দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে থামছে না চোরাচালান

Border area

কোনোভাবেই থামছে না দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে হুন্ডি, সোনা, রুপা চোরাচালান। সাতক্ষীরা ও শার্শা সীমান্তে সবচেয়ে বেশি সোনা চোরাচালান হচ্ছে। রুপার অবাধ চোরাচালান হয় দর্শনা ও ঝিনাইদহ সীমান্তে। আর হুন্ডিতে সয়লাব টেকনাফ ও রামুসহ বেশ কিছু সীমান্ত এলাকা। সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) ১১ অক্টোবর পাঠানো প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছে বিজিবি।

সংস্থাটি কর্তৃক সেপ্টেম্বরে উদ্ধার হওয়া চোরাচালান পণ্যের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। বিজিবি মহাপরিচালকের পক্ষে পরিচালক (অপারেশন) ফয়জুর রহমান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্লিখিত সময়ে ৩ কেজি ২১০ গ্রাম সোনা, ১৯ কেজি ২৪১ গ্রাম রুপা, ১ লাখ ১০ হাজার ৩৬ মার্কিন ডলার ছাড়াও আরও নগদ টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ কেজি ৫৭০ গ্রাম সোনা সাতক্ষীরার বৈকারি, ১ কেজি ৫২৩ গ্রাম শার্শার শিকড়ী এবং বাকি সোনা কক্সবাজারের হোয়াইক্যং আর কুলাউড়ার শিকরিয়া থেকে উদ্ধার করা হয়।

বিজিবি প্রতিবেদনে বলেছে, উদ্ধার হওয়া ১৯ কেজি ২৪১ গ্রাম রুপার মধ্যে ১০ কেজিই দর্শনার মদনা থেকে জব্দ করা হয়। বাকি রুপা উদ্ধার হয়েছে ঝিনাইদহের বাঘাডাংগা বাজারপাড়া ও নেকমরদ থেকে। এ ছাড়া টেকনাফ, মধ্যনগর, বেনাপোল, জীবননগর, ফুলবাড়ী, রামু ও উখিয়া থেকে নগদ টাকা উদ্ধার করেছে বিজিবি। এদিকে ‘সীমান্তে চোরাচালান, নারী ও শিশু পাচার রোধের জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং শক্তি বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন জুনে প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ২২৩ বছরে দায়িত্ব-কর্তব্যের ব্যাপকতা বেড়েছে এবং কাজের বহুমাত্রিকতা লাভ করেছে।

অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং অস্ত্র-গোলাবারুদসহ ন্যূনতম সহায়ক যন্ত্রপাতির সুযোগ সীমিত। তবে বিজিবির সক্ষমতা বেড়েছে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ বা ৯১ শতাংশ মনে করেন, অতীতের তুলনায় অল্প সময়ে বিজিবি সদস্যরা অতি অল্প সময়ে সীমান্তের যে কোনো দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে পৌঁছাতে পারেন। কিন্তু সীমান্তে ব্যাপক খোলা মাঠ, রাতে বিদ্যুতের আলোর ব্যবস্থা না থাকা, টহল টাওয়ার না থাকা এবং সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় পাকা রাস্তাসহ সংযোগ রাস্তার ব্যাপক অভাব থাকায় রাতের অন্ধকারে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ খুবই কঠিন। ফলে টহলকাজে অসুবিধা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজিবির প্রয়োজনের তুলনায় যানবাহন কম। সীমান্তের পাহাড় এলাকায় টহল টাওয়ার, সার্চলাইট ও বেশির ভাগ সীমান্তে আলোর ব্যবস্থা নেই।

মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদ টহলের জন্য পর্যাপ্ত স্পিডবোট নেই। নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক। পাহাড়ি এলাকায় চোরাচালান দমন অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেকটাই ঝুঁকি রয়েছে। প্রয়োজনীয় যানবাহন ও অস্ত্র অকেজো। টহল কমে গেলেই বাড়ে চোরাচালান। সীমান্ত এলাকার প্রভাবশালীরা সম্পৃক্ত থাকার ফলে চোরাচালান ও পাচার নিয়ন্ত্রণ খুবই কঠিন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চোরাচালান, মাদকদ্রব্য ও মানব পাচার সম্পর্কিত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, কক্সবাজারের টেকনাফ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ভয়াবহ মাদক পাচার হয়ে আসা, রোহিঙ্গা নারী ও শিশুসহ নৌকাযোগে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার হয়। এ অবস্থায় নাফ নদে টহল জোরদার করা প্রয়োজন।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, চোরাচালান কমে এসেছে। কিন্তু পাচারের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালীরা আইন ও মামলার ফাঁকফোকরের কারণে পার পেয়ে যায়। তাই ‘সীমান্তে চোরাচালান, নারী ও শিশু পাচার রোধের জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং শক্তি বৃদ্ধিকরণ’-এর মতো প্রকল্প না থাকলে চোরাচালান, নারী ও শিশু পাচার লাগামহীন বা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। সুতরাং বিজিবির মাঠপর্যায়ে এ ধরনের কার্যক্রম সচল ও টেকসই রাখার সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থা নিতে হবে।