। ইত্যাদিতে আমরা বিভিন্ন সময় এসব পশুপাখির চরিত্র তুলে ধরে বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করেছি। নানা-নাতির কথাই ধরা যাক।

একবার নানার সঙ্গে চিড়িয়াখানায় গিয়ে বিভিন্ন পশুপাখির খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে নাতি পশুপাখি সম্পর্কে নানাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে। যেমন জিরাফের খাঁচার সামনে এসে হঠাৎ প্রশ্ন করে,- ‘আচ্ছা নানা কও তো জিরাফের গলাটা এত লম্বা কেন?’

নানা ধমক দিয়ে ওঠেন,- ‘তাতে তোর অসুবিধা কি’?

কোনো অসুবিধা নাই। তবে বলছিলাম কি, জিরাফের গলাটা লম্বা ঠিকই কিন্তু কোনো গলাবাজি নাই।

এরা কি আর মানুষ যে গলাবাজি করবে?

এইটাই তো চিন্তা করতাছি, মানুষ এতটুক একটা গলা লইয়া কী পরিমাণ গলাবাজি করে আর তাগো গলা যদি জিরাফের মতো লম্বা হইতো তাইলে অবস্থাটা কী হইতো চিন্তা করছো?

‘আমি এতো চিন্তা করতে পারুম না, চল।’ নানা বিরক্ত হয়ে নাতিকে টেনে নিয়ে বাঘের খাঁচার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বাঘ দেখিয়ে নানা বলেন, ‘দেখছোস এইডা হইলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর ঐডা হইলো সিংহের খাঁচা- দুইটাই খুব তেজি আর হিংস্র প্রাণী। সেই জন্য ওগো খাঁচাটাও খুব মজবুত কইরা বানাইছে।’

‘কিন্তু নানা এরা কি মানুষের চাইতেও হিংস্র?’ নাতির প্রশ্ন

কিয়ের লগে কিয়ের তুলনা। আরে মাইনষের কি এত বড় বড় দাঁত আর নখ আছে?

তা নাই কিন্তু এই বাঘ-সিংহ শুনছি ক্ষিধা না লাগলে শিকার করে না। কিন্তু পত্রপত্রিকায় যে এত কোপাকুপি আর খুনাখুনির খবর দেহ তা কি বাঘ-সিংহে করে না মাইনষে করে? তুমিই কও তো কারা বেশি হিংস্র?

নাতির প্রশ্ন শুনে নানা আবার ধমক দিয়ে ওঠেন, ‘আহ্হারে হঠাৎ এই খুনখারাপি লইয়া কী শুরু করলি? চল তো চল-’

নানা-নাতি এবারে গণ্ডারের খাঁচার সামনে যায়। গণ্ডার দেখিয়ে নাতির প্রশ্ন,-

আচ্ছা নানা গণ্ডারের চামড়া বলে মোটা?

‘হঃ’। নানা নাতির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে।

কিন্তু আমাগো দেশে অনেক মানুষ আছে হেগো চামড়াতো গণ্ডারের চাইতেও মোটা। গণ্ডারের তো খবর হইতে কয়েক দিন লাগে কিন্তু ঐসব মাইনষেরে তো বছর বছর ধইরা কইলেও হুঁশ হয় না। তারপর এই যে রাস্তাঘাটের কথাই ধর। নিয়ম মাইনা পথচলার ব্যাপারে চালক আর পথচারীগো কতভাবে বলা হইতাছে, তারা কি নিয়ম মানতেছে? মানতেছে না। তাগো কী কইবা? নাতির কথায় নানা কোনো উত্তর খুঁজে পান না। বিব্রতবোধ করেন।

‘বুঝছি তোরে লইয়া আর ঘোরা যাইবো না, চল’। এবার নানা বেশ রেগেই নাতিকে টেনে-হিঁচড়ে চিড়িয়াখানা থেকে বের করে নিয়ে যান।

শুধু নানা-নাতিই নয়, পশুপাখি নিয়ে উপদেশ দিতে গিয়ে একবার এক শিক্ষকই বিপাকে পড়ে গিয়েছিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রাণিবিদ্যায় পড়াশোনা করেছেন ওই শিক্ষক। শিক্ষকতাও করছেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগে। তাই ক্লাসে পড়ালেখা করার পাশাপাশি সবাইকে প্রাণিজগৎ সম্পর্কে সচেতন করা বিশেষ করে কোন প্রাণী বা পশুর কী নাম, কোন প্রাণী প্রকৃতিতে কী কাজে লাগে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এদের অবদান, পশু হত্যা বন্ধ, বন্দীদশা থেকে পাখি মুক্ত করা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন পশুপাখির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে নিয়মিত উপদেশও দেন। সেই উপদেশই আবার নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, নানা জনে-নানা মনে, নানা খানে, নানা কানে, নানান অর্থ বা অনর্থ ঘটায়। যেমনটি ঘটেছে এই শিক্ষকের ক্ষেত্রেও। একদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের পড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ সেখানে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের আগমন। ঢুকেই তিনি শিক্ষককে প্রশ্ন করলেন,-‘মাস্টার সাহেব আজ কী পড়াচ্ছেন?’

হঠাৎ প্রধান শিক্ষককে এভাবে শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে দেখে অবাক হলেন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের সামনে প্রশ্ন করায়ও কিছুটা বিব্রতবোধ করছিলেন। তারপর বিনয়ের সঙ্গে জবাব দিলেন,-‘ওদের ক্লাসের পড়া শেষ। তাই আমি অন্য বিষয় নিয়ে-বিশেষ করে চারিত্রিক উৎকর্ষতা, কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি, অসততা দূর এসব বিষয় নিয়ে একটু কথা বলছিলাম।’

সেটা ভালো কিন্তু আমি রিপোর্ট পেলাম আপনি নাকি বিভিন্ন পশুপাখির উদাহরণ দিয়ে ওদের উপদেশ দেন।

জী স্যার।

এটা তো ঠিক নয়।

আপনি কি শুনেছেন জানি না-তবে আমি ওদের চরিত্র গঠনের জন্য যে কথাগুলো বলি সেটা খারাপ নয়। আপনি অনুমতি দিলে একটু বলি শোনেন-

বলেন-

আমি এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বিড়াল যেমন অতি সন্তর্পণে ইঁদুর ধরে আমি ওদেরকে তেমনি কৌশলে জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে বলি। আমি ওদের জীবনের সমস্যা লাঘবে বাঘের মতো গর্জে উঠতে বলি। সিংহের মতো সাহসী হতে বলি। অশ্বের মতো বেগবান হতে বলি। উটের মতো কষ্টসহিষ্ণু হতে বলি। পিঁপড়ার মতো পরিশ্রমী হতে বলি। গরুর মতো পরোপকারী হতে বলি। একাগ্রচিত্ত হতে বলি বকের মতো। একতাবদ্ধ হতে বলি কাঁচকি মাছের মতো আর সঞ্চয়ী হতে বলি মৌমাছির মতো।

প্রধান শিক্ষক দ্বিমত করে বললেন,-‘আপনি যাই বলেন এটা ঠিক মানতে পারছি না। মানুষের আচরণ দিয়েও তো এসব নৈতিকতার উদাহরণ আপনি দিতে পারেন?’

শিক্ষক বললেন, ‘হ্যাঁ দেই-বলি মানুষ মাত্রই ভুল করে।’

প্রধান শিক্ষক তখন বলে ওঠেন,-‘কেন? বিদ্যাসাগরের মতো মাতৃভক্ত হও, হাজী মুহম্মদ মুহসীনের মতো দানশীল হও, মাদার তেরেসার মতো মানুষের সেবা কর-এসবও তো বলতে পারেন?’

শিক্ষকের উত্তর,-‘পারি স্যার কিন্তু এখনকার মাতৃভক্তি তো মাকে বৃদ্ধ বয়সে ওল্ডহোমে রেখে আসা, দান করা হচ্ছে টিভি ক্যামেরার সামনে ছবি তোলার জন্য, আর মানবসেবার নামে তো আত্মসেবাই করে প্রায় সবাই। স্যার উদাহরণ দেওয়ার মতো মানুষের সংখ্যা ইদানীং খুবই কম। মানুষের মান যে কীসের সমান সেটাই বুঝতে পারি না।

সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা পড়ে এসেছি, ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’, পড়েছি-‘সবার উপরে মানুষ সত্য’, জেনেছি-‘সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের হাতেই জগতের কল্যাণের ভার’, গান হিসেবে শুনেছি, ‘মানুষ মানুষের জন্য-জীবন জীবনের জন্য’, কিন্তু সব ভুলে আর্থ-সামাজিক কারণে সেই মানুষই আজ হয়ে পড়েছে স্বার্থপর। আত্মস্বার্থ, ব্যক্তি লোভ কেড়ে নিয়েছে মানুষের মানবিক গুণ-মানব জন্মের শ্রেষ্ঠত্ব-সার্থকতা কিন্তু আশার কথা হলো মানব সত্তা ও মানবিক গুণের কখনই মৃত্যু হয় না।

অনেক জাগতিক স্বার্থের নিচে তা চাপা পড়ে থাকলেও তাকে জাগিয়ে তোলা যায়। মহানুভূতি ও সহানুভূতিতে জেগে উঠতে পারে মানুষ, নিজেকে করতে পারে মানবসেবায় উৎসর্গ। আর তবেই তো সে মানুষ।

প্রসঙ্গক্রমে ছোটবেলায় পড়া আর একটি কবিতার কথা উল্লেখ করে শেষ করব এই লেখা, যার বিষয়বস্তু ছিল-‘যেদিন তুমি পৃথিবীতে এসেছিলে, সেদিন তুমি একাই কেঁদেছিলে আর সবাই হেসেছিল আনন্দে। জগতে এমন কাজ করতে হবে-যাতে তুমি হাসতে হাসতে মৃত্যুবরণ করতে পার আর সবাই তোমার মৃত্যুতে তোমার জন্য শোকে আকুল হয়ে কাঁদে’। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়নকর্মী।