দিল্লির মসনদ এবার কার

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ভোট উৎসব। চলবে ১৯শে মে পর্যন্ত। ফল ঘোষণা ২৩শে মে। এই ভোট চলবে সাত দফায়। প্রথম দফায় আজ ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট নেয়া শুরু হচ্ছে। ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের ৯১টি লোকসভা আসনে আজ সকাল ৭টা থেকে মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে বোতাম টিপে। নিজের ভোট ঠিক জায়গায় পড়েছে কিনা তাও দেখে নিতে পারবেন ইভিএমের সঙ্গে যুক্ত ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপ্যাট যন্ত্রে। আজ যেসব কেন্দ্রে ভোট হচ্ছে তাতে মোট ১২৮৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

আজ যেসব রাজ্যে ভোট হচ্ছে তার মধ্যে অন্ধ্র প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, উত্তরাখণ্ড, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম, লাক্ষাদ্বীপ, তেলেঙ্গানা ও আন্দামান নিকোবরের সবক’টি আসনে ভোট নেয়া হচ্ছে। আর আসাম, বিহার, ছত্তিশগড়, জম্মু ও কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র, মণিপুর, ওড়িশা, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু আসনে প্রথম দফায় ভোট হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্ধ্র প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ ও সিকিম বিধানসভার সবক’টি আসনে এবং ওড়িশা বিধানসভার কিছু আসনে আজ নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে নির্বাচন কমিশন সবরকম ব্যবস্থা করেছে। প্রতিটি কেন্দ্রে নিয়োগ করা হয়েছে সশস্র বাহিনীর পাশাপাশি কেন্দ্রীয আধাসামরিক বাহিনীও।

তবে নির্বাচনের ঠিক আগের দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মন্তব্যে বিজেপি বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে। ইমরান বলেছেন, ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় ফিরে এলে কাশ্মীর জট খুলবে। এবং শান্তি আলোচনা সহজতর হবে। কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে সেটা সম্ভব হবে না। এর পরেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের ঠিক মুখে মোদিকে আক্রমণের সুযোগ পেয়েছেন। কংগ্রেস বলেছে, পাকিস্তানের সঙ্গে অফিসিয়ালি জোট বেঁধেছেন মোদি। 

ভারতের অন্যান্য অংশের সঙ্গে প্রথম দফায় পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গের যে দুটি আসনে ভোট হচ্ছে সে দিকেই সকলের নজর রয়েছে। এই দুটি আসন হল কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার। এই দুটি আসনে নির্বাচন নির্বিঘ্নে করার জন্য নির্বাচন কমিশন অভূতপূর্ব নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। এই দুই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৯০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী। মাত্র দুটি কেন্দ্রের জন্য এত ব্যাপক সংখ্যক আধা সামরিক বাহিনী আগে কখনো নিয়োগ করা হয়নি। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সব বুথে আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ানরা প্রহরায় থাকবে কিনা তা এখনো নিশ্চিত করা হয় নি।

তবে নির্বাচন কমিশনের পুলিশ পর্যবেক্ষক শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল পুলিশ কর্তা রও নির্বাচনী আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কোচবিহার আসনে রয়েছে মোট ২২০৩টি বুথ। আলিপুরদুয়ারে ভোটগ্রহণ হবে মোট ১৬৪১টি বুথে। সব মিলিয়ে মোট ৩৮৪৪টি বুথে আজ দুই কেন্দ্রের মানুষ ভোট দেবেন। ভোটের ঠিক মুখে বিজেপির অভিযোগের ভিত্তিতে কোচবিহারের পুলিশ সুপারকে অপসারণ করার ফলে তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রথম দফার ভোটে পশ্চিমবঙ্গের এই দুটি আসনে প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের বন্যা বইয়েছেন।

তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী কেন্দ্রে বিজেপিকে হটিয়ে সরকার গঠনে তারাই যে ভূমিকা নিচ্ছেন সে কথা আগেভাগেই বলে দিয়েছেন। আর মোদি বলেছেন, দিদির ঘুম ছুটে গিয়েছে। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ার আসন দুটি জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। আগে এই আসন দুটি ছিল বাম দল ফরোয়ার্ড ব্লক এবং আরএসপির হাতে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর সাবেক বামপন্থি নেতাদের অনেকে যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের জেতা আসন কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ার কেন্দ্র থেকে বিজেপি জয়ের ব্যাপারে এবার প্রচণ্ড আশাবাদী।

সাম্প্রতিক সমীক্ষাগুলোতেই তার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। তাই এই দুই কেন্দ্রে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই আশা করছেন সকলে। তবে ভোটের ঠিক মুখে বিজেপিকে জোর ধাক্কা দিয়ে কামতাপুর পিপলস পার্টির পক্ষ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন দেবার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কেপিপি সভাপতি বিমল বর্মণ বলেছেন, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়ায় বিজেপিকে চরম শিক্ষা দেয়ার জন্য লোকসভা নির্বাচনে এবার তৃণমূলকেই ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কেপিপি নেতারা। এই দুই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থীদের নিয়ে মমতার অভিযোগ, কোচবিহারে একজন স্মাগলার এবং আলিপুরদুয়ারে একজন দাঙ্গাবাজকে প্রার্থী করা হয়েছে।

অবশ্য কোচবিহারের বিজেপি প্রার্থী কিছুদিন আগেও জেলায় তৃণমূল যুবদের দাপুটে নেতা বলে পরিচিত ছিলেন। দুটি কেন্দ্রেই লড়াই হচ্ছে চতুর্মুখী। বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াই ছাড়াও ময়দানে হাজির কংগ্রেস ও বাম প্রার্থীরা। কোচবিহারে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী করেছে বামফ্রন্ট থেকে আসা সাবেক মন্ত্রী পরেশ অধিকারীকে। আর বিজেপি প্রার্থী করেছে সাবেক তৃণমূল যুব নেতা নিশীথ প্রামাণিককে।

কংগ্রেস প্রার্থী করেছে স্থানীয় শিক্ষিকা পিয়া রায় চৌধুরীকে এবং বাম শরিক ফরোয়ার্ড ব্লকের অভিজ্ঞ নেতা গোবিন্দ রায়কে। তবে কোচবিহারে আসল লড়াইটা হচ্ছে মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বনাম নিশীথ প্রামাণিকের। এই দুজনের মধ্যে বৈরিতা দলের থাকার সময় থেকেই। তবে সাবেক ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা পরেশ আধিকারীর বিরুদ্ধে বাম মনস্ক মানুষের ক্ষোভের পাশাপাশি এই আমলে মেয়েকে বেআইনিভাবে সবাইকে টপকে শিক্ষকতার চাকরি পাইয়ে দেবার অভিযোগই বড় হয়ে উঠেছে।

অবশ্য দলের সাংগঠনিক শক্তির উপর ভর করেই তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জয়ের আশা করছেন। সঙ্গে রয়েছে মন্ত্রী রবীন্দ্র নাথ ঘোষের ক্ষমতায়নের রাজনীতি। এই জেলাতেই রয়েছে সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহল এবং বাংলাদেশ থেকে আসা সাবেক ছিটবাসীদের ক্যাম্প। এদের ভোট পাওয়ার জন্য তৃণমূল উন্নয়নের কথা বললেও সাবেক ছিটবাসীদের মধ্যে রয়েছে নানা ক্ষোভ। সেই ক্ষোভকেই কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি। গত কয়েক বছরে কোচবিহারে বিজেপির উত্থান লক্ষ্য করার মতো।

সেই সঙ্গে নিশীথ প্রামাণিকের মতো তরুণের প্রভাব ও ক্ষমতাও বিজেপিকে এবার অতিরিক্ত শক্তি যোগাবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে অসংখ্য চা-বাগান সমৃদ্ধ আলিপুরদুয়ার আসনে এবার লড়ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের দশরথ তিরকে। এই দশরথ তিরকে ছিলেন বাম দল আরএসপির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি আরএসপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়ে লোকসভায় জয়ী হয়েছিলেন। অন্যদিকে আলিপুরদুয়ার আসনে বিজেপি প্রার্থী করেছে এলাকার চা-বাগান শ্রমিকদের নেতা জন বারলাকে। আদিবাসী পরিষদের নেতা হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে।

তবে বারলা ২০১৭ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়ে এ বছরই বিজেপির প্রার্থীও হয়েছেন। এই দুই প্রতিপক্ষ ছাড়াও আসরে রয়েছেন বামফ্রন্টের শরিক আরএসপির সাবেক সংসদ সদস্য মনোহর তিরকের কন্যা মিলি ওরাওঁ এবং কংগ্রেসের মোহনলাল বসুমাতা। গতবারের নির্বাচনে আরএসপি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও এবারের ভোটে মূল লড়াইটা হচ্ছে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে। তৃণমূল কংগ্রেস সংগঠনের উপর ভর করে আসনটি ধরে রাখার ব্যাপারে আশাবাদী। আর বিজেপির ভরসা মোদির দেশপ্রেমের আবেগ। তবে এই কেন্দ্রে অন্তর্ভুক্ত ৬৪টি চা বাগানে শ্রমিকরাই এই কেন্দ্রের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিতা রাখবেন বলে মনে করা হচ্ছে। আর সে ক্ষেত্রে চা-বাগান এলাকার গোর্খারাই হতে পারে নির্ণায়ক শক্তি।

তবে স্থানীয় বিজেপি নেতাদের মতে, দেশের সুরক্ষায় মোদির বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জেরে দেশে এখন প্রবলভাবে বইছে বিজেপি হাওয়া। গতবারের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের ব্যবধান ছিল খুবই সামান্য। তাই আসন ধরে রাখার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব। তবে তাদের সেক্ষেত্রে বেগ দেবে আরএসপি প্রার্থীও। আর তাই মমতা বলেছেন, এই নির্বাচনে বাম ও কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে লাভ নেই। সবটাই দিন তৃণমূলকে। তবে এবারের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন যেভাবে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করেছে তাতে ভোট লুট হওয়া এবার সম্ভবত রোখা যাবে। তাই নির্বাচনের রণাঙ্গনের ভোট কাটাকুটিতে কে জিতবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই যাচ্ছে।