ইরান যুদ্ধ জ্বালানি, রপ্তানি রেমিট্যান্সের জন্য বড় ধাক্কা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, রপ্তানি বাজার ও প্রবাস আয়ের ওপর। বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।

রবিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ ও ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় বক্তারা এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। ‘ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে যুদ্ধের প্রভাব’ শীর্ষক এই সেমিনারে অর্থনীতি, জ্বালানি, রপ্তানি ও শ্রমবাজারসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

সভায় পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, চলমান সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূলত তিনটি প্রধান চ্যানেলের মাধ্যমে পড়ছে—জ্বালানি সরবরাহ ও দাম, রপ্তানি বাণিজ্য এবং বিদেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট ক্রুড অয়েলের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে গালফ অঞ্চলের দেশগুলো থেকে। একইভাবে বছরে আমদানি করা প্রায় ছয় মিলিয়ন মেট্রিক টন এলএনজির মধ্যে প্রায় চার মিলিয়ন মেট্রিক টন আসে কাতার থেকে।

যুদ্ধের কারণে কাতারের এলএনজি উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটেছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

তিনি জানান, মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে বাংলাদেশে ২৪-২৫টি এলএনজি কার্গো আসার কথা, যার মধ্যে অন্তত ১৮টি হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসার কথা ছিল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এসব সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানির দামও দ্রুত বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। যুদ্ধ শুরুর আগে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ থেকে ১২ ডলার, যা এখন ২১ থেকে ২৮ ডলারের মধ্যে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের সিঙ্গাপুর বেঞ্চমার্কও ৮০ ডলারের কাছাকাছি থেকে বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে চলে গেছে। এতে সরকারের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

রিয়াজ বলেন, গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে ফিরছিল।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৯-২০ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়লে সেই স্থিতিশীলতা আবার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

রপ্তানি খাতেও যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশ ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় যায়, যার পরিবহন পথ মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কম্পানি এখন আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে পণ্য পরিবহন করছে, ফলে পরিবহন খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে এবং সময় লাগছে ১০ থেকে ১৬ দিন বেশি।

এর ফলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। বিশেষ করে পেট্রোলিয়ামভিত্তিক কাঁচামালের দাম বাড়ায় পোশাক উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ম্যান-মেড ফাইবারের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল পলিয়েস্টারের দাম প্রায় ৩২ শতাংশ বেড়েছে। এতে পোশাক রপ্তানিতে প্রতি ইউনিটে ১০ থেকে ১৫ সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ যোগ হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়াবে।

রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য প্রভাবের কথা তুলে ধরেন বক্তারা। ড. রিয়াজ জানান, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো থেকে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ওই অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে প্রবাস আয়েও।

সভায় ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পায়। সংঘাতের কারণে যদি তা কমে মাসে ২.৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, তাহলে বছরে পাঁচ-ছয় বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে ১০-১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে জ্বালানি আমদানিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি হলে এই ব্যয় ১৭-১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় চাপ তৈরি হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানিতে। বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকটের কারণে সামনে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তা ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের শিল্প খাত এরই মধ্যে নানা কাঠামোগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি অনিশ্চয়তা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে শিল্প খাত নতুন করে চাপে পড়তে পারে।

আলোচনায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সাহাব এনাম খান বলেন, বর্তমান সংঘাত শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ। ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ, শ্রমবাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাঠামোও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে প্রস্তুত হতে হবে।

বক্তারা বলেন, পরিস্থিতি এখনো বড় সংকটে না পৌঁছলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব আরো তীব্র হতে পারে। তাই সরকারকে জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং প্রবাসী শ্রমবাজার রক্ষায় দ্রুত ও সমন্বিত নীতি গ্রহণের পরামর্শ দেন তাঁরা।

Scroll to Top